ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

আজ যে সূর্যোদয় নতুন দিনের সুচনা ঘটাল কাল তাই গত। এভাবেই একেকটি দিন, মাস, বছর বিলীন হয়ে যাচ্ছে মহাকালের অন্তিম গর্ভে বিলীন হয়ে আমাদের মাঝে নিয়ে আসে একেকটি নতুন বছরের। সুচনা ঘটায় শুভ নববর্ষের।

কিছুক্ষন পরেই ঘড়ির কাঁটা টিক টিক আওয়াজে চিরাচরিত রেওয়াজ অনুযায়ী আকাশে বাতাসে জানিয়ে দেবে নতুন বছরের খবর। উল্লসমুখর জনতা, কোলাহল মুখর প্রকৃতি অকৃত্তিম ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে নেবে প্রানের নববর্ষকে। সাধ ও সাধ্যিমত সবাই জানাবে শুভেচ্ছা ও সাধুবাদের নব বার্তা। “শুব নববর্ষ” “শুভ নববর্ষ” তথা “হ্যাপি নিউ ইয়ার” বলে আকাশ বাতাসে তুলবে কম্পনের রোল।

আমিও সবার সাথে এ আনন্দ ঘন মুহূর্তটাকে কাজে লাগিয়ে সুর মিলিয়ে সবাইকে বলতে চাই – শুভ নববর্ষ- হ্যাপি নিউ ইয়ার।

আজ কোন সিরিয়াস বা বিশ্লেষণাত্মক লিখা না লিখে একটু ভিন্ন ভাবে নিউ ইয়ারকে আলোকপাত করে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হরেক রকমের মানুষের কাছে শুভ নব বর্ষ কিভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে বা সৌভাগ্যের সওগাত নিয়ে আবির্ভূত হয় তারই সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আঁকতে চেষ্টা করবো।

পুয়েটরো রিকোতে ছেলেমেয়েরা মধ্যরাতে ঘরের জানালা দিয়ে পানি নিক্ষিপ্ত করার মধ্য দিয়ে এক ধরনের মজা পায় এবং তাদের অনেকের ধারনা শয়তান বা ভুত পেত্নীর দৌরাত্ম্য থেকে নিষ্কৃতি পেতেও তা কাজে লাগে।

স্পেনে ঘরির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁয়ার সাথে সাথে তারা ১২টা আঙ্গুর ফল নিয়ে খেতে শুরু করে। ১২ মাসের সমন্বয়ে একেকটি বছর বিধায় প্রতিটি আঙ্গুরকে প্রতি এক মাসের সৌভাগ্যের প্রসাদ মনে করে তারা খায়।

সুইজারল্যান্ডের জনগন মনে করে, নব বর্ষের দিন ঘরের মেঝেতে এক ফুটো পনীর নিক্ষেপ করনের মাধ্যমে নিজেদের সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনা যায়।

সৌভাগ্য ও সুসাস্থ্যের জন্য ফ্রান্সের লোকেরা নব বর্ষের দিন এক ধরনের পিঠা খায় যা সাধারনত কোন কড়াই বা সাঁচে তৈরি করা হয়।

বেলজিয়ামে নিজেদের সৌভাগ্যের কথা বিবেচনা করে কৃষকরা তাদের পালিত পশু দিগকে “শুভ নববর্ষ” বলে প্রার্থনা করে থাকে।

আর্মেনিয়ার মহিলারা নব বর্ষের রাতে তার পরিবারের জন্য বিশেষ এক ধরনের হাতরুটি বানায়। হাতে ঠেসে বানানো এ রুটিটিই তাদের সৌভাগ্যের মূর্ত প্রতীক।

উত্তর পর্তুগালে ছেলেমেয়ারা নব বর্ষের রাতে বাড়ি বাড়ি স্তবগান (ভক্তি গীতি) গেয়ে বেড়ায়। আবেগ তাড়িত জনগন তাদেরকে পয়সা দিয়ে বরন করে নেয়। তারা সাধারনত পুরনো আমলের গান গায় যে গুলোকে বলা হয় “জানিরস” যা নিয়ে আসে প্রতিটি মানুষের দুয়ারে পরম সৌভাগ্যের বানী।

রুমানিয়াতে রয়েছে এক ভিন্ন ধর্মী ঐতিহ্য। তারা মনে করে নব বর্ষের রাতে পশুপাখি একে অন্যের সাথে কথা বলে। সে কথা কেউ শুনতে পেলে নির্ঘাত দুর্গতি কপালে। তাই তারা ওই দিন যদি কোন পশু পাখির কথা না শুনে তাহলে তাদের কাছে মনে হয় যেন তারা পুনর্জীবন ফিরে পেয়েছে।

বলিভিয়াতে খড় বা কাটের পুতুল তৈরি করে বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়। যা নিয়ে আসে তাদের জন্য শান্তি ও সৌভাগ্যের পয়গাম।

আমাদের দেশের মতো পাশ্চাত্যের অনেক দেশে এ ধারনাও বিদ্যমান যে, বছরের প্রথম দিনের উপরই নির্ভর করে অন্যান্য দিনের ভাল মন্দ। ওই দিন যে যেভাবে দিনটাকে উপভোগ করে অর্থাৎ চলা ফেরায়, খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে যে ভাবে প্রথম দিন শুরু করা হয় ঠিক সেভাবেই সারাটা বছর কাটাতে হয়। আর সে কারণে বন্ধুবান্ধব ও পরিবার পরিজন নিয়ে নবর্ষের ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই অর্থাৎ মাজ রাতের প্রথমার্ধেই সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী ও পানীয়র মাধ্যমে নববর্ষকে বরন করে নেয়া হয়।

কিছু কিছু দেশে নববর্ষ উপলক্ষে কিছু ঐতিহ্য বাহী খাদ্যের প্রচলন রয়েছে। তারা মনে করে, প্রতিটি নতুন বছরই বৃত্তাকারের আদলে ঘুরে আসে আমাদের মাঝে; তাই বৃত্তাকার যে কোন কিছুতেই লুকিয়ে আছে সৌভাগ্যের ছাবিকাটি। এ ধারনাকে উপলব্ধি করেই ডাচ (নেদারল্যান্ড) অধিবাসীরা“দুনাট” নামে এক ধরনের গোলাকার পেস্ট্রি (ডেনিশ জাতীয়) খেয়ে থাকে।

আমেরিকার একটি অংশ শুকরের মাংশের সাথে মোটরশুটি জাতীয় সব্জি মিশিয়ে খাওয়ার মধ্য দিয়ে নব বর্ষ উদযাপন করে এবং এর মধ্য দিয়েই তারা সৌভাগ্যকে খুঁজে নিতে চেষ্টা করে। কিছু কিছু লোক ভাত ছাড়াও পাতাকপি ও এর পাতার মধ্যে সৌভাগ্য লিপি দেখতে পায় কারণ পাতাকপির পাতাকে কাগজের টাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

এভাবেই দেশ বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় যুগ যুগ ধরে জাতিভেদ নির্বিশেষে স্বীয় ঐতিহ্যের দামামা বাজিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় নব বর্ষকে বরন করে নেয় পরমানন্দে। অতীত হিংসা দ্বেষ, ক্লেশ, বিরহ বেদনা, ব্যর্থতা সব কিছু ভুলে নতুন বছরকে বুকে ধারন করে নতুন মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার শপথে বিলীন করে দেয় নিজেদেরকে।