ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবী করেন এমন অনেক স্বজনের কাছে “মানবতাবিরোধী”, “যুদ্ধাপরাধী” বা “রাজাকার” শব্দগুলোর সংজ্ঞা বা ডেফিনেসান নিয়ে বেশ সংশয় রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, “যারা তার স্বদেশ মাতাকে বলাৎকার করেছে বা করতে সাহায্য করেছে, আদুরে বোনের সম্ভ্রম লুঠে নিয়েছে নির্মম হাসিতে, ভাইয়ের বুকের রক্ত দিয়ে মিটিয়েছে রক্ত পিপাশু নেশা, সবুজের ভেতর এঁকে দিয়েছিলো রক্ত কলংকের দাগ, চিরতরে সাহিত্য সংস্কৃতি তথা দেশের স্বকীয় ঐতিহ্যকে হত্যা করার জন্য জন্ম দিয়েছিলো ১৪ ডিসেম্বরের মতো একটি কালো অধ্যায়ের তারাই হল আজকের রাজাকার, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী।

এ রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধীদের কার্যক্রম অদ্যাবধি সক্রিয় গতিতে চলছে। প্রতিনিয়ত এর পরিধি ও পরিসরের বিস্তৃতি ঘটে চলছে। ওদের নির্লজ্জ বেহায়াপনা সমাজের প্রতিটি স্থরে এখনো বিদ্যমান। ৭১ সালে শান্তিবাহিনীর কমিটিতে নাম লিখিয়ে পাকি সেনাদের আশীর্বাদে কোন কিছুরই তোয়াক্কা না করে বাংলার মাটিতে বর্বর অরাজকতার মাধ্যমে যে কলঙ্ক তিলক লেপন করেছিলো, সেই ধারাবাহিকতা এখনো স্বাধীন বাংলার মাটিতে বহাল তবিয়তে বীর দর্পে চালিয়ে যাচ্ছে ওইসব রাজাকার ও রাজাকার বাচ্চারা (রাজাকার উত্তরসূরি)।

দেশ ও জাতিস্বত্বার বুকে পদাঘাত করে স্বাধীন বাংলায় রাজাকাররা গাড়িতে কেবল পতাকাই পত পত করে উড়িয়ে বেড়ায়নি, সমাজের প্রতিটি স্তরে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে ওদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। শিক্ষাঙ্গন, আদালতপারা, সামরিক বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি ধাপেই লুকিয়ে রয়েছে ওদের একান্ত আপনজন, পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। আর তাদের বদৌলতেই বুক ফুলিয়ে একাত্তরের চেয়েও ভয়াবহ নারকীয় কাণ্ড ঘটানোর দুঃসাহস দেখাতে পারছে আজকের স্বাধীন বাংলায় জুনো মিয়াদের মতো রাজাকার সন্তানরা।

দু তিন সপ্তাহ আগের কথা। এটিএন বাংলায় “বিবেকর প্রশ্ন” নামক অনুষ্ঠানটি দেখে আমার গা শিহরিয়া উঠেছিল। এ যেন আরেক একাত্তরের গল্প। ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানায় (দুঃখিত, গ্রামের নামটি ভুলে গেছি)। জুনো মিয়া নামের এক মধ্য বয়সী লোক যার বাবা ছিল ওই এলাকার শীর্ষ রাজাকার। রাজাকারির কেরামতিতে তার বাবা নিজেকে রাজাতে পরিনত করতে সক্ষম হয়েছে। সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরো সে রাজত্যের হাল ধরে রেখেছে তারই গুনধর পুত্র জুনো মিয়া। তার ক্ষমতার দাপটে সেখানকার আকাশ বাতাস কেঁপে উঠে। প্রশাসন যেন ব্যস্ত বিভুর ভগবানের পুজোতে।

গ্রামের জেলে তথা দরিদ্র মানুষের সাথে মাছ ধরা অথবা এ জাতীয় কোন বিষয় নিয়ে জুনো মিয়া উঠে পড়ে লাগে। গ্রামের নিরীহ লোকেরা আইনসিদ্ধ ভাবে নদিতে মাছ ধরতে গেলে সে স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বন্দুক হাতে নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে। তার আগমনের খবর শুনে ভীত সন্ত্রস্ত গ্রাম বাসী অনেকেই পালিয়ে যায়। মহিলা ব্যতিত পুরুষদের কাউকে না পেয়ে সে বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এক যুবতী মহিলার কান্না দেখে বুঝা যায় তার শ্লীলতা হানি (ধারনা) ঘটেছে যদিও টিভির ক্যমেরায় তার প্রকাশ ঘটেনি। অন্য আরেক গর্ভবতী মহিলা এটিন বাংলার ঈগল টিমকে তার পেটে সজোরে লাথি মারার কথা কেঁদে কেঁদে জানায়। সমস্ত গ্রাম ভেসে যায় কান্নার রোলে। অসহায় আর্তনাদ আর চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে ওখানকার বাতাস। এ যেন চল্লিশ বছরের পুরনো দেশটিতে আরেকটি একাত্তর, যেখানে জুনো মিয়া মানবতা ও মানবাধিকারকে পিষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে প্রমান করতে সক্ষম হয়েছে কুলাঙ্গার রক্তের ধারা এখনো প্রবাহমান তার শিরা উপশিরায়।

সময়ে অসময়ে স্বাধীন দেশের বিভিন্ন জায়গায় আনাচেকানাচে রাজামন্ত্রি, নেতানেত্রি তথা প্রশাসনের নাকের ডগায় এ ধরনের বহু জুনো মিয়ারা তাদের পূর্ব সূরীদের আদর্শকে ধরে রেখে তাণ্ডব নৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে অনায়েসে। এর উৎস বা শক্তি কোথায়? গোলাম আযম গংদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর চেয়েও এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরী বলে আমি মনে করি। শুধু চিহ্নিত কয়েকটি কুলাঙ্গারকে ফাসি দিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করার মধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সার্থকতা নিহিত নয়, এ প্রক্রিয়াকে সার্থকতার স্বর্ণশিকরে নিয়ে যেতে হলে ওইসব চিহ্নিতদের পাশাপাশি জুনোদের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাজাকার বা রাজাকার প্রজন্মকে ধরে এনে বিচারের কাটগরায় দাঁড় করাতে হবে। এ জন্য সরকারের একক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, সহযোগী ভুমিকায় বিরোধী দল সহ সচেতন জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।

যুদ্ধাপরাধী রাজাকারশিরমনি গোলাম আযমের গ্রেফতারে অনেকে আনন্দের বন্যায় ভেসেছেন, ‘হুররে হুয়া’ চিৎকারে আকাশ কাঁপিয়েছেন, ঘরে বাইরে একদল লোক মিষ্টি বিতরন করেছেন। এতো আনন্দের মাঝেও কেন জানি আমি আনন্দে উদ্বেলিত হতে পারিনি। মনের ভেতরে একটি শঙ্কা কাজ করছে সারাক্ষন। পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য সহ আন্তর্জাতিক রাজাকার দালাল চক্র ও দেশে বিএনপি ও সমমনাদের রাজাকার প্রীতি এবং দেশ বিদেশের বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বিচারকার্য বিঘ্নিতকরনে ওঁত পেতে থাকা রাজাকার দোসরদের শক্তিশালী কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত সরকারকে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছতে দেবেতো?

ভয় হয়! গতকাল প্রগতিশীল মনের আমার এক বন্ধু ফেসবুকে এক মন্তব্য পড়ে ওই পাপিষ্ট গোলামের প্রতি যথেষ্ট সদয়ী হয়ে উঠে। দরদী বা দয়াশীল মনোভাব অবশ্যই ভাল গুন। তবে চক্রান্তকারীদের উস্কানিমুলক মন্তব্যের আলোকে আবেগে আপ্লুত হয়ে সারাজিবনের আদর্শিক নৈতিকতা থেকে সড়ে দাঁড়ানো মোটেও কল্যানকর নয় বরং তা সমাজ, দেশ বা জাতির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কারণ আমার এ বন্ধুটির মতো অন্যদের মাঝেও যে এসব সংক্রমিত হচ্ছেনা তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে!

খবরের কাগজে, ব্লগে বা অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ্স-এ আজকাল আসিফ নজরুল নামে এক বুদ্ধিজীবীর (অনেকের মতে জ্ঞান পাপী) রাজাকার প্রীতির খবর দেখা যাচ্ছে। রাজাকারদের প্রতি তার দরদ যেন উৎলে উঠেছে। কিছুদিন আগে বিভিন্ন সভা সেমিনারে বিএনপি নেত্রীও কোন রাখঢাক না রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি তার দরদের কথা বলেছেন। বিভিন্ন “কৌশলী শব্দ” ব্যবহার করে এখনো তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যকে বানচাল করার পায়তারা করছেন। তার আহ্লাদেই ওরা নিকট অতীতে মন্ত্রিত্তের স্বাদ ভোগ করেছে, মিডিয়ার সামনে বাঁকা ঘারে– “এ দেশে কোন যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার নেই” বলার মতো ধৃষ্টতা দেখাতে পেরেছে।

ইতিহাস কোন কিছুই ভ্রুক্ষেপ করেনা। নিজস্ব গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। তাইতো গোলাম আযম সহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরা আজ কারাগারে নিক্ষিপ্ত। আমজনতার প্রানের দাবী- ওদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করা হোক। তাই বিএনপি ও সমমনা দল এবং আসিফদের মতো মৌলবাদ ও পোষ্য বুদ্ধিজীবীদের বলতে চাই, জামাত প্রীতি দেখান, আপত্তি নেই। দয়া করে রাজাকার প্রীতি দেখিয়ে দেশটাকে আর কলঙ্ক কালিমায় লেপে রাখবেননা। এখনো সময় আছে, ইতিহাসের আস্তাকুরে নিক্ষিপ্ত হবার আগে নিজেদেরকে শুধরে নেয়ার।