ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বিজয়ের আনন্দের ইমেজ কাটতে না কাটতেই সামনে এলো বিশ্ব অভিবাসী দিবস। আজ ১৮ ডিসেম্বর- বিশ্ব অভিবাসী দিবস। ১৯৯০ সালের এ দিনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বের সব অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে একটি সনদ অনুমোদন করা হয়। সেই সঙ্গে দিনটিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর থেকে আমদের দেশে সিভিল সোসাইটি দিবসটি পালন করলেও সরকারী উদ্যোগে দু হাজার সাল থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে পালিত হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার এবার বেশ ঘটা করেই দিবসটি উদযাপন করতে যাচ্ছে।

সরকারকে এ বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ জানানোর আগে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই সেইসব অভিবাসী ভাইবোনদের যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঐকান্তিক নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের দেশের অর্থনীতির সাফল্যের ক্ষেত্রে বিরাট ভুমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছেন।

একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রবাসী কল্যাণ সচিবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, “১৯৭৩-৭৪ সালে এই খাতে বছরে ১০ থেকে ১৫ কোটি রেমিটেন্স আসত। আর এখন সেখানে প্রতিবছর প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রেমিটেন্স আসছে। আর্থিক বিবেচনায় এই খাত থেকে বৈদেশিক সাহায্যের ১০ গুণ, বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৩ গুণ বেশি অর্থ উপার্জন হচ্ছে। জিডিপি’তে এ খাতের অবদান ১৩ ভাগ। বাস্তবে এটা ২০ ভাগেরও বেশি। কর্মসংস্থানের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় খাত।“ শুধু তাই নয় সরকারী হিসেব অনুযায়ী ৭৮ লক্ষ লোক প্রবাসে অধিবাসী হিসেবে আছেন বল্লেও মুলত এর বাস্তব পরিসংখ্যান কোটির নিচে নয়।

প্রবাস জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি তা হল আমাদের বাংলাদেশি ভাইদের কর্ম ক্ষমতা, দক্ষতা, কাজে অনিহা প্রকাশে অনিচ্ছা, সুনিপুন কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি গুণাবলী অন্য যে কোন জাতি সম্পন্ন কর্মীদের তুলনায় অনেক অনেক বেশী। আমার এখনো মনে পড়ে, দুহাজার সালের দিকে আমি সিঙ্গাপুর অবস্থান কালে আমার কোম্পানির মালিক এক অন্তরঙ্গ পরিবেশে আমাকে বলেছিলেন, “তোমাদের বাঙ্গালিদেরকে আমি পছন্দ করি কারণ তোমরা সিঙ্গাপুরে কর্মরত অন্য যে কোন জাতির তুলনায় অনেক বেশী স্মার্ট।“ সত্যি তাই। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে বাঙালি অধিবাসীদের বদনাম যে নেই তা হলফ করে বলা যাবেনা সত্যি কিন্তু বিদেশী কর্ম বাজারে সাধারন শ্রমিকদের সুনামকে মোটেও অস্বীকার করার জো নেই। স্বীয় সুনাম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে হাজার লক্ষ কোটি বৈদেশিক মুদ্রা যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ও দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যাপক ভুমিকা রাখছে।

প্রবাসিদের অবদানের কথা মনে করে সরকার বেশ জমজমাট করে দিবসটি পালন করতে যাচ্ছেন। সংবাদে প্রকাশ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য এককেন্দ্রিক সেবা চালু করার উদ্দেশ্যে সরকার যে ২০ তলা বিশিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ ভবন নির্মাণ করেছেন তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন। এ ভবনে থাকবে মন্ত্রনালয়ের দুটো অনুবিভাগ, ইমিগ্রেশন সার্ভিস, পাসপোর্ট সার্ভিস, প্রবাসীদের জন্য ব্রিফিং সেন্টার সহ বিদেশে যেতে আগ্রহীদের সব ধরনের সেবা মুলক কাজের ব্যবস্থা।

অভিবাসী দরদী বর্তমান সরকারের এ প্রশংসনীয় উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর কার্যক্রম যেন কেবল উদ্বোধন বা কথার মধ্যেই সিমাবদ্ধ থেকে না যায় কিংবা ভবনটি যেন অসাধু ধূর্ত কর্ম কর্তাদের সোনার খনি হয়ে না দাড়ায়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যারা আছেন তারা যেন ব্যাপারটা দায়সারা ভাবে নিয়ে বেমালুম ভুলে না যান।

অভিবাসীদের বিশেষ করে বাঙালি প্রবাসীদের অনেক দুঃখ আছে। দেশের অফিস আদালতে কাজ কর্ম করতে গিয়ে সঠিক ভাবে মুল্যায়িত না হওয়া, দেশে ফেরা বা বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন অফিসার বা কাসটমস কর্মকর্তা কতৃক অহেতুক ঝামেলা পোহানো, চুরি-ডাকাতি সহ স্থানিয় সন্ত্রাসি কতৃক হুমকি-ধামকি এমনকি প্রান নাশ ইত্যাদি বিষয় গুলোর ক্ষেত্রে সরকার আরও বেশী যত্নবান হলে প্রবাসিদের কল্যানের সাথে সাথে সরকারের সাফল্যের পাল্লাটাও ভারী হবে।

প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে উল্লেখ করতেই হয়। কয়েক মাস আগে সিলেটের জগন্নাথপুর অধিবাসী ব্রিটিশ প্রবাসী এক ভদ্রলোক শেষ জীবনটা দেশে কাটানোর জন্য গেলে স্থানীয় এমপির সহায়তায় সন্ত্রাসিরা তাকে খুন করে। যা নিয়ে বাংলা নিউজ ২৪.কমে মুক্তমতে আমি লিখেছিলাম। আমার এক বন্ধু দেশে পৌছার আগেই তার বাড়ীতে টাকা দাবী করে উড়ো চিঠি আসতে থাকে। ইলিয়াস ভুঞা নামের এক বন্ধু ঢাকার এক পল্লীতে প্লট রেখে কিস্তিতে দাম পরিশোধ করার পরো বিভিন্ন ভাবে হয়ারানির সম্মুখিন হয়ে দেশের আইনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ। জানি এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু এসবই প্রকৃত বাস্তব যা অভিবাসীদেরকে দেশের প্রতি নেতিবাচকতা সৃষ্টি করতে সহায়তা করে। আশা করি সরকার এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভেবে তুচ্ছ মনে না করে প্রতিরোধে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন।

আজকের এ দিনে একটু ভিন্ন ভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। আমি যেহেতু আয়ারল্যান্ড প্রবাসী তাই এ দেশে বাঙালি অভিবাসীদের কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে সরকারের শরনাপন্ন হতে চাই।

বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে ছাত্র, কর্মজিবী বা অন্যান্য বৈধ অবৈধ পেশাদারী সহ প্রায় পাচ/ সাত হাজারের মতো বাঙালি অভিবাসী বসবাস করছে। সময়ের দাবিতে এখানে গড়ে উঠেছে বাঙালি কমিউনিটি, আত্ম প্রকাশ করেছে আওয়ামীলীগ, বি এন পি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। কিছু দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জার্মানে এলে আয়ারল্যান্ড থেকে আওয়ামী প্রতিনিধি হিসেবে মোনায়েম খন্দকার রানা নেত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে অভিবাসীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ২০০৯-এ ব্রিটেনে বাংলাদেশ হাই কমিশনার ড সাইদূর রহমান খান আয়ারল্যান্ডের লিমরিক সিটিতে এলে স্থানিয় প্রতিনিধি বৃন্দ তার কাছে একটি দাবি-ই তুলে ধরেছিলেন। তা হল আয়ারল্যান্ডে একটি বাংলাদেশ দুতাবাস স্থাপন করা। বিভিন্ন প্রতিকুলতার কথা বল্লেও তিনি আমাদেরকে নিরাস করেননি। কিন্তু অধ্যাবদি আমরা এর কোন পদক্ষেপ দেখতে পাইনি।

কমিউনিটি বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ সকল আয়ারল্যান্ড প্রবাসী বাঙ্গালিদের সরকারের কাছে একটি-ই দাবী তা হল যে কোন মুল্যে এ দেশে একটি দুতাবাস গড়ে তোলা। দুতাবাসের অভাবে এখানে বসবাসরত বাঙ্গালিদের বার্থ সারটিফিকেট সহ পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যাদি নিয়ে জঠিলতার মুখুমুখি হতে হয়। শুধু তাই নয়, একটি দেশ বা জাতির স্বকীয়তা ফুটিয়ে তোলার জন্যও দুতাবাসের ভুমিকা অপরিসীম।

২০০৭-এ মইন-ফখরুদ্দিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে প্রেরন করলে আয়ারল্যান্ড থেকে বাঙালি প্রতিনিধি হিসেবে এই আমি সর্ব প্রথম এ অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে জনকণ্ঠ, সংবাদ, প্রথম আলো, ইনকিলাব সহ আরও কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিবৃতি প্রদান করি। আজকের এ বিশ্ব অভিবাসী দিবসে তাই প্রিয় নেত্রীর কাছে ছোট্ট মিনতি, তিনি যেন আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাঙালি অভিবাসদের এ প্রানের দাবীকে একটু দরদ দিয়ে উপলব্ধি করেন।