ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

সিঙ্গাপুরের নিয়ম অনুযায়ী নতুন কোন এমপ্লয়িকে কাজে যোগদানের আগে শারীরিক যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য মেডিকেল টেস্ট করিয়ে নিতে হয়। সিঙ্গাপুরের আইন বরখেলাপ করে কার সাধ্যি! নিয়মের আওতায় নিজেকে বন্দি করে আমিও মেডিকেল টেস্টের কিউয়ে দাঁড়ালাম। দুদিন অপেক্ষা করতে হয় ফলাফলের জন্য। আর এ অপেক্ষমাণ অবসর সময়টাকে কাজে লাগিয়ে দেখে নিলাম ম্যারিনা ম্যানড্রেন, চাঙ্গি ভিলেজ, বিডক মালে পাড়া সহ সিঙ্গাপুরের আরও বেশ কটি মনোমুগ্ধকর স্থান। কারণ একবার কাজে ঢুকলে যে সে কাজের বৃত্ত থেকে বের হওয়াটাই দায়। সিঙ্গাপুরে এমনো অনেক লোক আছেন যারা একবা কাজে ঢুকেছেন তো দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত কোন দিন ছুটি নেননি বা পাননি।

দেশটি হিউমেন রাইটসের কথা বলে মুখে ফেনা তুললেও বিদেশী শ্রমিকদের উপর তার কার্যকারিতা একেবারেই অবর্তমান। প্রতিদিন রাত ১০ – ১২টা পর্যন্ত কাজ করেও রেহাই নেই। সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারেও বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অবাধ্য হলেই দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ছুতা। প্রকৃত অসুস্ততা বা অসুস্ততার ভান ধরা ছাড়া কারো পক্ষে কাজে না গিয়ে উপায় নেই। সুপারভাইজার বা ম্যানেজার জাতীয় কর্মকর্তারা কিংবা ক্ষেত্র বিশেষ শ্রমিকের এজেন্ট বা মালিক নিজে কাজে অনুপস্থিত ব্যাক্তিকে অশ্লীল গালাগালির মাধ্যমে তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়বেন। তাদের দৃষ্টিতে ওই শ্রমজীবী মানুষটি কোন মানুষ নয়, কেবলই যেন একজন অভাবী শ্রমিক। অনুগত বৃত্যের মতো এ সবই নিরবে নিভৃতে হজম করে তাদের করুনা নিয়ে চলতে হয় প্রবাসীদেরকে কেবলই তার বা তার পরিবারের সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের তাড়নায়।

দেশে ছুটিতে গিয়ে যখন এই লোকটি বিদেশী পারপিউমের গন্ধে মাতোয়ারা করে তুলেন তখন তার বাহ্যিক চাকচিক্য ও জৌলুস দেখে কেউ তার অন্তরজ্বালাকে উপলব্ধি করতে পারেনা। প্রবাসী ব্যক্তিটি আত্মমর্যাদা বোধ ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক সময় তার জ্বালাময়ী ব্যাথার কথা এড়িয়ে যান কিংবা আপনজনদের দুঃখ বাড়বে ভেবে তাদের সাথেও বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা পাহার সম দুঃখটাকে শেয়ার করতে চাইলেও করা হয়ে উঠেনা। যাদের সুখের জন্য এত ত্যাগ তিতিক্ষা, এত জ্বালা যন্ত্রনা, এত অনাদর অবহেলা সহ্য করেও কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে প্রবাসময় জীবন কাটাতে হয় সেই ভালোবাসার মানুষ গুলোকে কি নিজের দুঃখের কথা শুনিয়ে দুঃখ দেয়া যায়! যায়না। তাই সকল দুঃখকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে প্রবাসীরা। একেকটি সূর্যাস্ত দেখে আর ভাবে, এই বুঝি জীবন থেকে আরেকটি দুঃখের দিন গত হল।

কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ক’জন প্রবাসী সুখের মুখে হাত বোলাতে পেরেছে? যে সুখের জন্য এত সংগ্রাম, এত দৌড় ঝাপ দিয়ে মা মাটি স্বজন ছেড়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এসে নতুন আরেক ভুবনের বাসিন্দা হতে হয়েছে, সেই সুখ নামের সোনার হরিণটির নাগাল যে অধিকাংশ প্রবাসী-ই পায়নি। এ ব্যর্থতার কথা, এ অক্ষমতার কথা বলে সজনদের কাছে বলে যখন ঠাই পাওয়া যায়না তখন তাদের কাছে জীবন বড় অসহ্য মনে হয়। সহানুভুতির পরিবর্তে যখন তারা সন্ধিহান দৃষ্টিতে বিদ্রুপের বান ছুঁড়ে তখন প্রবাসীদের দুঃখের সীমা থাকেনা। সকল দুঃখ যন্ত্রনাকে প্রবাসীরা বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রখতে পারলেও স্বজনদের নির্দয় হেয়ালিপনা বা অবমূল্যায়নকে কোন ভাবেই সহজে মেনে নিতে পারেনা। অনেক দুঃখের মধ্যে এটাও প্রবাসীদের এক বিরাট দুঃখ।

বিশ্বের সকল দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল প্রবাসীদের দুঃখের জাতরেখা প্রায় একই। ক্ষেত্র বিশেষ দুএকটি ভিন্নতা থাকলে থাকতেও পারে। সে যা হোক, বলছিলাম সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের কথা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি যেহেতু প্রবাসী কর্মীদের কপালে জুটেনা তাই তারা যতোটুকু অবসর সময় পান সেটাকেই উপভোগ করতে চেষ্টা করেন। আর যাই হোক রবিবারদিন অন্তত বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করে হলেও পার পাওয়া যায়। তাই ওইদিন তাদের আনন্দের সীমা থাকেনা। কন্সট্রাকসান সাইটে শ্রমিকদের আবাসস্থলে গেলে তাদের আনন্দের গভীরতা উপলব্ধি করা যায়। মনে হবে, ঈদের আনন্দে উদ্বেলিত সবাই। দেখা যাবে কেউ সেভ করছে, কেউ জুড় আওয়াজে গান শুনছে, কেউ টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত, কেউবা ট্যাক্কা মার্কেটে গিয়ে বন্ধু-বান্ধব বা কাছের লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে অথবা দেশে টাকা পাঠাতে উদগ্রীব।

“ট্যাক্কা মার্কেট” শব্দটা নিয়ে একটা ছোটখাটো ফিরিস্তি আছে। এর প্রকৃত নাম সেরাঙ্গন রোড অথবা মস্তোফা ফ্লাজা। প্রতি রবিবার বাঙ্গালীরা এখানে এসে জমায়েত হয়। বন্ধু-বান্ধব বা স্বজনদের সঙ্গে সুখদুঃখের কথা বলে নিজেকে হাল্কা করার চেষ্টা করে। ওখানেও আমাদের দেশী ভায়েরা জেলা ভিত্তেক কয়েকটি জায়গা নির্বাচন করে নিয়েছেন। যেসব জেলার লোকেরা যে জায়গায় গিয়ে জমায়েত হয়ে আড্ডা দেন সে জেলার নামানুসারে ঐ জায়গাটির একেকটি আনঅফসিয়াল নামকরন তারা করে ফেলেছেন। যেমন টাঙ্গাইলের লোকেরা যেখানে আড্ডা দেন সেটাকে বলা হয় টাঙ্গাইলের মাঠ, আবার ঢাকার লোকদের জন্য ঢাকা মাঠ ইত্যাদি।

এবার ফিরিস্থির কথাটি বলি। সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত বাংলাদেশের সকল লোকেরাই বিশাল আয়তন বিশিষ্ট সেরাঙ্গন রোডের ঐ জায়গাটিতে মিলিত হয়। চা পানি খায়। বাংলা পত্রিকা পড়ে। গল্প গুজব করে। এসবের পাশাপাশি যাদের দেশে টাকা পাঠানোর দরকার তারা হুন্ডির মাধ্যমে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) টাকা পাঠায়। সে সুত্রে টাকার লেনদেন হয়। আর এর রেশ ধরেই বাঙ্গালীরা এর নামকরন করে “ট্যাক্কা মার্কেট” যা কিনা এখন তা স্থানীয়দের কাছেও বিস্তার লাভ করার মাধ্যমে একটি সার্থক ও গ্রহণযোগ্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

বাঙ্গালীদের এ মিলন মেলায় ঢুকলে বুঝা যাবেনা আমরা বিদেশ বিবুইয়ে পরে আছি। যে যত সমস্যা বা কষ্টের মধ্যেই দিনাতিপাত করুকনা কেন অন্তত পক্ষে রবিবার ট্যাক্কা মার্কেটের সন্ধ্যাটা বাঙ্গালীদের তাবৎ দুঃখ যাতনাকে ক্ষনিকের জন্য হলেও ধুয়ে মুছে দিয়ে যায়। বন্ধুর প্রতি বন্ধুর, স্বজনের প্রতি স্বজনের, দেশীর প্রতি দেশীর সর্বোপরি বাঙ্গালীর প্রতি বাঙ্গালীর মমত্ববোধ যে কত শক্ত তা ওই বিশেষ জায়গাটিতে না গেলে অনুভব করা যাবেনা। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গালি সম্প্রদায় ওখানে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট যে গুলোতে রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সমাহার। বাঙ্গালীরা ঘরে ফেরার পথে কিনে নিয়ে যায় দেশীয় শাকসব্জি থেকে শুরু করে মাছ মাংশ সহ আরও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস। কিছু দুষ্কৃতিকারীদের দুষ্ট রোগে যে জায়গাটি ভুগছেনা তা নয়, তারপরো সামগ্রিক ভাবে আমি বলতে পারি, ট্যাক্কা মার্কেট শুধু টাকা লেনদেন করার নিচক বাজারই নয় এ এক সুখ দুঃখ বহনকারী, শান্তি দানকারী, হাজারো সমস্যা সমাধানকারী বাঙ্গালীদের এক তীর্থ মিলন স্থান।