ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

আমার এক আইরিশ বন্ধুর বড় আক্ষেপ, এবার তারা হোয়াইট খ্রিষ্টমাস পালন করতে পারছেনা! আমাদের দেশে হাড় কাঁপানো শীতের কামড়ে অনেক লোকের দুঃখজনক ভাবে মর্মান্তিক প্রানহানি ঘটলেও শীতল দেশ বলে পরিচিত আয়ারল্যান্ডে এবার রিয়েল “আইরিশ শীত” বলতে যা বুঝায় তার কিঞ্চিত পরিমানও স্থানীয় লোকজন অনুভব করতে পারেনি। এতে হিটিং ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তেল ও গ্যসের খরচ বাঁচিয়ে যে আর্থিক সাশ্রয় লাভ করা যাচ্ছে তাতে আমার মতো “ব্রাউন” জাতীয় অনেকেই প্রকৃতির কাছে শুকারানা আদায় করলেও “হোয়াইট ম্যান” জাতীয় লোকেরা বেশ অসন্তুষ্ট, সন্দেহ নেই।

বেশ ক’বছর যাবত আয়ারল্যান্ডে দেখা যাচ্ছে, খ্রিষ্টমাসের (বড়দিন) দু একদিন আগে থেকে নিউইয়ার (ইংরেজি নববর্ষ) পর্যন্ত শীতের মাত্রা বেড়ে যায় প্রকট ভাবে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে চলে এসে দাড়ায় মাইনাস ফাইভ থেকে টেন-টুয়েল্ভ-ফিফটিন এমনকি আরও বেশী। ফলে অনবরত ঘটে তুষারপাত। রাস্তাঘাট, গাছপালা, বাড়ি-ঘরের ছাঁদ তথা সবকিছুই ঢেকে যায় তুষারের শুভ্রতায়। মনে হয় প্রকৃতি সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। এ শুভ্রতার আবেশে বিমুগ্ধ হয়ে স্থানীয় লোকেরা পা ফেলায় ছড়িয়ে থাকা তুষারের গভীর প্রলেপের ভেতর। খেলায় মেতে উঠে শিশু বয়স্ক তথা সবাই। শুভ্র তুষারের মতোই স্নিগ্ধতায় ভরে উঠে তাদের মন। হিমাঙ্কের নিচে দাঁড়িয়ে এ উচ্ছল মনে শুভ্রতার ভেতর যে ধর্মীয় উৎসব তারা পালন করেন তাই তাদের কাছে “হোয়াইট ক্রিসমাস” বলে পরিচিত।

এ ধরনের একটা হোয়াইট ক্রিসমাসকেই তারা এবার “মিস” করছেন। শীতের তীব্রতা, অনবরত স্নো বা আইস পতিত হওয়ার ফলে বাস, ট্রেন থেকে শুরু করে বিমান চলাচল পর্যন্ত বন্ধ থাকে। রাস্তা ঘাটে দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে যায়। পাইপ গুলো বরফে আচ্ছাদিত হয়ে পানির লাইন বন্ধ হয়ে যায়। জন জীবনে নেমে আসে দুর্গতির কালো ছায়া। এ সব বিভিন্ন প্রতিকুলতার ভেতরেও তারা প্রান চাঞ্চল্যে মেতে উঠেন, জীবনের গান গেয়ে বরন করে নেন হলি হোয়াইট খ্রিষ্টমাস।

অথচ আমার বন্ধুটির মতো উঠতি বয়সের অনেক আধুনিক তরুন তরুনীরই ধর্ম নিয়ে একদম মাথা ব্যাথা নেই। উপরন্তু রোমান ক্যাথলিক বলতে যাদের বুঝায় তাদের কেউ সার্চে গিয়ে প্রার্থনা করলে “ব্যকডেটেড” বলে ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসতেও দ্বিধাবোধ করেনা। দুদিন আগে আমার অন্য আরেক স্লোভাকিয়ান সহকর্মী তার নাস্তিকতার কথা জানিয়ে বলে, ধর্ম মানেই কতগুলো অযাচিত বিধি নিষেধ যা মানুষের মুক্ত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক বিরাট দেয়াল। সে দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকার নাম কোন জীবন হতে পারেনা। নির্জীব জীবনের সার্থকতা কোথায়!

জীবনের সার্থকতা নামক কষ্টি পাথরে ধর্ম আজ উপেক্ষিত। কোন ধর্ম বা ধর্মাবলম্বীকে হেয় প্রতিপন্ন করার মতো মনমানসিকতা তাদের না থাকলেও ধর্মীয় বন্ধনে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখতে যতো আপত্তি তাদের। হোয়াইট খ্রিষ্টমাস নিয়ে বেশ মাতামাতি করলেও যে ধর্মকে লালন করার মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টমাসের (বড়দিনের) প্রকৃত সার্থকতা নিহিত সে ধর্মকেই তারা অধর্মের তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলে। কে শোনাবে তাদের ধর্মীয় নীতি বা মূল্যবোধের কথা! খ্রিষ্টীয় জগতের পোপ বা ধর্মযাজকদের প্রতি সত্যি আমার মায়া হয়।

আমার এ সহকর্মী তরুণ আমাকে মুসলিম জেনেও আমরা খ্রিষ্টমাস আনুষ্ঠানিক ভাবে পালন করি কিনা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করে। সাম্প্রদায়িকহীন একটি সমাজ ব্যবস্থা সম্পন্ন আমাদের দেশটির কথা তাকে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। ছোট বেলায় বিভিন্ন সংক্রান্তিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়ীতে গিয়ে নিমন্ত্রনের মুল্যায়ন করতে হতো কিংবা বড় দিনে আমরা খ্রিষ্টান ভাইদের বাড়ীতে গিয়ে তাদের ধর্মোৎসবকে সার্থক করে তুলার কথা অথবা তারাও মুসলিমদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে যোগদান করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্তের বন্ধন সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়, এসব ধর্ম বিষয়ক মৌলিক জিনিস গুলো ব্যখ্যা করে তাকে বুঝাতে চেয়েছি, মুসলিমরা প্রত্যক্ষ ভাবে অন্য ধর্মীয় উৎসব পালন না করলেও তা সার্থক ভাবে পালিত হওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক ভুমিকা পালন করে। আমার এ উদারতার কথা শুনে সে যথেষ্ট খুশি হল।

তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম, ধর্ম কেবল মানুষকে বিধি নিষেধের ভেতর বন্দি রেখে জীবন যন্ত্রনাময় করে তুলেনা। বরং জীবনের প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করার জন্যই ধর্ম প্রদত্ত কিছু বিধিমালা। যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে উদারতা, ভ্রাতৃত্ত বোধ, মহানুভবতা তথা স্বচ্ছ জীবন যাত্রার এক উদাত্ত আহবান।

খ্রিষ্টমাস ও নিউইয়ার উপলক্ষে আমাদের এক সপ্তাহের ছুটি। বাড়ি ফেরার পথে সহকর্মী বন্ধুটি আমাকে “হেভ এ হ্যাপি খ্রিষ্টমাস” বলে বিদায় নিতে চাইলে আমি তাকে তার ধর্মহীনতার কথা মনে করিয়ে দেই। যার কোন ধর্মই নেই সে কিসের আদলে ধর্মের লেজ টেনে “ধর্মীয় উইস” জানায়। আমার নিরস কথা শুনে ম্রিয়মাণ লজ্জায় লাজুক হাসি হাসে। বলে, ধর্মে আমার পাণ্ডিত্য বা আসক্তি কোনটাই নেই। অতসব আমি বুঝিনা, বুঝতেও চাইনা। আমাদের সহজ হিসেব- পাবে গিয়ে বিয়ার গিলবো, হৈ হুল্লুর করে রাত কাটাবো। ঘুম থেকে উঠে দেখবো এক খণ্ড শুভ্রতার ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রেখে ঘুমিয়ে আছে দিনের প্রকৃতি। আমরা বলবো- “হ্যাপি ক্রিসমাস, হ্যাপি হোয়াইট ক্রিসমাস। দেটস ইট —“।