ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

প্রতিটি দেশ বা জাতিরই বিশেষ কিছু দিন থাকে। ১৭ মার্চ “সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে” আইরিশদের তেমনি একটি বিশেষ দিন। দিনটি আদিতে ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হলেও পরবর্তীতে আইরিশ সরকার কতৃক তা জাতীয় দিবসের মর্যাদায় উন্নীত হয়। সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতিত বছরের অন্যান্য ছুটির দিন গুলোকে আমরা “পাবলিক হলিডে” বলে আখ্যায়িত করলেও আইরিশরা এ গুলোকে “ব্যাংক হলিডে” বলে থাকে। সপ্তাহের যে কোন দিনেই ব্যাংক হলিডে থাকুকনা কেন, তারা সাধারনত এগুলোকে সাপ্তাহিক ছুটির সাথে সংযোজন করে একত্রে ছুটি কাটায়। একমাত্র মে দিবস, খ্রিস্টমাস ও সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে’র বেলাতেই ব্যতিক্রম। এ দিন গুলো বিশেষ গুরুত্ব সহকারে ওই নির্দিষ্ট দিনেই পালিত হয়ে থাকে।

আয়ারল্যান্ডে আজ সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে জমকালো ভাবে উদযাপিত হয়। আইরিশ সেনাবাহিনী দিনটির মর্যাদা বাড়িয়ে অভিবাসীদের কাছে আকৃষ্ট করে তোলার জন্য বিশেষ কুচকাওয়াজ করে থাকে। বিভিন্ন শহর বা নগরীতে দলে দলে লোক সবুজ পোষাকে সেজে বিশেষ র‍্যালিতে যোগদান করে। আদি আইরিশ ব্যাতিত বিভিন্ন দেশ থেকে আগত স্থায়ী অস্থায়ী অভিবাসীরাও এতে যোগদান করে সাফল্য খুঁজে পায়। এ দিনটি নিয়ে সবিশেষ আলোচনা করতে হলে ঐতিহাসিক দৃষ্টি ভঙ্গির আলোকে আলোকপাত করাই অত্যাবশ্যক।

চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রোমান ব্রিটেনে সেইন্ট প্যট্রিক্সের জন্ম হয়। ১৬ বছর বয়সে তাঁকে আয়ারল্যান্ডে দাস (Slave) হিসেবে অপহরন করে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে তিনি পালিয়ে বের হয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি ধর্মপ্রচারক হিসেবে আবারো আয়ারল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে খৃস্টান ধর্ম ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে বিশাল সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর তাত্ত্বিক ধারনার অনেক কিছুই আইরিশ সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। সেইন্ট প্যাট্রিক্স মনে করতেন, এক ঈশ্বরের মধ্যে “পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা” এ ত্রয়ীর মিলন। একটি কাণ্ডে তিনটি পাতা বিশিষ্ট যে প্রতীক আয়ারল্যান্ডে জাতীয় প্রতীকের (Shamrock) মর্যাদায় গনিত হয়েছে তাও মূলত সেইন্ট প্যাট্রিক্সের এ ধারনার আলোকেই। তাঁর পুরোতাত্ত্বিক অলৌকিক ধারনার প্রসার ঘটিয়ে আইরিশদের মাঝে নিজেকে যখন এক মহান ধর্ম গুরু বা ধর্ম যাজকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন ঠিক তখনি ৪৬১ সালের ১৭ মার্চ (ধারনানুযায়ি/ সম্ভাব্য তারিখ) মৃত্যুবরণ করেন।

পঞ্চম শতাব্দী থেকে প্যাট্রিক্সের মৃত্যুদিবস অনেকটা ধর্মীয় উৎসবের আলোকে পালিত হতে থাকে। পরবর্তীতে আইরিশরা এ দিনকে ধর্মীয় ছুটির দিন বলে ঘোষণা দেয় যা কিনা প্রায় হাজার বছরের বেশী সময় ধরে তারা পালন করে আসছিলো। ঐতিহ্যবাহী খাদ্য হিসেবে সিদ্ধ শূকরের মাংশ ও বাঁধাকপি খেয়ে এবং নাচ-গান ও মধ্যপানে ডুবে থেকে তারা উদযাপন করতো ১৭ মার্চ, সেইন্ট প্যাট্রক্স ডে, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।

দিনটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আমরা যে র‍্যালি শো বা আর্মিদের কুচকাওয়াজ দেখতে পাই তা মূলত আগে ছিলোনা। এবং কুচকাওয়াজের শুরুটাও আয়ারল্যান্ডে হয়নি। ১৭৬২ সালের ১৭ মার্চ পুরোহিত প্যাট্রিক্সের সম্মানার্থে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিতে কাকতালীয় ভাবে ইংলিশ আর্মিতে যোগদানরত আইরিশ সৈন্যরা এক কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের আয়োজন করে এবং একে আরও প্রানবন্ত করে তোলা ও শেকরের টানকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করার জন্য বিগিউলের সুরে বাজায় তাদের নিজস্ব সঙ্গীত। পরবর্তীতে আমেরিকাতে ইমিগ্র্যানট প্রাপ্ত আইরিশদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় এর ব্যপকতা আরও বৃদ্ধি পায়।

১৮৪৫ সালে আয়ারল্যান্ডে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে প্রায় প্রায় এক মিলিয়ন আইরিশ ক্যথলিক নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পথে পা বাড়ায়। এদের অধিকাংশই ছিল অশিক্ষিত এবং ভালোভাবে ইংরেজিতে কথা বলার ক্ষেত্রেও ছিল বেশ দুর্বল। ফলে এমেরিকানরা তাদেরকে অনেকটা অবজ্ঞার চোখেই দেখত যার ফলে নিম্ন মানের কোন চাকরি-বাকরি পেতেও তাদের খুব কষ্ট হতো। এমতাবস্থায় তারা ১৭ মার্চ সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে পালন করতে দল বেঁধে রাস্থায় বেরুলে স্থানীয় পত্রিকা গুলো তাদেরকে মাতাল ও উশৃঙ্খল বানরের সাথে তুলনা করে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে। স্থানীয়দের এ ব্যঙ্গ উপলব্ধি করে বিষয়টা রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নেয় আইরিশ সাহায্যকারী সামাজিক সংগঠন গুলো। তারা নিজেদেরকে সংবদ্ধ করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। “ভোটব্যাংক” হিসেবে নিজেদেরকে নেতাদের কাছে উপস্থাপন করে। তাই পরবর্তীতে বছর ঘুরে যখন সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে সামনে এলো, ১৯৪৮ সালের ওই দিনে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমেন (Harry S. Truman) নিউইয়র্কে কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন এবং এতে আইরিশরা নিজেদেরকে বিশ্ব বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত মনে করেন। এরপর থেকে তাদেরকে আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি। কালক্রমে এ দিনের প্রচার ও প্রসার ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া ও জাপান সহ বিশ্বের অনেক দেশেই জাকজমক ভাবে দিবসটি পালিত হয় কেবল ধর্মীয় উৎসবের আলোকে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে স্রেফ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হলেও আয়ারল্যান্ডে দিনটি আজ জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯০৩ সালে সরকারী ভাবে এ দিনকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইরিশ সাংসদ জেমস ও’ মারার (James O’ Mara) প্রস্তাবনায় এটি কার্যকর হয়। ১৯৩১ সালে আয়ারল্যান্ডে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিঃ ডেশমণ্ড ফিটজকারেলডের (Desmond Fitzqerald) উপস্থিতিতে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ভাবে আইরিশ সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে উদযাপিত হয়।

সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে মূলত আইরিশ ক্যথলিকদের একটি বিশেষ দিন হওয়া সত্ত্বেও আয়ারল্যান্ড ছাড়া বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে এর উদযাপন লক্ষ করে আইরিশ সরকার। ফলে বিশ্বের যে অংশে দিনটির বার্তা পৌঁছেনি সে অংশে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এবং এ ধারনা থেকেই সেইন্ট প্যাটরিকস ডে’কে “পুরোহিত প্যাট্রিক্স উৎসব” অভিধায় জাতীয় দিবসের আওতাধীন এনে ১৯৯৫ সালের দিকে আইরিশ সরকার বেশ জোরালো ভাবে এর প্রচারভিযান চালান। যাতে করে ওই বিশেষ দিনটির মধ্য দিয়ে পর্যটন শিল্প সহ তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তোলে ধরার প্রয়াস পান।

আজ ১৭ মার্চ “সেইন্ট প্যাট্রিক্স ডে” এলে আইরিশদের সাথে গলা মিলিয়ে দেশটিতে বসবাসরত অন্যান্য অভিবাসীদের মতো বাঙ্গালী মুসলিম অভিবাসীরাও সবুজ পোশাকে সজ্জিত হয়ে বিগত দুতিন বছর যাবত দিনটি উৎসব আকারে পালনে ব্রতী হয়ে উঠেন। স্থানীয় সভ্যতা, কৃষ্টি, আচার, উৎসব, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যের বিরোধী আমি নই। বরং সমীহ ও সম্মান করে চলাই সমীচীন বলে মনে করি। তবে এসবের যাঁতাকলে যদি নিজেদের কৃষ্টি-ঐতিহ্য বা ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকৃতি বা অবক্ষয় ঘটে তা কোন ক্রমেই সমর্থন করা যায়না। শুধুই একজন খ্রিষ্টীয় পুরোহিত ব্যক্তির সম্মানার্থে, যার সম্ভাব্য মৃত্যু দিবসকে ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় উৎসব বা দিবসে রূপান্তর করা হয়েছে, সে দিবস পালনে বাঙ্গালী মুসলিম অভিবাসীদের অংশগ্রহন কতোটুকু যৌক্তিক বা সমীচীন? আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাঙ্গালী অভিবাসীদের মধ্যে যারা এ দিবসটি পলনে উদ্যোগী ভুমিকা পালন করেন তারা বিষয়টি দরদ দিয়ে ভেবে দেখবেন বলে আশা রাখি।