ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

প্রতিটি দেশই তার নিজস্ব কিছু প্রাচিন ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববুকে। প্রাচীনতম ঐতিহ্যের দিক থেকে বিচার করলে আমাদের দেশ ছাড়া যে কয়টি দেশের নাম তালিকার শীর্ষে চলে আসে তন্মধে আয়ারল্যান্ডের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। দেশটি তার অতীত ইতিহাস, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে এতটাই দরদ দিয়ে আগলে রেখেছে তা না দেখে বুঝার উপায় নেই। বিশেষ করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাসল গুলোই এর বড়ো প্রমান। ঈদের ছুটিতে সেদিন সপরিবারে গিয়েছিলাম এমনি একটি ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত ক্যাসলে।

আটশ থেকে এক হাজার বছর আগে রাজা বাদশারা যে গুলোকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করতো অথবা সেনাকুঞ্জ বা দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছিলো সে গুলোই আজ ক্যাসল হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি ক্যাসলেরই রয়েছে একেকটি নিজস্ব ইতিহাস বা বৈশিষ্ট্য এবং একটি মিউজিয়াম যা থেকে সহজেই আন্দাজ করা যায় তৎকালীন শাসন প্রক্রিয়া ও যাপিত জীবনের এক নন্দিত বা নিন্দিত চিত্র। অতি সম্প্রতি যে ক্যাসলটিতে যাবার সুযোগ হয়েছে তার নাম হল কিংজন ক্যসল।

ক্যাসলটি “কিং জন ক্যাসল” হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও মুলত এটার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো জনের বাবা দ্বিতীয় হেনরির আমলে। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ি যা পাওয়া যায় তা হল, এগার শতকের শেষের দিকে আয়ারল্যান্ডে এংলো নোরমানের হামলা কালিন সময়ে ব্রিটিশ রাজা দ্বিতীয় হেনরি স্থানীয় শাসক ডোমনাল মোর ও’ব্রাইনের সাথে একটি রক্ষী সেনা বা দুর্গ প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এ চুক্তির পর পরই হেনরির আরেক বাধ্যগত শাসক (লর্ড) রায়মণ্ড লি গ্রস ফিটজারল্যাণ্ড এংলো নোরমান হামলাকে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসলেও ও’ব্রাইন কে পুনঃ হামলা থেকে রক্ষা করে নিরাপদে রাখার জন্য ক্যসল প্রতিষ্ঠার কাজ অব্যাহত রাখা হয়।

ব্রাইনের মৃত্যুর পর ১১৯৪ সালে এংলো নোরমানরা আবারো হামলা চালালে হেনরির পুত্র জন তার এক ভাইকে হারিয়ে পূর্ণ শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে সক্ষম হয়। তিনি আয়ারল্যান্ডের স্বার্থ রক্ষায় ও তার বাবার আশা আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সর্বদাই নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। এ ক্যাসল বা রক্ষিসেনা তৈরির পেছনে তার বীরত্ব ও কর্মক্ষমতা দেখে তার বাবা দ্বিতীয় হেনরি তাকে “লর্ড” উপাদিতে ভূষিত করেন এবং তার নামানুসারে ক্যাসলটিকে “কিং জন ক্যসল” হিসেবে নাম করন করা হয়।

বস্তুত পক্ষে ক্যসলটির কাজ এগার শতকের শেষের দিকে ব্রাইনের হাত দিয়ে শুরু হলেও এর নির্মাণ কাজের সমাপ্তি ঘটে ষোল শতকে রানী এলিযাবেতের আমলে। কিং জন ক্যসলটিকে যেভাবে গড়তে চেয়েছিলেন সেভাবে তিনি গড়ে তুলতে পারেননি। পর্যাপ্ত পরিমান অর্থ বা সময় কোনটাই তার হাতে ছিলনা। তাই তার মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তার দৌহিত্র কিং এডওয়ার্ড ওয়ান দাদার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এরপর এটাকে আরো কারুকার্য সম্পন্ন করে আধুনিক ভাবে গড়ে তুলা হয় রানী এলিযাবেতের সময়। প্রকৃত পক্ষে আজ যে কিং জন ক্যসল আমাদের সামনে দাড়িয়ে আছে, তা বারো শতকের সেই ক্যাসলের সাথে এক বিশাল ফারাক। শুরু থেকে অদ্যাবধি বিভিন্ন প্রাজ্ঞবাণ লোকের স্বকীয় ও উদার দৃষ্টি-ই ক্যাসলটিকে নিয়ে এসেছে আজকের গর্বিত অবস্থানে।

টুইন টাওয়ার বিশিষ্ট ক্যাসল আয়ারল্যান্ডে এটাই প্রথম। বিখ্যাত এ ক্যাসলটি লিমরিক সিটির অদূরে সানন নামক একটি নদীর তীরে স্বীয় ঐতিহ্য বিন্যাসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মধ্য যুগীয় আইরিশদের সুখ দুঃখের প্রতিচ্ছবি। এ যেন প্রাগৈতিহাসিক শাসন ব্যবস্থার এক গর্বিত প্রতীক।

আজকের যুগে দেশি বিদেশি অনেক পর্যটক বা দর্শনার্থী ক্যসলটিকে এক নজর দেখার জন্য এসে ভিড় জমায়। পাথর নির্মিত এ ক্যসলটির বিশাল পরিধি ও বলিষ্ঠতা দেখে মানুষ হতবাক হয়ে যায়। উত্তরমুখি সদর দরজাটি ব্যবহৃত হয় টাওয়ার দুটোর প্রদান ফটক হিসেবে। পিছনে রয়েছে বর্গাকৃতির বিশাল উঠুন যার চতুরপাশ কঠিন দেয়ালে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। ভেতর ও বাইরের পরিপক্কতা এতটাই পুরো যে , কোন সুসজ্জিত সমরাস্ত্র সম্পন্ন সৈন্য বাহিনীর আক্রমনও যেন এ ইমারতকে টলাতে ব্যর্থ হবে।

সর্বোপরি এ কথা বলতেই হয়, লিমরিককে একটি শহুরে পরিবেশে ও নগরে পরিনত করার জন্য এ ক্যাসলের অবদান অনস্বীকার্য। আজ আর বিদেশীদের হাতে এ ক্যাসল কুক্কিগত নয়। আইরিশরাই এর দেখভাল করে। এটি কেবল মধ্যযুগীয় নিছক একটি সেনা কুঞ্জ বা সৃতি সৌধই নয়, হাসিকান্না মিশ্রিত আইরিশ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক কালজয়ী সৃষ্টি। ক্যসলটির ভেতরে ঢুকলে ক্ষনিকের জন্য হলেও কল্পজগতে ঝিলিক দিয়ে উঠে পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য । এটি শুধু অতীত নিয়ন্ত্রিত একটি সাদামাটা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনই নয় স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনরুত্তান ও বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। কারণ প্রতিদিনেই ভিড় করা দর্শনার্থীদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একেকটি নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার গল্প যা কিনা আইরিশ সংস্কৃতির সাথে যোগ হয়ে বিস্তৃত করছে এর পরিধিকে।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকলেই প্রথমেই দৃষ্টি কেড়ে নেবে দাঁড়িয়ে থাকা কাটের তৈরি কিং জনের প্রতিকৃতিটি। তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটি আমাদের দেশের অতীত রাজা বাদশাদের কথাই যেন মনে করিয়ে দেয়। স্থান কালের ভেদাভেদ থাকলেও রাজাদের আদল মূলত একই সুত্রে গাঁথা। প্রতিকৃতির উল্টো দিকে রয়েছে অভ্যর্থনাখানা যেখানে রয়েছে দুজন পেশাদারী ব্যক্তি; যারা পর্যটকদের স্বাগতম জানিয়ে ক্যসল বিষয়ক বিভিন্ন তথ্যাদি প্রদান করে থাকে। ক্যসলের ভেতরে যে মিউজিয়াম সেখানে ঢুকার জন্য রয়েছে টিকেটিংএর ব্যবস্থা যার মুল্য স্থানীয় মুদ্রায় নয় ইউরো।

মিউজিয়ামের ভেতর রক্ষিত প্রতিটি জিনিসই আকৃষ্ট করার মতো। তন্মধ্যে আমার কাছে যে গুলো খুব বেশী ভালো লেগেছে তার কয়েকটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে তুলে ধরলাম।

প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকার পর বাম পাশে বাইরের দিকে তাকালে দেখা যাবে পাথরের প্রাচীরে ঘেরা উঠোনের মতো এক বিশাল খালি জায়গা যেখানে সৈন্যসামন্তরা তাদের অস্ত্র সহ যুদ্ধের সরঞ্জামাদি রাখত। যুদ্ধ সামগ্রী সমুন্নত এ জায়গাটিকে টাওয়ারটির পেছনে এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে কেউ আক্রমন চালাতে গেলেও ক্যাসল ডিঙ্গিয়ে বা ধ্বংস করে সেখানে ঢুকতে হবে যা কিনা সেই আমলে ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। সৈন্যদের স্মৃতি চিহ্নের ছাপ বহনকৃত খোলা আকাশের এ জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে সানন নদীর ছোট ছোট ঢেউ দেখতে বেশ রোমাঞ্চকর বলেই মনে হয়।

টাওয়ারের পিছনাংশের এ জায়গাটির এক পাশে রয়েছে কয়েকটি সমাধি। তের শতকের দিকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একই সঙ্গে মারা যায় ২৮০ জন লোক। প্রতিটি কবরে দপনস্থ করা হয় ১৫/১৬ জনকে। গবেষণা জনিত কাজে প্রত্ন বিদরা ১৯৯৩ সালে একটি কবর খনন করলে সেখানে ১৪ জন শিশু ও নারির কঙ্কাল দেখতে পায়। ক্যাসলে বিদ্যমান এ চিত্রটি তখনকার ডায়রিয়ার প্রকোপ বা ভয়াবহতা সম্পর্কেই আমাদেরকে ধারনা দেয়।

ঘোড়া দাবরিয়ে কিং জনের শিকারে যাবার চিত্র তখনকার রাজাদের সৌখিনতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের। ১১৯৯ সালে সহস্থে লিখিত একটি চিঠি (যা এখন অস্পষ্ট) থেকে লিমরিক তথা ক্যসলটির প্রতি তার দরদ ও ভালোবাসার কথা উপলব্ধি করা যায়। মিউজিয়ামে রয়েছে তার শানামলের ছবি সম্বলিত মুদ্রা যাকে তখন বলা হতো “হাফপেনি কয়েন”।

প্রত্ন তাত্ত্বিক গবেষণার উদ্দেশ্যে ক্যসলটিতে কিছু খননকাজ করালে সেখানে পাওয়া যায় খুবই মুল্যবান স্বর্ণখচিত তের শতকের একটি আংটি। সেটিও শুভা পাচ্ছে মিউজিয়ামের এক কোনে। রয়েছে মধ্য যুগে ব্যবহৃত রান্নাবান্নার জন্য বিভিন্ন বাসন-কোসন, ফুলদানি, টেবিলক্লথ ইতাদি।

মিউজিয়ামে রয়েছে গানমানি, সিলিং , কপারহাফপেনি প্রভৃতি বিভিন্ন শাসকদের শাসনামলের মুদ্রা। “লিমরিক ট্রেড টোকেন” নামক একটি বিশেষ মুদ্রা রয়েছে যা সাধারন মুদ্রার কমতি কাটানোর জন্য ব্যবহৃত হত। ১৬৫৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার (ব্রিটিশ লর্ড বা কিং) যখন পর্যাপ্ত পরিমান প্রচলিত মুদ্রা বিতরন করতে ব্যর্থ হয় তখন লিমরিকক ট্রেড টোকেন নামক মুদ্রাটির প্রচলন ঘটে।

ধুমপান ছিল তখনকার যুগের লোকদের জন্য এক বিরাট আয়েশি বৈশিষ্ট্য। এঁটেল বা কাদামাটি দ্বারা নির্মিত এক ধরনের পাইপ ধুমপানের জন্য ব্যবহৃত হতো সপ্তদশ শতকের দিকে। মিউজিয়ামে রক্ষিত হোয়াইট ক্লে পাইপ সে আমলের সৌখিন ধূমপায়ীদের স্মৃতি বহন করে চলছে এখনো।

এ ছাড়াও মিউজিয়ামে রয়েছে একটি ডায়রি যাতে বর্ণিত আছে ষোল শতকের মাঝামাঝিতে ক্যাসলটি সৈন্যবাহিনী কতৃক অবরোধ হওয়ার গল্প। রয়েছে লিমরিক সিটির একটি প্রথম ও প্রাচিন মানচিত্র।

আইরিশরা তাদের পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখে বিভিন্ন নগরীতে সুচারু ভাবে সাজিয়ে রাখার মাধ্যমে কেবল বিদেশীদের শ্রদ্ধা ও প্রশংসাই কুড়াচ্ছেননা, অর্থনৈতিক সাফল্যের ক্ষেত্রেও তা অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে বিরাট ভাবে। আমাদের দেশেও প্রাচিন ও পুরনো ঐতিহ্যের কোন কমতি আছে বলে মনে হয়না। আমরা কি পারিনা এসব ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে নতুন ভাবে সাজিয়ে দেশি-বিদেশিদেরকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে?