ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বেশ কিছু দিন আগে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সকল জল্পনা-কল্পনা শেষ করে নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটাল “গ” ইউনিটের পুনঃ ভর্তি পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে ঠিক তখন থেকেই লিখাটা লিখব লিখব করে আর লেখা হয়ে উঠছিলনা। আমার এক ভাতিজী ও শালী প্রথমবার “গ” ইউনিটে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষার ফলাফলের মেধা তালিকায় ঠিকলেও দ্বিতীয় বারের পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে যথেষ্ট আশাহত হয়। দুষ্ট শিক্ষকদের অবহেলা ও অনৈতিকতা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। বিগত দিনের উল্লেখযোগ্য পরীক্ষাগুলোতে বেশ ভাল ফলাফল করা সত্ত্বেও কেবল মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের উদাসীনতা, প্রশ্নপত্রের ভুল ও পদ্ধতিগত ত্রুটির খেসারত দিতে গিয়ে তাদের কপালে ভার্সিটিতে ভর্তির শিকে আর জুটেনি। না পাওয়ার বেদনার চেয়ে পেয়ে পেয়ে হারানোর ব্যাথা যে আরও বেশী নির্মোহ, এ মর্ম যাতনা কেবল ওদের দুজনকেই ছুঁয়ে যায়নি, ছুয়েছে এরকম আরও অনেককে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, দেশে ছাত্রছাত্রীর তুলনায় বিশবিদ্যালয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম। পর্যাপ্ত পরিমান বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে সম্ভব হলে উচ্চ শিক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রিদেরকে ভর্তিসংক্রান্ত যে জঠিলতা বা সঙ্কটের মুখুমুখি কিংবা অকারন খেসারতের শিকার হতে হয় তা থেকে তারা অনেকটা রেহাই পেত। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়কে স্বপ্নের সিঁড়ি ভেবে প্রতিবছর উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুক অগণিত তরুন তরুণী যে ভিড় জমায় বা ভর্তি পরিক্ষার নামে যে তুমুল প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তা থেকেও বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা মুক্তি পেত।

বর্তমান সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী মহিলাদের সুযোগসুবিধার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উঁচু শ্রেণীর পদবীতে মহিলাদেরকে তিনি যথেষ্ট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দান করেছেন। শুধু তাই নয় স্পিকারের মতো দায়িত্বশীল সংসদীয় পদেও অদুর ভবিষ্যতে মহিলারা শোভিত হবেন বলে আশ্বাস বানী ব্যক্ত করেছেন। তিনি মহিলাদেরকে লাইম লাইটে নিয়ে আসার জন্য যে প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।

সরকারী বেসরকারি মিলে বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশে থাকলেও অদ্যাবধি কোন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি ব্যাপারটি গুরুত্ব সহকারে ভাবতেন বা কার্যকরী পদক্ষেপ নিতেন তাহলে তা হতেও পারে তাঁর কর্মময় জীবনের সাফল্যের আরেকটি সুপান। তিনি যেহেতু মহিলাদের দাবিদাওয়া বা সমঅধিকারের কথা দরদী চিত্তে ভাবেন, তাই তাঁর পক্ষেই সম্ভব এ ধরনের একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। এতে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা লাঘবে যেমন কার্যকরী ভুমিকা পালন করবে তেমনি উদ্যমি ও উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুক শিক্ষার্থীনিরা আশাহত না হয়ে তাদের যথার্থ ঠাই খুঁজে পেতে সক্ষম হবে।

জানি দেশ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনৈতিক দৈন্যতাই দেশের এক বিরাট সমস্যা। তাই শিক্ষা খাতে সরকারের যথেষ্ট উদারতা থাকলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার দরুন বরাদ্দকৃত বাজেট যথেষ্ট নয়। এমতাবস্থায় দেশে নতুন করে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা কিংবা এ খাতে নতুন করে বাজেট সংযোযন করা চাট্টিখানি বিষয় নয়। তাই সরকার চাইলে জগন্নাথ কলেজের মতো অন্য যেকোন একটি প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও গর্বিত ইতিহাসময় মহিলা কলেজকে মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপদানের চিন্তাভাবনা করতে পারেন। সে প্রেক্ষাপটে আমি ইডেন কলেজের নামটি তুলে ধরে সরকারের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে পারি।

সময়ের পরিবর্তনে ইডেন কলেজের মহিমা কিছুটা মলিন হলেও এর রয়েছে এক বিরাট সুখ্যাতি, প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ কলেজের গর্ভ থেকেই বেরিয়ে এসেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ আরও অনেক নামিদামি মহীয়সী। বর্তমানে আটার একর জমির উপর দাড়িয়ে থাকা এ কলেজটি অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পৌছেছে আজকের অবস্থানে।

ফিরে যাই একটু পিছনের দিকে। আজ থেকে একশ ঊনচল্লিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৭৩ সালে “সুবেহ সাধিনি সাবহা” নামে এক জনহিতৈষী সংস্থা ব্রাহ্ম মেয়েদের পরাশুনার লক্ষ্যে একটি স্কুল নির্মাণ করে। ঘরোয়া পরিবেশে পড়াশুনার কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার জন্য তারা ফরাশগঞ্জের একটি ব্যক্তিগত বাড়ীকে বেছে নেয়। ১৮৭৮ সালে তা অন্য একটি প্রাইভেট বালিকা বিদ্যালয়ের সাথে মিশে ঢাকা ফিমেইল স্কুল নামে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। ওই বছরই কতৃপক্ষ জাতীয়করণের ডাক পেলে তারা সরকারী সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির আশায় তৎকালীন গভর্নর স্যার এশলী ইডেনের নামানুসারে এ প্রতিষ্ঠানটিকে “ইডেন গার্লস স্কুল” নামে নতুন নামকরণের মাধ্যমে লাক্সামিবাজারে স্থানান্তর করা হয়।

ইডেনই ছিল পাকবাংলার প্রথম সরকারী বালিকা বিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, ১৩০জন ছাত্রী সম্বলিত এ বিদ্যালয়টি ১৮৯৬-৯৭ সালে আসাম ও পূর্ববাংলার শ্রেষ্ট স্কুলের গৌরবে ভূষিত হয়। এ সময় ভূমিকম্পে বিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়ে গেলে কিছুদিনের জন্য আবারো একটি প্রাইভেট বাড়ীতে ও পরবর্তীতে সদরঘাটে এক পর্তুগীজ ব্যবসায়ীর বাড়ীতে তা স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৬ সালে স্কুল থেকে ইণ্টাড়মেডিয়েট কলেজে উন্নীত করা হয়। পরবর্তীতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তা আব্দুল গণি রোডে স্থানান্তর করেন যা “ইডেন বিল্ডিং” নামে পরিচিতি লাভ করে।

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার উক্ত বিল্ডিংটিকে প্রাদেশিক সচিবালয় হিসেবে ব্যবহার করার সিহান্ত নিলে কলেজের অস্থায়ী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্জন হলের একটি অংশে স্থানান্তর করা হয়। কলেজটির কার্যক্রম ওখানে বেশ স্থবির ও অনিশ্চয়তায় পরে গেলে তা কাটিয়ে উঠার জন্য তারা ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে কামরুন্নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের সাথে মিলিত হয়। এবং তারা আলদা ভাবে দুটো প্রতিষ্ঠানের স্কুল দুটোকে স্কুলে এবং কলেজ দুটুকে অভিন্ন কলেজে রূপ দান করে। কলেজ দুটো অভিন্ন ধারায় মিলিত হয়ে ইডেন গার্লস কলেজ নামে বকশিবাজারে এবং স্কুল দুটো কামরুন্নেছা গার্লস স্কুল নামে টিকাটুলিতে স্থায়ী ভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।

আজ ইডেন কলেজকে আমরা সমহিমায় আজিমপুরে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তা মুলত উন্নীত হয়েছিলো ১৯৬২ সালে। স্নাতক ডিগ্রি চালু করার জন্য তার বকশিবাজারে তাদের উচ্চমাধ্যমিক শাখা রেখে আজিমপুরে নতুন ক্যাম্পাসের সাথে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু বছর খানেক পড়ে তারা এ ক্যাম্পাসেই উচ্চমাধ্যমিক শাখার কার্যক্রমও চালু করতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে বকশিবাজারে রেখে আসা কলেজটি একই সময়ের মধ্যে ইন্টারমেডিয়েট থেকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয় এবং পরে তা সরকারী মহিলা কলেজ ও পরিশেষে বদ্রুন্নেছা কলেজ নামে পরিচিতি লাভ করে।

ইডেন কলেজ তার স্বীয় ও সাতন্ত্রিক সত্তার স্বাধীন বিকাশ ঘটায় ১৯৬৩ সালে। বর্তমানে ক্যাম্পাস ছাড়াও ছাত্রীদের আবাসিক ব্যাবস্থার জন্য রয়েছে ১১ তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং যা ১০০০ ছাত্রীর বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম। রয়েছে দুতলা বিশিষ্ট একটি বিল্ডিং যার সংগ্রহে আছে কম করে হলেও ৪৪,০০০ বই। ২২ টি ডিপার্টমেন্ট বিশিষ্ট ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ৩৫,০০০। স্নাতক, সম্মান সহ স্নাতকুত্তর ডিগ্রি লাভের সুযোগও রয়েছে এ কলেজে। শুধু তাই নয়, ছাত্রীদের সুবিধাদের কথা বিবেচনা করে সেখানে এটিএম বুথ ও বাস সার্ভিসের ব্যাবস্থা রয়েছে। রয়েছে অয়াই ফাইয়ের ব্যাবস্থাও। প্রশাসনিক লেভেলের কর্মজীবী ছাড়াও কলেজে চাকরিরত আছেন ২৪০ জন শিক্ষক।

অধিকাংশ মহামানবের জীবন ঘাঁটলে দেখা যায় তাঁরা সারাটা জীবন যুদ্ধ করে সাফল্যের স্বর্ণ শিকড়ে আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কলেজটির ইতিহাসে দিকে তাকালেও অনেকটা সেই রকম মনে হয়। বলতে গেলে পরগাছা থেকে অনেক কৌশল, সন্ধি ও স্বীয় কৃতিত্ব তথা এক ধরনের যুদ্ধের মাধ্যমে আজকের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছা। নারী শিক্ষা উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখছে যুগ যুগ ধরে। তাই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ মহিলা কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরনে যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বিষয়টি দরদী হৃদয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করেন তবে অবশ্যই তারা সাধারন জনগনের বাহবা পাওয়ার সাথে সাথে সাফল্য তালিকায় চির ভাস্বর হয়ে থাকবে তাদের নতুন এ সংযোযন।