ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মধ্যরাতের কিছু আগে, বিশাল গামলা নিয়ে ভাত খেতে বসেছি। খাবার টেবিলে ভাত রাখবার যে গামলা, সেটা। বসেছি বিছানায়, আসন দিয়ে; ইন্টারেস্টিং একটা বই পড়ছি সাথে, অনেক দিনের অভ্যাস। লোডশেডিং চলছে, হাতে মোবাইলের ক্ষুদ্র টর্চ লাইট, মনোযোগ পুরোপুরি সংযোজিত হয়ে আছে বইয়ের পাতায়। এমন অবস্থায় ছোট আপুর মোবাইলে রিমাইন্ডার এ্যালার্ম বেজে উঠলো। হঠাৎ করে আমি এক রকম স্তম্ভিত হয়ে খাওয়া থামিয়ে শব্দের উৎসের দিকে তাকালাম। আধো অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু ঢেউয়ের মতোন একটানা দোলায়িত শব্দ।

স্থির হয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ; খুব ভালো করেই জানি ঐ রিমাইন্ডার কোন উপলক্ষকে নির্দেশ করছে। ছোট আপুর আগে ঐ মোবাইলটা আমি ব্যবহার করতাম। সেট পাল্টাবার সময় সবকিছুই পালটে দিয়েছিলাম শুধুমাত্র বার্ষিক উপলক্ষ্যগুলো বাদে। আজও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উপলক্ষ জানান দিচ্ছে ওটা। আজ ৯ মে, আমার বাবার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী!

গতকাল ছিলো মা দিবস। বেশ হল্লা করে বাসায় কেক কাটা হয়েছিলো, প্রবাসী বড়ো ভাই স্কাইপি’র বদৌলতে সরাসরি ছিলেন আমাদের সাথে। গূঢ় আনন্দময় পারিবারিক পরিবেশেও সবকিছু আমার কাছে স্বাভাবিক ছিলো না; যদিও সময় সবকিছু বেশ দক্ষতার সাথে মুছে দিতে পারে এবং হয়েছেও তাই, তবু। তবু গত কয়েক বছর ধরে আমার কাছে শূন্যতাটা ধরা পড়ছে খুব!

সময়ের প্রবাহ বেশ দক্ষ আর চতুর (অন্য/অনেকের মতে রহস্যময়)। পারিপার্শ্বিকতা বুঝবার ক্ষমতা হবার পর থেকে দেখেছি বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে বাসায় অথবা মসজিদে মিলাদ, দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হতো। ক্রমে সেটা অনিয়মিত হয়ে ওঠে, ব্যাপারটা বাৎসরিক বলেই হয়তো কারো আমলে আসেনি (!)। মাঝে মাঝে মনে হোত সবাই কি ভুলে যাচ্ছে? নাকি ভুলে থাকার চেষ্টা করছে? এবং এভাবে এটা এক রকম চর্চার আকার ধারণ করলো, স্বাভাবিক আর সব ঘটনার মতোন এটাও অনেকে ভুলে যেতে থাকলো। একদিন, হতাশাগ্রস্ত আর প্রশ্ন ব্যাকুল হয়ে আবিষ্কার করলাম, আমি আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী কবে সেটা ভুলে গেছি! অনুভূতিটা এমন ছিলো যেন আমি নিশ্চিত ছিলাম তারিখটা আসলে আমি কখনোই জানতাম না! তখন আমার বয়স ১৮, উচ্চ মাধ্যমিক ২য় বর্ষে পড়ছি। এমনই এক লোডশেডিঙের রাতে, ছাদে বসে আমার মা’কে জিজ্ঞেস করলাম; একটু থেমে তারিখটা বললো মা। এরপর আমরা দুজনেই নিশ্চুপ ছিলাম কিছুক্ষণ।

বাবাকে আমি দেখেছি তবে তাঁকে কেন্দ্র করে আমার কোন স্মৃতি নেই। আমার দেড় বছর বয়সে তিনি ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধ করেছেন ৯নং সেক্টরে, বাংলাদেশ পুলিশ থেকে। মৃত্যুর সময় ছিলেন এস.আই পদে। মা, খালা, খালাতো বোন, ফুপুদের কাছে তিনি খুব মেজাজি ছিলেন বলে শুনেছি। তাঁর ব্যবহার্য্যের মধ্যে একটা ছোট নোটবুক আর পুলিশের খাঁকি টুপিটা ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই এখন। শুধুমাত্র ছবি থেকেই তাঁর চেহারার সাথে আমার পরিচয়!

আমি প্রায়ই খুব প্রকটভাবে বাবার অভাব অনুভব করি। কিন্তু বাবা হারাবার কষ্ট হয় না একদম! প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে বাবা হারাতে দেখেছি, খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। নিজেকে তবু এই অনূভুতির প্রতি বেশ ভোঁতা আর অপরিচিত মনে হয়। এতকিছুর পরেও সবগুলো সমিরণ পাশাপাশি চলে এলে অদ্ভুত কিছু ভাবাবেগ গ্রাস করে আমাকে।

বাবাকে স্মৃতিতে সংরক্ষণের জন্যে আমি যথেষ্ট সময় পাইনি তবু খুব মিস করি তাঁকে। বেঁচে থাকলে তিনি হয়তো আমাকে রাত জাগতে দিতেন না। হয়তো আমার লেখালেখি পছন্দ করতেন না, জোর করে প্রকৌশলী বা চিকিৎসক হতে বলতেন। হয়তো আমার বন্ধুবাৎসল্যে সমালোচনা করতেন। হয়তো আমার মাধ্যমিক অথবা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় পাশের ঘরে রাত জাগতেন। হয়তো পরীক্ষার ফলাফল শুনে কাঁধে হাত রেখে আরো ভালো করার উৎসাহ দিতেন। হয়তো কোন মেয়ের প্রতি আমার দুর্বলতা তাঁকে কিঞ্চিত চিন্তিত করে তুলত। হয়তো আমার খোঁচা খোঁচা দাড়ি দেখে আমার বড়ো হয়ে ওঠা তাঁকে গর্বিত করে তুলত… হয়তো!

বাবা, তোমাকে আমি খুব মিস করি!!