ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সুরের ভুবন

 

নব্বই দশকে বাংলা রক মিউজিকের বিকশিত হবার সময়টাতে বলা হত- ‘গান না, বিকৃত রুচির এবং চিৎকার-চেঁচামেচি তৈরি করছে ব্যান্ডগুলি।’ প্রচুর সমালোচিত হতো তারা সেসময়। এখন মানুষের মধ্যে সেরকম নেতিবাচক মনোভাব নেই একদমই। মানুষ সেরকম অভ্যস্ত ছিলো না এমন গানের সাথে। পরে ঠিকই শুনেছে, ভালোবেসেছে। আসলে বাধ্য হয়েছে শুনতে।

MicFS-Silver

এতে ভূমিকা রেখেছে ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটা, ফিলিংস বা এলআরবির মতো ব্যান্ডগুলি। সেই গানের বক্তব্যে আমাদের নিজেদের যাতনার কথাই ছিলো বেশি। নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর অধিকারের কথা এসেছে সসব গানে। ওই সময় হার্ড রক ধাঁচের গান করত ওয়ারফেজ, রক স্টার্টা, ইন ঢাকা আর অ্যাসেস।

২২ জুন ১৯৯১ সাল। ওয়ারফেজ ভলিউম ওয়ান নামে নতুন একটি অ্যালবাম এল বাজারে। পুরোদস্তুুর হার্ড রক আর হেভি মেটাল ধাঁচের গান। একটু অন্য রকম বাংলা গানের স্বাদ পেলো বাংলা গানের শ্রোতারা। কিছু শ্রোতা ভালোবাসলেন শুরুতেই। বাকীরা সেই গানকে ভালোবাসলেন কিছুদিনের মধ্যেই। অল্পদিনেই এ গান পৌঁছে যায় এক তরুণ থেকে আরেক গানপাগল তরুণের কাছে। তরুণদের মাঝে বাংলা হার্ড রক আর হেভি মেটাল ধাঁচের গান জনপ্রিয় হয়। এই যেমন অবাক ভালোবাসা (১৯৯৪), জীবনধারা (১৯৯৭), অসামাজিক (১৯৯৮) অ্যালবাম তিনটি শোনেনি এমন গানপাগল তরুণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

012
রক গান কখনোই গোপনে প্রতিবাদ করে না, সে মুখোমুখি দাঁড়ায়। চোখে আঙুল দিয়ে বলে- এই হলো ঝঞ্ঝাট, আর এই হলো তার প্রতিকার। এবার নাও, কী করবে করো। যদি কিছু না করো, তাহলে আবার পিন ফোটাব, নয়তো নিজেরাই মাঠে নামব। তার জন্য দরকার শক্তিশালী লিরিক। পৃথিবী বদলানোর মতো আগুন।’

এই মুহুর্তে ঢাকার বেশীরভাগ ‘হার্ড রক’ বা ‘হেভি মেটাল’ ব্যান্ডগুলো ইউরোপ-আমেরিকার ব্যান্ডগুলোর মতো সেজে নিজেদের তেমনটাই ভাবছে। বলছে আমরা ‘থ্র্যাশ মেটাল’, ‘ব্ল্যাক মেটাল’ বা ‘ডেথ মেটাল’ গাইছি, কিন্তু যা বলতে চাইছে তাতে নেই আমাদের শেকড়। আমাদের কথা সেখানে অনুপস্থিত। আসলে বেশির ভাগই তো এখানে কখনওই শিকড়টা ভালো ভাবে দেখেনি। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ে এসেছে ইংলিশ মিডিয়াম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। তাদের অনেকেই এই মাটি, মাটির ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে কম। এ বিষয়ে পড়াশোনা, জানা-বোঝা কম। এ কারণে তারা তাদের নিজেদের লিরিকও লিখতেও অপারগ। এই ছেলেগুলির লিটাররেচার অধ্যয়নও কম। একারণে তারা মিউজিক ভালো করলেও গানের শরীরে থেকে যাচ্ছে ভাসা ভাসা কথা বা এমন কথা তার নিজের ‘বলবার কথা’ না।

প্রেম-ভালোবাসার বিরহ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক, যুদ্ধ, যুদ্ধবিরোধী মানসিকতা, রাজনীতি সচেতনতা, মাদকাসক্তির কুফল, জন্ম-মৃত্যু এসব বিভিন্নদিক ফুটে ওঠে হেভি মেটালে। এই যে একটা খারাপ সময় যাচ্ছে। প্রতিদিন কত কত অনিয়ম হচ্ছে। এই যে যশোর রোডের ২৭০০ গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, সুন্দরবনের বুকের ভেতর বসানো হচ্ছে পাওয়ার প্ল্যান্ট, হাজার হাজার মানুষ গুম হচ্ছে। আরো কত কী হচ্ছে, কিন্তু সরাসরি কোন বিষয়ভিত্তিক প্রতিবাদ কই হচ্ছে? সবার আগে তো রক মেটাল ব্যান্ডগুলোর কাছ থেকে আওয়াজ আসার কথা।

সত্যি বলতে আমাদের এ তল্লাটে ওই অর্থে কোনও রক মুভমেন্ট শুরু হয়নি। ব্যাপারটা আসলে গান করা না, রক্তের ভিতরে নিজের দেশ ও সংস্কৃতি অধিকারকে ধারণ করা। তার জন্য লাগবে প্রচুর জানাশোনা আর পড়াশোনা। তারপর না তার কিছু বলার মতো কথা থাকবে!

এইসব সমস্যায় ব্যান্ডগুলির নিজেদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে বলা কথাগুলো শুনতে চাই আমরা। আমরা চাই এই ব্যান্ডগুলির নিজস্ব দর্শন থাকুক।