ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

টাইটানিক নিয়ে যেমন গল্পের শেষ নেই ঠিক তেমনি এ নিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে কৌতূহলেরও কমতি নেই। অনেক দেশি বিদেশী বন্ধুদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তার প্রমান মেলে অতি সহজেই। আমাদের দেশের কথাতো বলাই ভার! আমার এখনো মনে আছে, প্রায় পনের ষোল বছর আগে দেশে থাকাকালীন ঢাকার মধুমিতা হলে আমার এক মালদার বন্ধুকে নিয়ে টাইটানিক ছবিটি দেখতে গিয়েছিলাম। আমার মতো অর্ধ বেকারের পক্ষে যেহেতু চড়া দামে টিকেট ক্রয় করে ছবিটি দেখা বেশ কষ্টকর ব্যাপার ছিল তাই মালদার বন্ধুটিকেই “অন্ধের যষ্টি” ভেবে সেদিন নিয়ে গিয়েছিলাম। ছবি শুরু হওয়ার ঘণ্টা দেড়েক আগে পৌঁছেও টিকেট পাওয়া যায়নি। এক সাংবাদিক বন্ধুর চেষ্টায় টিকেট না পেলেও এতোটুকু জানতে পেরেছিলাম, ঘণ্টা দুই আগে তো দুরের কথা; প্রতিটি শোর টিকেট দু একদিন আগেই দশগুন বেশী হারে ব্ল্যাকমেলে বিক্রি হয়ে যেতো।

মালদার বন্ধুটির মাল আর খোয়াতে হয়নি। বেশ আপসোস ও আক্ষেপ নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম। ছবিটি আর দেখার সুযোগ হয় উঠেনি। বছর খানেক বাদে জীবন-জীবিকার তাগিদে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কিছুদিন পর গিয়ে দেখি ওখানকার বিডক হলে টাইটানিক ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছে। আর ঠেকায় কে! অর্থ, সময় ও সুযোগ সবই হাতের মুটোয়। ব্ল্যাকমেলে টিকিট বিক্রি বা কেনার আশঙ্কাও নেই। দু’বন্ধুকে নিয়ে উইকেন্ডের মাঝরাতে ছবিটি দেখে বেশ আবেগাপ্লুত হই। মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকি ছবির পর্দায়। হৃদয়ে দাগ কাটে, রেখাপাত করে মর্মস্পর্শী ভাবে। সেই থেকে টাইটানিকের ভক্ত।

সময়ের আদলে মানুষের অনেক কিছুর বদল হয়। কিন্তু টাইটানিকের প্রতি আমার ভক্তি বা দুর্বলতার কোন হেরফের হয়নি। তাই এখনো ছুটে যেতে চেষ্টা করি টাইটানিকের স্মৃতি বিজড়িত জায়গা গুলোতে। এইতো সেদিন বন্ধু মোশাররফকে নিয়ে ঘুরে এলাম এমনি একটি জায়গা যা এখনো বহন করে চলছে টাইটানিকের শেষ নোঙ্গরের স্মৃতি।

জায়গাটির নাম কবহ। এটি রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডের একটি ছোট্ট বন্দর শহর। যা কিনা কর্ক কাউন্টির (জেলা) অন্তর্ভুক্ত। জায়গাটি কর্ক সিটি থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে যেতে হলে সিটি থেকে ডাবলিন রোড ধরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কিছুক্ষন ড্রাইভ করার পর বেশ বড় এক জংশনের মুখুমুখি হতে হবে। সেখান থেকে সোজা ওয়াটারফোর্ড হাইওয়ে দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ফোটা আইল্যান্ডের ভেতর দিয়ে ছোট নদী বা লেকের তীর ঘেঁসে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কিছুক্ষন ড্রাইভ করার পরই পৌঁছে যাওয়া যায় কাঙ্খিত গন্তব্যে।

টাইটানিকের আমলে কবহ বন্দরটি কুইন্সটাউন হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে অর্থাৎ ১৯১২ সালে ১১ এপ্রিল সকাল সাড়ে এগারোটায় টাইটানিক আয়ারল্যান্ডের কবহে নোঙ্গর করে। নোঙ্গরস্থল থেকে অপেক্ষমান যাত্রীদের তাঁবুর দূরত্ব ছিল মাইল খানেক। তাবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে ফেরিযোগে গমনেচ্ছুক যাত্রীদের টাইটানিকে আরোহণ করতে হয়েছিলো। কুইন্সটাউন অর্থাৎ বর্তমান কবহ বন্দর থেকে আইরিশ ও আমেরিকান মিলে ভ্রমণকারী যাত্রির সংখ্যা ছিল ১২৩ জন। তন্মধ্যে তিনজন প্রথম শ্রেণীর, সাতজন দ্বিতীয় শ্রেণীর ও বাদবাকি অন্যরা সাধারন শ্রেণীর যাত্রি হিসেবে সমুদ্র যাত্রার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন।

বর্তমানে যেখানে হ্যারিটাইজ সেন্টারটি অবস্থিত সেখানে তখন মেইলট্রেন দাঁড়াত। যাত্রীদের বোর্ডিংএর কাজ শেষ হলে সেখান থেকে মেইলবেগ এনে ফেরিতে তুলা হয়। ফেরীতে যাত্রী দেখভাল করে এমন দুজন ব্যাক্তি বড়ো লোক যাত্রীদের কাছ থেকে কিছু পয়সা কামানোর ধান্দায় সুনিপুন কারুকার্য সম্বলিত স্থানীয় ঐতিহ্য নির্ভর কিছু ফিতা ও হস্তশিল্প জাতীয় (Lace and Crafts) জিনিস নিয়ে তারাও টাইটানিকের যাত্রী হিসেবে আরোহণ করে। ১৩০৮জন যাত্রী ও ৯৯৮ জন নাবিক মিলে মোট ২২০৬ জন লোক নিয়ে পরিশেষে টাইটানিক নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে আটলান্টিকের বুক ছুঁয়ে যাত্রা শুরু করে।

যাত্রীরা যেখানে জড়ো হয়েছিলো কিংবা যে তাবু ডিঙ্গিয়ে ফেরীতে উঠেছিল টাইটানিকে আরোহণের জন্য সে তাঁবুটি এতদিন মিউজিয়াম হিসেবে পতিচিত থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। স্থানিয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এটি অতি সত্বর রেস্টুরেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে যার নামকরন করা হয়েছে টাইটানিক রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টটির প্রধান ফটকের উপর গোলাকৃতির কালো মনোগ্রামে খোদাই করা অক্ষরে লেখা আছে “টাইটানিক”।

টাইটানিকে উঠার আগে ফেরী যেখান থেকে মেইলবেগ সংগ্রহ করতো তা এখন আর আগের মতো নেই। একশত বছরের ব্যবধানে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি হ্যারিটাইজ সেন্টার। টাইটানিক বা অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে কৌতূহলী প্রশ্নের প্রান জুড়ানো উত্তর দিতে সর্বদাই প্রস্তুত ওখানে কর্মরত ব্যক্তিবৃন্দ।

হ্যারিটাইজের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিলের পত্রিকার কাটিং যা বহন করে চলছে এখনো টাইটানিকের সুখ দুঃখের গল্প। “কর্ক এক্সামিনার” নামে একটি স্থানীয় পত্রিকাতে ওইদিন টাইটানিকের ছবি সম্বলিত একটি ফিচার প্রকাশ পায়। সে যুগে ছবি কোন সহজলভ্য বস্তু ছিলনা বিধায় আজ কর্ক এক্সামিনারের ওই ছবিটি-ই এক বিখ্যাত ইতিহাস।

অবশেষে কবহ ছেড়ে যাওয়ার চার দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধায় আটলান্টিকের এক বিরাট বরফস্তুফের সাথে ধাক্কা খেয়ে টাইটানিকে ফাটল ধরে। যুগের সেরা জাহাজের গর্ব ও অহমিকা ক্ষনিকেই মিশে যায় আটলান্টিকের টাল মাতাল জলস্রোতের সাথে। যাত্রীদের কান্না আর বাচার তীব্র আর্তনাদে ফেটে পড়ে মধ্য আটলান্টিক। তবু উন্মাদ, তবু নিষ্ঠুর এ আটলান্টিক গ্রাস করে নেয় সৌখীন যাত্রীবৃন্দ সহ শিল্পিত এই মানব সৃষ্টিটিকে। যে সৃষ্টি জন্মের ভেতরে সৃষ্টি করেছে গর্বিত ইতিহাস, ধ্বংসের মধ্যেও রেখে গেছে শোকগাঁথা এক ইতিহাস।