ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

bnimg-199705-2012-07-17

পাকিস্তানের আজাদি দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ৭১ সালের ১৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি কতৃক আয়োজিত এক সভায় ঢাকার কার্জন হলে পাকিস্তান সুহৃদ আযম সাহেব পাকিস্তানের দুশমনদের মহল্লায় মহল্লায় তন্ন তন্ন করে তাদের অস্তিত্বকে বিলোপ করার আদেশ দানের সাথে সাথে এও বলেছিলেন, “আল্লহ না করুন, যদি পকিস্তান না থাকে তাহলে বাঙ্গালী মুসলমানদেরর অপমানে মৃত্যুবরণ করতে হবে” (সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংগ্রাম আগস্ট, ১৯৭১)। কিন্তু, বাস্তব সত্য এই যে, আল্লাহর ইচ্ছায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান থাকেনি। কিন্তু অপমানের ঢেকুর তোলে যাদের মৃত্যুবরন করার কথা ছিল, তাঁরা মরেননি। বরং তাদের অনেকেই পালিয়ে বাচতে চেয়েছিলেন। গোলাম আযম তাদের মধ্যে অন্যতম ।

পাকিস্তানকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য ভদ্রলোকের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলোনা। ৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নজর দিলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, ইন্দিরা ও ভারত সম্পর্কে কিভাবে ব্যাঙ্গাত্মক, অপমানসূচক ও আপত্তিজনক মন্তব্য করে শতাব্দির নিকৃষ্টতম চেহারার উন্মোচন তিনি ঘটিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জিন্নাহর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ সেপটেম্বর “৭১ ঢাকার কার্জন হলে ইসলামি ছাত্র সঙ্ঘ স্মৃতি প্রদর্শনীর আয়োজন করলে সেখানে জামায়াত প্রধান হিসেবে গোলাম আযম তা উদ্বোধন করে মুক্তিপাগল বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান। এবং স্বাধীনতা কামী বাংলার মানুষকে “দুষ্কৃতিকারী” বলে অভিহিত করেন। তার নেত্রিত্তে গড়ে উঠা আলবদর বাহিনী ওইসব দুষ্কৃতিকারীদের (!) চরম শিক্ষা দিয়ে সমুলে উৎকাথ করে জনজিবনে শান্তি, স্বস্তি ও ন্যায় নীতি কায়েমের যে আপ্রান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাও তিনি বিষদ ভাবে বিশ্লেষণ করেন। তার বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে ওই সময় দৈনিক সংগ্রাম প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একটি ছবি সম্বলিত বিশেষ গুরুত্ব সহকারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার একাংশ হুবুহু তুলে ধরলাম। “আল বদর একটি নাম। একটি বিস্ময়। আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা। যেখানেই দুষ্কৃতিকারী আল-বদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতিকারীদের কাছে আল-বদর সাক্ষাৎ আজরাইল।“

সারাটা জীবন পাকিস্তানের গোলাম হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য মিঃ গোলাম যে শক্তি, যে তাগদ নিয়ে আজরাইল (!) বাহিনীর জন্ম দিয়েছিলেন কালের করাল গ্রাসে সে শক্তি আজ শুকিয়ে গেছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কিন্তু জীবনের এ সন্ধ্যা বেলায় অমিত ঘৃণার অসহ্য যন্ত্রনার নিচে দাঁড়িয়েও বেঁচে থেকে গোলাম সাহেব যে নীরব ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিছুদিন আগে প্রিজন সেলের বাথরুমে পড়ে গিয়ে যে অসহায় জীবনের সাক্ষাৎ তিনি পেয়েছেন কিংবা ভবিষ্যতেও এরকম অনেক দুঃখের পীড়ন সহ্য করে চলতে হবে জেনেও লোকলজ্জার ভয়ে অন্তরের তেজস্ক্রিয়তাকে এখনো ক্ষয় হতে দিচ্ছেননা সে জন্য আমি সাধুবাদ জানাই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা নব্বই বছরের এ রাজাকার বুড়োকে!

বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রিজন সেলে গোলাম আযমের সঠিক তত্তাবধান হচ্ছেনা। দুধ ডিম জাতীয় সুসম খাদ্য পরিবেশন করা হচ্ছেনা। যে আয়েশে খেয়ে পড়ে অভ্যেস সেভাবে চলতে পারছেননা। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর ভদ্র লোকের দু কেজি ওজন হ্রাস পেয়েছে। এসবই বেদনা বিধুর! কবরে এক পা দিয়ে রাখা আত্ম নিগ্রহপূর্ণ ও নিসঙ্গ জীবনযাপন সম্পন্ন বুড়োর জন্য ক্ষনিকের জন্য হলেও কিছুটা মানবিক আবেদন জাগ্রত হয়ে উঠে বটে কিন্তু যখন পিছনের দিকে চেয়ে দেখতে পাই ওই বুড়োই একদিন জল্লাদি কায়দায় নরমাংশ আর রক্ত পানাহার করে উল্লসিত হয়েছেন উলঙ্গ নৃত্যে, তখন তা কেবল মলিনই হয়ে যায়না, প্রতিশোধ স্পৃহায় জেগে উঠে বিবেকের হিরন্ময় চাবুক। যে চাবুকের জ্বালাময়ী আঘাতে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করে ফেলতে মন চায় কালের ওই কুখ্যাত মানব নামের নরপিচাশটিকে।

হ্যাঁ নরপিচাশ! ভয়ঙ্কর জানোয়ার। মুক্তিযোদ্ধের শেষ পর্যায়ে অবস্তা বেগতিক দেখে এ জানোয়ার তার পাক ভুমি পাকিস্তানে পালিয়ে যাবার আগে আরেকটি কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করে। পরাজয়ের গ্লানিতে পাগলা কুকুরের মতো কামড় দেয় জাতির অস্তিত্তে। তার নির্দেশে কুখ্যাত কুলাঙ্গার (আলবদর) বাহিনী বাঙ্গালী জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বেছে বেছে হত্যা করে দেশের শ্রেষ্ট সন্তানদের।

প্রকৃতির কি অমোঘ বিধান! চল্লিশ বছর পাড়ি দিয়েও নব্বই বছরের এ বৃদ্ধ শেষমেশ আর পার পায়নি। নিক্ষিপ্ত হতে হয় কারাগারে। চিকিৎসা সুত্রে স্থানান্তরিত হয় হসপিটালের প্রিজন সেলে। খান্দানি আয়েশ পুরনে ব্যাঘাত ঘটছে বলে অনুযোগ অভিযোগ নিয়ে সময় সময় মিডিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায় তার বেশরম স্বজন। যদি এসব অভিযোগ সত্যি হয় তবে আমিও ব্যক্তিগত ভাবে তা সমর্থন করিনা। কারণ জেল কতৃপক্ষের কোন অনাদর, অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার জন্য যদি কোন অঘটন ঘটে, তা হবে অনেকটা তীরে এসে তরী ডুবানোর মতো। রাজনৈতিক ফায়দা লুঠতে চেষ্টা করবে স্বার্থান্বেষী মহল। ব্যাহত হবে যুদ্ধাপরাধীদের পুরো বিচার প্রক্রিয়া। তা ছাড়া জনতার আদালতে বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই কারান্তরালে যদি তার কিছু ঘটে তবে যে সে মরে গিয়েও বেঁচে যাবে। জন্ম মৃত্যু যদিও আল্লাহর হাতে, তারপরও বলবো আমাদের সামান্যতম ত্রুটির খাতিরেও যেন এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার সুত্রপাত না হয়। দিকে দিকে যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের দাবিতে মানবতার যে আর্তি, গনজাগরনের যে সুর তার প্রতিফলন ঘটাতে হলে শতাব্দির শ্রেষ্টতম মানবতা লুণ্ঠনকারী, রাজাকারের রাজা, বর্বর নিকৃষ্টতম এ মানুষটিকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।