ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

গত লেখায় ট্যাক্কা মার্কেটের ফিরিস্তির কথাটি লিখেছিলাম। এও লিখেছিলাম যে, জায়গাটি বাঙ্গালীদের একটি মিলন কেন্দ্র। সে সুবাদে সেখানে গিয়ে পুরনো ভাইদের কাছ থেকে নবাগত হিসেবে আমি বেশ কিছু টিপস পাই। কাজে যোগদান করে কিভাবে স্বীয় ক্যারিয়ার ভাল করে তুলা যায়, চাইনিজ সুপারভাইজার-ম্যানেজারদের আচার-আচরন বা প্রভুত্তের নমুনা কেমন কিংবা বস বা কোম্পানির কাছে প্রথম একবার “নোগুড” হলে পরবর্তীতে কাজেকর্মে নিজের জান-প্রান বিলিয়ে দিলেও সে ক্ষত মুছে “গুড” শব্দটি পুনরুদ্ধার করে নিজ অস্তিত্তে আর ফিরিয়ে আনা যে যায়না ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ কথা বার্তা শুনি। এবং শুরু থেকেই যাতে কতৃপক্ষের কাছে নিজেকে “গুড” হিসেবে প্রতিস্থাপন করতে পারি সে বিষয়ে অনেকেই উদার শলাপরামর্শ দিলেন।

পরদিন সকালে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আমার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে বাসে আমার কাজের জায়গায় যেতে লাগে প্রায় আধা ঘণ্টা। যাওয়ার পথে দেখলাম সিঙ্গাপুরের সকাল। ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে কর্মজীবী সহ সকলেই যেন ব্যস্ত বিভুর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে। ওখানে বাংলাদেশের মতো কোন রিক্সা, সিএঞ্জি, ট্যাম্পু বা ব্যাবিট্যাক্সি জাতীয় কোন যানবাহন নেই। তড়িৎ প্রয়োজনে ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যবস্থা থাকলেও ট্রেন (এম,আর,টি) বা বাসই হচ্ছে ওখানকার সাধারন লোকদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। তাই যাত্রীদের সুবিধার্থে বাস গুলোকে খুব ঘন ঘন থামাতে হয়। তাই বলে যেখানে ইচ্ছে সেখানে নয়। নির্দিষ্ট ষ্টপিজেই তাঁরা থামায়। অর্থাৎ সিঙ্গাপুরে ঘন ঘন হাউজিং ব্লক গড়ে উঠায় বাস ষ্টপিজের হারও খুব বেশী। প্রতিটি হাউজিং ব্লকেই শফিং মল, ফুডকোর্ট, স্কুল, খেলার মাঠ সহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধাদির পাশাপাশি রয়েছে একটি করে বাস ষ্টপিজ। ফলে সকাল বেলায় বাস গুলোতে দেখা যায় কর্ম ব্যস্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড়। জাতবেজাত মানুষের হরেক রকমের চেহারা। যা কিছুক্ষনের জন্য হলেও নিয়ে যায় অন্য এক ভুবনের প্রশান্তিতে।

দুতলা বিশিষ্ট বিশাল বাস যাত্রীদের ভারে টুঁইটুঁম্বুর হয়ে যায়। নির্দিষ্ট আসনে বসে থাকা যাত্রী ছাড়াও পুরো বাস জুড়েই দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য যাত্রী। অথচ বাসে নেই কোন হৈ হল্লা। হেলাপার, কন্ডাক্টারদের নেই বিরক্তিকর চিৎকার। কিংবা ভাড়া আদায়ের নামে অতিরিক্ত ঝামেলাও নেই। ওখানে বাস গুলোতে দরজার সামনেই অর্থাৎ ড্রাইভিং সিটের পাশেই এক ধরনের কম্পিউটারাইসড পে পয়েন্ট বা পে বক্স থাকে। মাত্র ৬০ সেন্ট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ভাড়া হচ্ছে ১.৮০ ডলার। এ পরিমান ভাড়া চুকিয়েই বাসে চড়ে বেড়ানো যায় শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ভাড়া চুকানর উপায় হিসেবে খুচরা পয়সা (কয়েন) বা পে কার্ড ব্যবহার করা যায়। টেলিফোন কার্ডের মতো কার্ডটি পে বক্সে ঢুকিয়ে নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকায় চাপ দিলেই টিকেট বেড়িয়ে আসে। মাঝে মধ্যে অনেককে ভাড়া নিয়ে প্রতারনার আশ্রয় নিতেও দেখা যায়। এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুর বাস কতৃপক্ষকে বেশ উদারই বলা চলে। যদি কদাচিৎ কেউ প্রতারনায় ধরা পড়েও যায় এতে অন্যান্য কড়া আইনের মতো কোন সাজা প্রাপ্তির কঠোরতা নেই। সাদা পোশাক পরোয়া টিটি সাহেব প্রতারক ব্যাক্তির কাছ থেকে যথার্থ পরিমান পয়সা বা পে কার্ড নিয়ে নতুন আরেকটি টিকেট পে বক্স থেকে কিনে এনে তার হাতে তুলে দেন। পাশের যাত্রীরা অনেক সময় তার দিকে অনেকটা লাজুক দৃষ্টিতে তাকান। ফলে ব্যাপারটা তেমন কোন সাজা টাজার না হলেও আত্মসম্মানের হানি বা ক্ষেত্র বিশেষ স্বীয় জাতিসত্তার অস্তিত্তেও অনেকটা আঘাত হেনে যায়।

আরেকটি যে জিনিস লক্ষণীয় তা হল, বাসে পা ফেলানোর জায়গা না থাকলেও পিন পতন নীরবতা সেখানে বিরাজ করে। অহেতুক কেউ কোন খোশ গল্পে মেতে উঠেনা বা উচ্চ কণ্ঠে কথা বার্তা বলতেও কাউকে সচারচর দেখা যায়না। এমনকি মোবাইল ফোন বেজে উঠলেও সহজে কেউ উত্তর দিতে চায়না। নিচু কণ্ঠে একান্তই প্রয়োজনীয় কথা বলে ফোন রেখে দেয়।

বাসে প্রতিটি আসনের সামনেই থাকে কলিং বেল জাতীয় একটি বাটম যা চাপ দিলে এক ধরনের ম্যালডি শুনা যায়। ওই ম্যালডি-ই হচ্ছে পরবর্তী স্টেসনে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার সঙ্কেত যা শুনে ড্রাইভার বাস থামাতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমি যেহেতু নবাগত এবং সিঙ্গাপুরের একেকটি এলাকার বা বাস ষ্টপিজর ভিন্নতা খুঁজে বের করাটা বেশ কষ্টকর তাই বাসে পা রেখে ভাড়া প্রদান কালে ড্রাইভারকে আমার অক্ষমতার কথা বলে রেখেছিলাম। তাই ড্রাইভার ভদ্রলোক আমার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে তিনি নিজ আসন থেকে উঠে এসে আমাকে বাস থেকে নামার কথা বলে বদান্যতা দেখান।

ক্যান্টিনে বসে ব্র্যাকফাষ্ট করার মতো যথেষ্ট পরিমান সময় হাতে ছিলোনা বলে দুটো পরোটা কোন রকমে খেয়ে কফি হাতে নিয়ে চলে এলাম। টেকওয়ে কফির স্টাইলও সিঙ্গাপুরে আলাদা। বাংলাদেশের মতো ছোট কাপে করে এক কাপ কফি পান করলে চলবেনা। আমাদের দেশের প্রায় তিন গুন পরিমান কফি বা টি এখানে একবারের ব্র্যাকফাষ্টেই পান করতে হয়। তাই টেকওয়ে কফি বা টির কাপ হিসেবে এক ধরনের প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা হয় যা সফট ড্রিংসের মতো ষ্ট্র ব্যবহার করে পান করতে হয়।

কন্সট্রাকশান প্রজেক্ট। জীবনের এই প্রথম এ ধরনের কোন প্রজেক্টের ভেতরে ঢোকা। নিজেকে অনেক শক্ত রেখে খুঁজে নিলাম আমার কোম্পানির সাইট অফিস। আমি যে কোম্পানিতে কাজ নিয়ে গেলাম তা হল একটি পেইন্টিং কোম্পানি। মুলত ওই কোম্পানির পেইন্টার হিসেবেই আমাকে কাজ করতে হবে। অফিসে ঢুকে গুড মর্নিং বলে মালে (মালয়েশিয়ান) চাইনিজ ফোরম্যানের সাথে করমর্দন করে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে চাইলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে সব ইনফরমেসানই তার কাছে আছে বলে জানালো।

পেইন্টিঙে আমার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তাঁকে সবিনয়ে আমার বা আমাদের দেশের পরিস্থিতির কথা বুঝিয়ে আমার অনভিজ্ঞতার কথা জানালাম। পড়াশুনা জানা শিক্ষিত লোকেরা যে গায়ে গতরে খেটে কাজে অভ্যস্ত নয় তা তাঁকে বললাম। আমার এসব কথা তাঁকে কোন রেখাপাত করেছে বলে মনে হলনা। ভাবটা এরকম, সে যা শুনেছে তা নতুন কিছু নয়। কিংবা আমি যে তাঁকে এসব বলবো, তা যেন সে আগে থেকেই জানত। আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে তার আরেক সহকর্মী আমান নামের এক উঠতি বয়সের তরুণকে মোবাইলে ডেকে এনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ Follow him।“