ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমার মতো দেশটাও একদম ভাল নেই। প্রায় মাস খানেক যাবত শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছি। সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার জন্য ডাক্তার রুল জারি করেছে। বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা পড়া থেকে শুরু করে নেট ব্যবহারেও রয়েছে এ নিষেধাজ্ঞার কঠোরতা। পাশাপাশি প্রিয়তমা স্ত্রী ও পাঁচ বছরের আদুরে মেয়ের কড়া শাসন তো আছেই! কিন্তু গান গাওয়া যার স্বভাব, সে কি গান না গেয়ে থাকতে পারে? তা ছাড়া অঘটন ঘটন পটীয়সী বাংলাদেশ একের পর এক যে “চমক” আমাদেরকে দেখাচ্ছে তা দেখে অসুস্থ মানুষতো দূরে থাক, কবরে শুয়ে থাকা লাশও উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে।

একটা মানুষের যখন নৈতিক মৃত্যু ঘটে তখন সে আর মানুষ থাকেনা। জীবন্ত লাশে পরিনত হয়। একটা জাতির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি। নীতিভ্রষ্ট জাতি কখনো বেঁচে থাকেনা, থাকতে পারেনা। জীবন্ত লাশের মতো নামে বেঁচে থাকা মাত্র। আমাদের সাধের সোনার বাংলাদেশ! বাঙ্গালী বা বাংলাদেশী যে জাতি বলেই নিজেদেরকে অভিহিত করিনা কেন তাও আজ ওই জীবন্মৃত অবস্থাতেই বেঁচে আছে। এ সত্যটুকু উপলব্ধি করার জন্য একচল্লিশ বছরের ইতিহাস ঘাঁটার দরকার নেই, একচল্লিশ দিনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি-ই যথেষ্ট।

দেশের বর্তমান নাজুক অবস্থা সেই গুহা যুগের ধাপকেও অতিক্রম করে চলছে। লোকমান হত্যা থেকে শুরু করে সাগর-রুনি, সুরঞ্জিতের নিয়োগ বানিজ্য ও তার এপিএসের ড্রাইভার নিখোঁজ হয়ে পরিশেষে তা আপাতত এসে ঠেকেছে ইলিয়াসের গুম হওয়ার মধ্য দিয়ে। ইলিয়াসের পরিচিতি নতুন করে দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। ইলিয়াসকে কেন নিখোঁজ হতে হয়েছে কিংবা কারা তাঁকে কোন স্বার্থে গুম করেছে এ নিয়েও অনেকে জ্ঞানগর্ব বিষদ আলোচনা করেছেন। তাই সে আলোচনা থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে চাই। শুধু এটুকু বলবো, ইলিয়াস তার ড্রাইভার সহ নিখোঁজ বা গুম হয়েছেন- এটাই শাশ্বত সত্যি। তিনি বা তার ড্রাইভার আমাদের মাঝে আর কোনদিন ফিরে আসবেন কিনা সেটাই হচ্ছে এখন সবচেয়ে বেশী আশঙ্কার বিষয়।

একটা মানুষকে যদি রাস্থায় গুলি করে মেরে ফেলা হয় তাও ভাল। অন্তত তার পরিবার বা স্বজন লাশটা নিয়ে শেষবারের মতো চেহারাটা দেখে দাফন করতে সক্ষম হয়। গুম, এ যে এক বিরাট বর্বরতা। গুমকৃত ব্যাক্তিটিকে ধর্মীয় বিধানুযায়ী তো চির শায়িত করা যায়ইনা উপরন্তো সারাটা জীবন তার পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের এক অনিশ্চিত মর্ম যাতনা নিয়ে আশায় বুক বেঁধে থাকতে হয় এই ভেবে যে, “এই বুঝি গুমকৃত লোকটি ফিরে এলো”। যদিও গুম হওয়া ব্যক্তিরা সাধারনত ফিরে আসেনা।

ইলিয়াসের আগেও অনেকে গুম হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে খুব বেশী একটা মাতামাতি দেখা যায়নি। ইলিয়াসের গুম নিয়ে আজ বিরোধীদল সহ দেশ বিদেশে যে ভাবে হৈ হুল্লোড় শুরু হয়েছে তা যদি প্রকৃত অর্থেই আগে থেকে ওইসব অতীত গুমের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলা সম্ভব হতো তাহলে আজ হয়তোবা ইলিয়াসকে এ গুমের শিকারে পরিনত নাও হতে হত। এ কথা আজ সহজেই অনুমেয়, বিরোধী দলের চরম আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মহল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার চাপ সত্ত্বেও যদি এ গুমের রহস্য উন্মোচিত না হয় কিংবা ইলিয়াস ও তার ড্রাইভার আর কোনদিন ফিরে না আসে তবে তা হবে রাজনীতিকদের জন্য এক বিরাট অশনি সংকেত। ইলিয়াসের গুমের দায় সরকার বিএনপিকে, বিএনপি সরকারের উপর বর্তাতে চাচ্ছে। আলোচনার স্বার্থে যদি ধরেই নেয়া হয়, সরকার কিংবা বিএনপি কেউ এ গুমের সাথে সম্পৃক্ত নয়, তাহলে তৃতীয় কোন পক্ষ বা শক্তির উপর এর দায় বর্তায়। ওই তৃতীয় পক্ষ বা শক্তির মুখোশ উন্মোচন করাই হচ্ছে সরকারের কাজ বা দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু ইলিয়াস নয়, তার ধারাবাহিকতায় ফখরুল, রিজবী কিংবা মওদুদ অথবা আওয়ামী বলয় থেকে হানিফ, আশরাফ স্থরের নেতারাও যদি গুম হয়ে যান তবে আশ্চর্যের কিছুই থাকবেনা।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মধ্যে যে কয়টি ঘটনা জনমনে বিরাট ভাবে শঙ্কার সাথে রেখাপাত করেছে তার মধ্যে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, সুরঞ্জিতের দুর্নীতি ও ইলিয়াসের গুম উল্লেখযোগ্য। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড প্রায় আড়াই মাস হতে চল্লেও খুনিদেরকে ধরার ব্যপারে কিংবা তদন্ত অগ্রগতির ক্ষেত্রে আড়াই পারসেন্ট উন্নতির খবরও আমরা পাইনি। ইলিয়াসের গুম প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল। পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন নাটকীয় খবর দেখতে পাই কিন্তু নাটকীয় ভাবে তাঁকে উদ্ধার করা বা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এ ধরনের সংবাদ কখনো পাওয়া যাচ্ছেনা। তাহলে জনগনের পয়সায় সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে পোষে রাখার ফায়দা কি?

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন দুর্নীতি বা অপরাধকে দমিয়ে রাখার জন্য আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে প্রতিটি রাস্থার মোড়ে মোড়ে বা উল্লেখযোগ্য স্থান গুলোতে সিসি টিভির ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে বাসাবাড়ি, বেডরুম সহ রাস্থাঘাটে, হাটেমাঠে শহরে-বন্দরে যেভাবে সীমাহীন হারে হত্যা, খুন , গুম, অপহরন প্রভৃতি জাতীয় অপরাধ নির্বিঘ্নে সংগঠিত হচ্ছে তা একেবারে দমানো না গেলেও সিসি টিভির ব্যবহারে অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। কোন বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বা বাহিনী এখন যেভাবে নিদারুন বেরসিক ভাবে নিজেদেরকে “ব্যর্থ” বা ক্লু পাচ্ছেন্না বলে আদালত বা জনসমক্ষে বলে পার পেয়ে যান তখন হয়তোবা তারা এতো সহজে এই “সহজ” কথাটা জাতিকে শুনিয়ে পার পেতে পারবেননা।

জানি, পুরো দেশকে ডিজিটাল বা সিসি টিভির নিয়ন্ত্রনে আনতে অর্থনৈতিকভাবে আমাদেরকে যেভাবে সমৃদ্ধশালী হওয়া প্রয়োজন সে সমৃদ্ধি আমাদের নেই। হতদরিদ্র দেশ হিসেবে আমাদের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। অথচ ক্ষমতাসীনরা বরাবরই এসব সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতার কথা জনসমক্ষে তুলে ধরে নিজেদের দায়ভার স্বীকার করে নিতে বড্ড লজ্জা পান। বরঞ্চ তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, সরকারের মন্ত্রী এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সময়ে অসময়ে নিদারুন নিষ্ঠুর, পরিহাস ও প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য প্রদান করে মাঠ গরম করতে মোটেও কুণ্ঠিত হননা যা কিনা একটি দেশে গনতন্ত্র সুসংহত রাখতে ও জাতি ও জাতীয়তাবোধের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে খুবই আশঙ্কাজনক।

রাজনৈতিক কৌঠিল্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে দীন এবং বিপুল জনগোষ্ঠী সম্পন্ন একটি ক্ষুদ্র দেশে অন্যায়-অপরাধ সংগঠিত হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বের সব দেশেই কম বেশী ক্রাইম হয় বা হচ্ছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যা ভয়াবহ ও শঙ্কার বিষয় তা হচ্ছে – দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ মহলের চেষ্টাও যখন কোন অন্যায়কারী বা অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের কাটগরায় দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়ে যায়। তাদের এ ব্যর্থতা অপরাধীদের বুকের পাটা বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা অপরাধের ক্ষেত্রে হয়ে উঠে হিন্স্র থেকে হিংস্রতর। ফলে দেশ সামনের দিকে না এগিয়ে পিছনের দিকে যাচ্ছে। আর দেশের জনগনের জানমাল প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহিনতার দিকে আশঙ্কাজনক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

যে দেশে অপরাধজনিত ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট দোষীদের খুঁজে বের করতে কিংবা কোন তথ্য উদ্ঘাটন করার ক্ষেত্রে সরকার বা তার সকল বাহিনীর সব রকমের ম্যাকানিজম ব্যর্থ হয় এসব অকর্মণ্য বাহিনী বা সরকারের কি দরকার! বরং আমি মনে করি, দেশের এ চরম সংকটময় মুহূর্তে একজন সাধক সন্ন্যাসীর উপস্থিতি বিরাট ভাবে জরুরী হয়ে পড়েছে; যিনি চোখ বন্ধ করেই তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে দুর্নীতি সহ সকল অপরাধজনিত কর্মকাণ্ডে জড়িত দোষীদের নিরুপন করে জনসমক্ষে দাঁড় করাতে সক্ষম হবেন এবং বিচারের আওতাধীন এনে জাতিকে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলানোর ফুরসতটুকু করে দেবেন।