ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বাংলাদেশের কোন শঙ্খার কথা শুনলে যেমন বুকটা আশংখায় কেঁপে উঠে ঠিক তেমনি আমরা যারা প্রবাসে বিশেষ করে ইউরোপে বসবাস করছি তাদের অধিকাংশই আজ ইউরোর শঙ্কায় শঙ্খিত। আমি এমন কোন জ্ঞানলব্ধ অর্থনীতিবিদ বা গবেষণাধর্মী লেখক নই যে ইউরো সঙ্কটের এ ক্রান্তিকালে আমার লিখায় কোন সুচিন্তিত দিক নির্দেশনা বেরিয়ে আসতে পারে! ইউরো জোনের দৈন্যতার ফলে উন্নত বিশ্ব সহ পুরো ইউরোপ জোরে যে হায় হায় রব শুরু হয়েছে তার আলোকেই কেবল ইউরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু উম্মা প্রকাশ করছি মাত্র।

ইউরো জোনকে শক্তিশালী করা বা অর্থনৈতিক মন্দা কাঠিয়ে উঠতে ব্যর্থতার দায়ে কিছুদিন আগে পদত্যাগ করতে হয়েছে ইটালিয়ান প্রধানমন্ত্রী বারলুসকনিকে। গ্রিসের অর্থনৈতিক মন্দার খবরতো এখন দুনিয়া জোরে। স্পেনও একই সমস্যায় জর্জরিত। আয়ারল্যান্ড এখনো দেউলিয়াত্ত সামলাতে ব্যস্ত। মুখ থুবরে পড়েছে ইউরোপের প্রতিটি দেশের অর্থনীতি। ঋণের ঘানি টানতে টানতে ব্যাংক গুলোতে জ্বলছে লালবাতি। ইউরোজোন অর্থনৈতিক সংকটের এ দুরূহ সময়ে সমাধানে সম্মিলিত প্রয়াসের পরিবর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে মুরুব্বী দেশ গুলোর মধ্যে চলছে শীতল যুদ্ধ। কোন কৌশলে বা পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান করে এ কাল অমানিসা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে তা নিয়েই তাদের মধ্যে অনেক বিবাদ যা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কেবল প্রতিবন্ধকতাই সৃষ্টি করছে। প্রকৃত হিল্লে আর হচ্ছেনা। সিদ্ধান্ত গ্রহনে ফ্রান্স ও জার্মানের ঐক্যমতে পৌঁছতে ব্যর্থতা এবং ইউনিয়নে কতৃত্ত ও নজরধারি নিয়ে ব্রিটেন ও জার্মানের মধ্যে যে মনোমালিন্য তাই মুলত সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রধান কণ্ঠক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরো ক্রাইসিস নিয়ে সারা বিশ্ব আজ উদ্বিগ্ন। গত ২৮/১১ তে হোয়াইট হাউজে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট হারমান ভেন রম্পুই সহ আরো কজন নেতাদের নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারেক ওবামা দু ঘণ্টা ব্যাপী এক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি নেতাদের কাছে খোদ এমেরিকার ক্ষতিক্ষর দিক গুলো তুলে ধরেন। ইউরো ক্রাইসিস কাটিয়ে উঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি বলেন, “This is of huge importance to our own economy. If Europe is contracting or Europe is having difficulties then it is much more difficult for us to create good jobs here at home because we send so many of our products and services to Europe, it is such an important trading partner for us. So we have got an important stake in their success and we will continue to work in a constructive way to try to resolve this issue in the near future.” রাশিয়া ও চীন সহ আরাও অনেক নামি দামি দেশ গুলো এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা স্বীকার করে দ্রুত রাজনৈতিক ভাবে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। এমেরিকা ও ইউরোপের প্রভাবশালী কাগজ গুলোর সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকিয়তে প্রতিনিয়তই এসব নিয়ে লিখা হচ্ছে।

অথচ টিভির পর্দায় যখন এ বিষয়ে আমাদের দেশের নেতা মন্ত্রিদের কথা শুনি তখন নিজে নিজেই হাসি। অর্থমন্ত্রী হাসি হাসি মুখে প্রায়ই বলেন, পাশ্চাত্যের রেসিসান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ছুঁতে পারবেনা। আমি যেহেতু অর্থনীতিবিদ নই তাই অতসব বুঝিনা। কিন্তু এ ডিজিটাল যুগে অর্থনীতিও যে একটা গ্লোবাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা সে কথা না বুঝার কোন কারন নেই। এমেরিকার অর্থনৈতিক নাজুকতা প্রভাব ফেলাবে বিশ্বব্যাং, আইএমএফ সহ অন্যন্য অর্থনৈতিক সংস্থা গুলোর উপর যার কুফল পরোক্ষ ভাবে আমাদেরকেও ভোগ করতে হবে বা হচ্ছে। কারন আমাদের অর্থনীতিও যে অনেকটা তাদের দয়া দাক্ষিন্যের উপর নির্ভরশীল।

নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরন দেই। আমি আয়ারল্যান্ডে চাকরি করছি। ছোট চাকরি। ইউরো সঙ্কটের ফলে সেই দুহাজার আট সালের মাঝামাঝি থেকে উপার্জনের মাত্রা কমতে শুরু করেছে যা কিনা মোট আয়ের তিন ভাগের এক ভাগে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। পক্ষান্তরে, নড়বরে অর্থনীতির যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার শুধু ট্যাক্স ও পিপিএস (পারসোনাল পাবলিক সার্ভিস) ফি বাড়িয়েই ক্ষান্ত হননি চিকিৎসা সেবার কথা বলে নতুন আরেকটি ফি ইউ এস সি (ইউনিভার্সাল সোশ্যাল সার্ভিস) সংযযন করে দিয়েছে যা প্রতি বেতন থেকেই কেটে নেয়া হয়। ফলে সব মিলিয়ে আমার মতো একজন ছোট চাকরিজীবীর ক্ষতির পরিমান দাঁড়াল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০/৭০ হাজারের মতো। এ ক্ষতি শুধু আমার একার নয়, অনেকেরই। যা আমাদের দেশের জাতীয় আয় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অনেকটা বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

ফিরে আসি মুল কথায়। আজ যে সমস্যা পুরো ইউরোপে বিষ পোড়ার মতো ফোঁড়ন ধরেছে তা কোন একদিনের সমস্যা নয়। শুরুতে যদি কর্তা ব্যাক্তিরা সমস্যার কারন গুলো নির্ণয় করতে পারতো কিংবা সমস্যা গুলোকে আমলে আনত তাহলে আজ ইউরোর আকাশে যে দুর্যোগের ঘনঘটা তা ঘটতনা। এশিয়ান জনশক্তিকে মার দেয়ার চিন্তায় তারা কৌশল গত ভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুর্বল অর্থনীতি সম্পন্ন দেশ পোল্যান্ড সহ রাশিয়ার কয়েকটি দেশকে ইইসি ভুক্ত করে চাকরির বাজারকে উদার নীতির আওতায় নিয়ে আসে। ফলে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড সহ অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ কয়েকটি দেশে ওইসব দেশ থেকে আগত লোকের ঢল নামে। দলে দলে লোক এসে ব্যাক্তিগত অনুপযোক্ততা ও ভাষাগত সমস্যার দরুন এদের অনেকেই কর্ম পেতে ব্যর্থ হলে FAS-এ(প্রশিক্ষন দানকারী একটি সরকারী সংস্থা) রেজিস্ট্রি করে সরাকারী অনুদান ভোগ করতে থাকে। কেউ কেউ এ সুযোগ বাগিয়ে নিয়ে সরকারের চোখকে ফাকি দিয়ে নগদ পয়সায় কাজ করে পর্যাপ্ত পরিমান অর্থ নিজ দেশে পাচার করতে সক্ষম হয়েছে যার নেতিবাচক প্রভাব এখানকার লোকজন হাড়ে হাড়ে ঠের পাচ্ছে এখন। তাদের এ উদার নীতি মুলত অনেকটা খাল কেতে কুমির আনার নীতিতেই পরিনত হয়েছে।

এছাড়া ইউরোপিয়ান ব্যাংক গুলো যেসব দেশকে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো লোণ দিয়েছিল তা সঠিক খাতে ব্যবহার করতে তারা ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিচালনা ও নজরদারির যথেষ্ট কমতি ছিল। ঋণকৃত অর্থে আশানোরুপ শিল্পায়ন না ঘটিয়ে তার সিংহ ভাগই ব্যয় করেছে হাউজিং এস্টেট খাতে। মানুষের আয় ও বাড়ির দামের অসামঞ্জ্যসতার দরুন তা বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়। ফলে পুরো অর্থই আঁটকে থাকে ঐ দালান কোঠার ভেতর। দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা। ব্যর্থ হয় সঠিক কর্ম ক্ষেত্র তৈরি করতে। যে ইউরোপে দুহাজার আটের প্রথম দিকেও চাকরি ছিল ডাল ভাত সেখানে আজ কর্মের জন্য মানুষ রাস্থায় নামতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউরো জোন যে সংকটের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে তা নিরসনের জন্য সম্প্রতি জার্মানের চ্যান্সেলর মেরাকল একটি নতুন ইইউ সনদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে বাজেট নিয়ন্ত্রনে তাদের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা থাকবে। আবার ব্রিটেন চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী তার মুরিব্বায়ানা চরিত্রের কৌশল আরও বেশী প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক। এদিকে ঋণ সমস্যা সমাধানে ফ্রান্স-জার্মানের মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলছে। এ ত্রিমুখি টানাপোড়নে ইউরোপের যে কটি দেশ প্রানপনে লড়াই করে এখনো কোন রকমে ঠিকে ছিল অদের এ ত্রিমুখি টানাপোড়নের যাঁতাকলে তাদের দেউলিয়া হতে খুব বেশী সময় লাগবে বলে মনে হয়না। আর এ অবস্থা এভাবে চলতে থাকলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাধারণ মুদ্রা “ইউরোকে” বাচিয়ে রাখাই হবে দায়।