ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ইলিয়াসের গুম কিংবা তার ফেরা না ফেরা অথবা তিনি জীবিত না মৃত এসব নিয়ে গুজবের কোন শেষ নেই। তার স্ত্রী যেদিন ইলিয়াসকে ফিরে পাবার মিনতি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সেদিন ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকার একজন বিভাগীয় ব্যুরো চীফের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়। তিনি ওই বিভাগের একজন শীর্ষ স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আমাকে যে গুজবটি শুনান তা হল, ইলিয়াসকে দেশের একটি বিশেষ বাহিনী অপহরন করে নিয়ে গিয়ে প্রতিবেশী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সোপর্দ করে দেয়। সে মর্মে ইলিয়াস এখনো জীবিত এবং ওই বিশেষ সংস্থাটির নিয়ন্ত্রনে তিনি বর্তমানে ভারতের ত্রিপুরায় অবস্থান করছেন। গুজবের অংশ হিসেবে আরেকটু যোগ করে ওই কর্মকর্তা তাঁকে এও বলেন যে, ইলিয়াসকে অপহরনের বিষয়টি প্রথমে সরকারের শীর্ষ মহলের ওয়াকিবহালে ছিলোনা। সরকারে সিন্ডিকেটকারীদের একটি অংশ পরিকল্পিত ভাবে শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের অজান্তেই অঘটনটি (!) ঘটিয়ে ফেলান।

অনুজ ব্যুরো চীফকে এ গুজব তথ্যটি নিয়ে তার পত্রিকায় লিখার অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, এ গুজবই যেন সত্য হয়। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও প্রচেষ্টা থাকলে ইলিয়াস আলী অন্তত জীবিত ফেরত আসলে আসতেও পারেন। আর তিনি সত্যি ফিরে এলে তাঁর পরিবার পরিজনের দুশ্চিন্তা ও হতাশা কাটবে। জাতি রাজনৈতিক ভাবে যে অহিংশ অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে তা থেকেও অনেকটা মুক্তি পাবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাকুতি মিনতি করার পর তিনি যে আশ্বাস বাণী শুনিয়েছিলেন তা শুনে ইলিয়াসের স্ত্রী পরিবার যেমন আশায় বুক বেধেছিল ঠিক তেমনি সাধারন মানুষও আশস্থ হয়েছিলো এই ভেবে যে, আর হয়তো তাদেরকে ইলিয়াস ইস্যুতে হরতাল বিক্ষোভের শিকারে পরিনত হয়ে প্রান দিতে হবেনা কিংবা শ্রমিক দিনমজুর শ্রেণীর লোকদেরকে উপোষ কাটাতে হবেনা। কিন্তু সে আশায় দেখছি গুড়েবালি। সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে প্রধানমন্ত্রী মানবতার গান গেয়ে ইলিয়সকে খুঁজে বের করার ঘোষণা প্রায় এক সপ্তাহ আগে দিলেও আজ অবধি সরকারের তদন্ত বাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে কোন অগ্রগতিমুলক বা ইতিবাচক খবর আমরা পাইনি। উপরন্তু সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা স্পর্শ কাতর এ বিষয়টি নিয়ে পাগলের প্রলাপ বকে চলছেন। কিছুদিন আগে এক ভাষণে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়া ইলিয়াসের স্ত্রীকে “বিধবা” বলেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং ইলিয়াসের খুনি কে সে কথাও তার স্ত্রী জানেন বলে উল্লেখ করেন। একই বক্তব্যে পরোক্ষনে তিনি এ কথাও বলেন, ইলিয়স বর্তমানে জীবিত না মৃত তা আমরা জানিনা। ইলিয়াস জীবিত কিনা মৃত এ তথ্যই যার জানা নেই তিনি কিসের বলে তার স্ত্রীকে “বিধবা” বলে একজন মহিলা হয়েও অন্য একটি নারীহৃদয়ে আঘাত হানেন! এ ধরনের বালখিল্য জাতীয় স্ববিরোধী বক্তব্য দানে তিনি কেবল নিজেকেই ভারসাম্যহীন হিসেবে ফুটিয়ে তোলেননি, সরকার ও দলের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন করছেন আশঙ্কাজনক ভাবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ভদ্রলোককে আমি যথেষ্ট শক্তিশালী ও ধীরস্থির সম্পন্ন নেতা বলেই জানতাম। তর্জন গর্জন সম্পন্ন “ফোরটি নাইন” কিসিমের মন্ত্রীদের সাথে তার তুলনা চলে না। অথচ ইলিয়াস ইস্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনিও একটি অপাংক্তেয় বক্তব্য দিয়ে বসেছেন যা গত দুতিন দিন আগের প্রতিটি জাতীয় পত্রিকায় বেশ গুরুত্ব সহকারেই ছাপা হয়েছে। ইলিয়াসের লালিত পালিত সন্ত্রাসীরাই তাঁকে খুন করেছে বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। ইলিয়াস এখনো জীবিত কি মৃত সে তথ্যই যেখানে উদঘাটিত হয়নি কিংবা খোদ প্রধানমন্ত্রী যেখানে ইলিয়াসকে জীবিত উদ্ধারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার আশ্বাস দিয়েছেন সেখানে তার মতো একজন প্রবীণ নেতা কিভাবে এ ধরনের একটি লাগামহীন বক্তব্য প্রদান করেন? আর তার কথাই যদি সত্য হয় তাহলে কেন সরকার এখনো নাকে তেল দিয়ে আঙ্গুল চুষে চুষে জাতির সাথে নাটক করছে? ওইসব লালিত সন্ত্রাসীদের এখনো ধরছেনা কেন? ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভারকে মৃত ঘোষণা করে তাদের লাশ উদ্ধার করে জনসমক্ষে তুলে ধরছেনা কেন? নাকি মহিউদ্দিন সাহেব যা জানেন সরকার তা জানেন না! এটাকেও যদি সত্য ধরে নেয়া হয় তবে সরকার মহিউদ্দিনের কাছ থেকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জাতির সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরলেইতো ল্যাঠা চুকে যায়! তাহলে দুর্বলতা কোথায়?

সরকারের গুণধর মন্ত্রী ও তার দলের নেতাদের টক-ঝাল জাতীয় বক্তব্যে ইলিয়াসের অসহায় স্ত্রী বেশ ব্যথিত ও বিব্রত বোধ করছেন বলে টিবি ও সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইলিয়াসকে তার স্ত্রীর কাছে জীবিত ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস প্রদান করা সত্ত্বেও কেন তার মন্ত্রী বা নেতারা একের পর এক নিষ্ঠুর ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন? সরকার প্রধান কেন এসব নেতা মন্ত্রীদের কে ধমক দিতে পারছেননা? তাদেরকে এভাবে আশকারা দিতে থাকলে ওরাই যে একদিন সরকারের জন্য বিপর্যয় ঢেকে আনবে সে কথা কি আর নতুন করে বুঝিয়ে বলার কোন আবশ্যকতা আছে!

নিজেদের আত্মসমালচনা থেকে দূরে সরে গিয়ে সরকার এখন দমন পীড়নের নীতি বেছে নিয়েছে। হরতালের নেমে জ্বালাও- পোড়াও কিংবা ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ এনে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। আমরা যারা সাধারন মানুষ আছি তারা কেউই মনে প্রানে হরতাল সমর্থন করিনা। হরতালের নামে জ্বালাও পোড়াও কোন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নয় এবং তা আমদের কাম্যও নয়। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন দমানোর জন্য যে পথ বেছে নিয়েছে সেটাই বা কতটুকু ধনতান্ত্রিক? সকল মানুষকে যেমন সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায় না ঠিক তেমনি চলমান কোন আন্দোলনকেও মামলা বা দমন পীড়ন দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না বরং কোন সরকারের হার্ডলাইন জাতীয় নীতি আন্দোলনকে আরও চাঙ্গা করে তোলে। আজকের প্রধানমন্ত্রীও একদিন আন্দোলনকারী নেত্রী ছিলেন। সুতরাং এ সহজ সত্যটুকু বুঝতে মোটেও তাঁর কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

বলতে গেলে অনেকটা হুট করেই গত শনিবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রনব বাবু আমাদের দেশে অতিথি হয়ে এসে গেলেন। হাই প্রোফাইল সম্পন্ন বিশিষ্ট অতিথি। বিগ বিগ ভিআইপি। কিন্তু তারা নিজের চোখে কি দেখে গেলেন? কি শুনে গেলেন নিজের কানে? রাজনৈতিক কলহ ও অস্থিরতা, বিরোধী দলের নেতাদের গুম হত্যা ও আন্দোলনকারীদের উপর সরকার কতৃক মামলা, রিমান্ড ইত্যাদি, ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, হিলারির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াসের শিশু কন্যার তার বাবাকে ফিরে পাবার আকুতি জানিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন একটি চিঠি। জাতির মর্যাদা বা ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার জন্য এসব কি যথেষ্ট নয়?

প্রধানমন্ত্রীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এসবের জন্য কে দায়ী? তিনিও সেই পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখে একই কায়দায় বলবেন, আগের সরকার গুলোই এসবের জন্য দায়ী। তাদের আমল থেকেই যতো অপকর্ম বা দুর্নীতি শুরু হয়েছে। ধরে নিলাম, তাঁর কথাই সত্যি। কিন্তু ওই পুরনো অপকর্মের ধারাবাহিকতা বজায়ে রাখার জন্য তো জনগন তাঁকে ক্ষমতার গদিতে বসায়নি। তিনি যে বঙ্গ বন্ধু কন্যা। জাতির জনকের কন্যা। গনতন্ত্রের মানস কন্যা। তাঁর সরকার, তাঁর দেশ হবে গণতন্ত্রের মডেল। চোর, দুর্নীতিবাজ, গুমবাজ বা খুনিরা প্রজাপতির মতো স্বর্গীয় ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে আর জাতিকে এসবের যাঁতাকলে লজ্জায় বিশ্ব দরবারে মাথা নুইয়ে দাঁড়াতে হবে, সে জন্যতো তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশটি স্বাধীন করেননি!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সুস্পষ্ট ভাবে বলতে চাই, দেশ আজ যেভাবে এগুচ্ছে তা কোন সুস্থ জাতির পর্যায়ে পড়েনা। অনেক আশা আখাঙ্কা নিয়ে জাতি আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তাই দয়া করে জাতিকে আর আশাহত করবেননা। নিজেদের ভুল ত্রুটি গুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করতে চেষ্টা করুন। শুধু বিরোধী দলকে দায়ী করে কিংবা তাদের উপর নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা যায়না। আপনার বাবা সহ পরিবারের সকল সদস্য রক্ত দিয়ে গেছে এ দেশটার জন্য। তাই এ দেশের জন্য আপনার কোন মায়া মহব্বত নেই তা আমি কশ্মিন কালেও বিশ্বাস করিনা। কিন্তু যে সব স্বভাবজাত দুষ্ট চক্রের জন্য আপনার সকল অর্জন বিসর্জনে যাচ্ছে, সকল সফলতা ব্যর্থতার চাদরে ঢাকা পড়ছে ওদেরকে কঠোর হাতে দমন করুন। জাতি আর অন্ধকারের অতলান্তিকে ডুবতে চায়না। আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। যার নিশ্চয়তা প্রদান করা আপনারই সাংবিধানিক দায়িত্ব।