ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

রইস ভূইয়া। যিনি নিজে তার হত্যা প্রচেষ্টাকারীকে মাফ করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় লড়েছিলেন সেই খুনির মুক্তির জন্য। নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ব বিবেককে, যে ঘৃণা দিয়ে নয় ভালবাসা দিয়েই শান্তিময় করা যায় মানুষের এই বিশ্বটাকে।

দেখিয়েছিলেন ক্ষমাই মহত্ম। লড়েছিলেন মানবতার জন্য। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদীতে ৮জন বাংলাদেশী নাগরিককে ডাকাতি ও একটি হত্যার জন্য শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। তাই এ সময়টাতে মধ্যপ্রচ্যবাসীদের আমাদের এ প্রসারিত হৃদয়ের বাংলাদেশী রইস ভূইয়ার সে প্রচেষ্টাকে, তার স্বপ্নগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।


উপরের ছবিতে নিউইয়র্ক টাইমসে রইস ভূইয়াকে নিয়ে প্রকাশিত খবর


ছবিতে সিএনএনএ প্রকাশিত খবরের একটি স্ক্রিন শট দেখা যাচ্ছে


বিবিসিতে প্রকাশিত খবরের ছবি

প্রথম আলের ছুটির দিন ম্যাগাজিনে তার প্রকাশিত সৎক্ষাতকারটি নিচে তুলে ধরছি:

সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?

২১ সেপ্টেম্বর ২০০১। শুক্রবার, দুপুর সাড়ে ১২টা। আমি তখন কাজ করি ডালাস শহরে বাকনার ফুডমার্টের একটা গ্যাসস্টেশনে। ক্যাশে রেজিস্টারের সামনে বসে আছি। হঠাৎ চোখে পড়ল কালো সানগ্লাস পরা সাদা চামড়ার এক মার্কিন (যাঁর নাম পরে জেনেছিলাম মার্ক স্টোম্যান) ঠিক আমার সামনেই বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে। আমি ধরেই নিলাম যে তাঁর ডাকাতি করার মতলব। আমি আগেভাগেই ক্যাশ রেজিস্টার থেকে টাকা-পয়সা যা ছিল. সব তাঁকে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আর বিনয়ের সঙ্গে শুধু বললাম, আমাকে যেন গুলি করা না হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই কী যেন হয়ে গেল! কপালের ডান পাশে চিনচিন একটা ব্যথা অনুভব করলাম। সেই সঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা। এদিকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম যে গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ছেলেবেলায় যত দোয়া মুখস্থ করেছিলাম, সব পড়তে শুরু করলাম। সেই সঙ্গে আবছা আবছা সব প্রিয় মানুষের ছবি একে একে আমার চোখের সামনে ভাসছে। আবার দেখি একটা গোরস্থান। বেশ বুঝতে পারলাম, আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত এভাবেই আমার মৃত্যু হবে? আবছা চোখে আবিষ্কার করলাম, বন্দুক হাতে সাদা চামড়ার হন্তারকটা তখনো আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। আমি লুটিয়ে পড়ে গেলাম। আমার নিশ্চিত মৃত্যু হবে দেখে মার্ক স্টোমেন ধীরে ধীরে আমার সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে শুরু করলাম। পাশের একটা সেলুনে ঢুকে পড়লাম যদি কারও সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু তখন সবাই আমার চেহারা দেখে ভীত। আমি এই প্রথম সেলুনের আয়নায় আমার নিজের চেহারা দেখলাম। দেখি আমার মাথা আর মুখ থেকে শুধু রক্তের স্রোত। এক ভদ্রলোক দয়াপরবশ হয়ে ৯১১ ইমার্জেন্সিতে ডায়াল করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুলেন্স এসে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। হাসপাতালে আমি বেশি দিন চিকিৎসা নিতে পারিনি। কারণ, তখন আমার কোনো মেডিকেল ইনস্যুরেন্স ছিল না। আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমি কীভাবে কীভাবে যেন বেঁচে গেলাম।


তারপর মার্ক গ্রেপ্তার হলো?

হ্যাঁ, মার্ক আমাকে ছাড়াও একজন পাকিস্তানিকে গুলি করেছিলেন। সেখানে ভিডিও ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে তাঁকে শনাক্ত করা হয় এবং মার্ককে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল কোর্টের রায়ে মার্কের মৃত্যুদণ্ড হয়।

মার্কের উপযুক্ত সাজা হওয়ায় আপনি খুশি হননি?

না, মোটেও না। আর তখন আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় ছিলাম। আমি তখন আমার জীবন নিয়ে খুব ভীত। বাইরে খুব একটা বের হই না। আর সবকিছুতেই খুব সন্দেহ। মনে হয়, এই বুঝি আমাকে কেউ মারতে আসবে, আমাকে মেরে ফেলবে। সবকিছুতেই উৎকণ্ঠা। বিভিন্ন রকম শিক্ষামূলক এবং মনস্তত্ত্ববিষয়ক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা পাওয়ার চেষ্টা করলাম। আর ভাবলাম, জীবনটা যেহেতু ফিরে পেয়েছি, তাই এই জীবনকে দুস্থ আর সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করব। তাই প্রথমেই ঠিক করলাম, যে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে, তাঁকেই অর্থাৎ মার্ককে বাঁচাতে হবে।

যে আপনাকে গুলি করল তাঁকে আপনি মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাবেন—এ রকম ধারণা বা প্রেরণার মূলে আপনার শক্তি কী ছিল?

সত্যি বলতে, অনেক কিছুই কাজ করেছে। আমার মা ছেলেবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন যে ‘কেউ যদি তোমাকে আঘাত করে, তাকে তুমি পাল্টা আঘাত করবে না। বরং তাকে ক্ষমা করে দেবে।’ আমার মা-বাবা সব সময় এই কথা বলতেন। আরেকটা বিষয় হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধ আমার মধ্যে সব সময় খুব বড় হয়ে কাজ করে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম। আমাদের ধর্ম কখনোই বিদ্বেষ, ঘৃণা অনুমোদন করে না। আমি আমার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে চাই। তিনি যদি তাঁর প্রাণ ফিরে পান, তাহলে নিশ্চয় তিনি তাঁর খারাপ কাজগুলো আর করবেন না। এটা আমার দৃঢ়বিশ্বাস। আর ক্ষমার চেয়ে মহৎ আর কী হতে পারে!

কাজটা কীভাবে শুরু করলেন?
আমি আগেই বলেছি, জীবন যেহেতু ফিরে পেয়েছি, তাই এই জীবনকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য আমি স্থির করে ফেলেছি। আর সে কারণেই ভাবতে থাকি, কীভাবে সামনের দিকে এগোলে ভালো হয়। আমি প্রথমেই আমার এলাকার (ডালাস) সব ইসলামিক সেন্টার এবং মসজিদের ইমামদের বিষয়টা বলি। তাঁরা সবাই শুনে আমার খুব প্রশংসা করলেন এবং বললেন যে, ইসলাম হলো ক্ষমার ধর্ম, শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম।

তাঁরা আরও বললেন, আমি যে কাজ করতে যাচ্ছি, আমাদের ধর্মে তা সম্পূর্ণভাবে অনুমোদন আছে। সত্যি বলতে, তাঁরা সবাই আমাকে খুব উৎসাহ দিলেন। তারপর আমি এসএম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রাইটস বিভাগের অধ্যাপক রিক হেলপেলিনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সোসাইটি আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠন আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। ‘ঘৃণা নয়, মানবতায় বিশ্বাসী’—এই স্লোগান সামনে রেখে আমি আমার প্রচারণা শুরু করি। ২০ জুলাই লেথাল ইনজেকশনের মাধ্যমে মার্কের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। কিন্তু আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, যেন মার্ককে বাঁচানো যায়। এই লক্ষ্যে আমি একটা ওয়েবসাইট তৈরি করেছি,ঠিকানা:
www.worldwithouthate.org”

http://www.youtube.com/watch?v=vOCy0vcuU1o

ইদানিং ধর্মীয় প্রতিনিধীত্বকারী লোকেদের একটি অংশ, রক্তের বদলে রক্ত, চোখের বদলে চোখ বা মাথার বদলে মাথার ইসলামিক রাষ্ট্রের একটি অনুশাসনের কথা বলছেন। আমি সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মুসলমান। ধর্মী জ্ঞানও তেমন নেই। তারপরও তাদেরকে বলতে চাই ইসলাম হচ্ছে ক্ষমা, ভালোবাসা, ন্যায় বিচারের ধর্ম। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মে একটি বিশেষ রীতিকে তুলে ধরে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য বিষয়গুলো তুলে না ধরে তারা এক ধরনের অন্ধ সৌদী প্রীতী করে যাচ্ছেন।

“হযরত ইউসুফ (আঃ) মিশরের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ভাইদের নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তাই করলেন না। বরং তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বৈমাত্রেয় ভাইদের অভাব অনটন এবং পরকালীন মুক্তির পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাদেরকে অনুগ্রহ করলেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা। এটাই নবী-রাসূলদের আদর্শ।

মক্কা বিজয়ের পর সহাবীদের যারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন, নবী করিম(সা তাদেরকে এ থেকে নিবৃত্ত করেন । নবী করিম (সা মক্কা বিজয়ের দিনকে শান্তি ও রহমতের দিন আখ্যায়িত করে সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন, আজকের দিনে আমি তাই করবো যা আমার ভাই হযরত ইউসুফ(আ তার বৈমাত্রেয় ভাইদের সাথে করেছিলেন। বর্ণনায় এসেছে, ক্ষমতাবান হওয়ার পর অত্যাচারী শত্রুকে ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নিদর্শন ।” (ইসলামিক আদর্শ অয়েব থেকে)

আমাদের ইসলাম ধর্মের পবিত্র কুরআন শরীফে রয়েছে- সূরা আশ-শূরা, আয়াত-৪৩-“অবশ্যই যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।” যে ব্যক্তি তার শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও, যখন তাকে ক্ষমা করে দেন তারে চয়ে মহান আর কে হতে পারে। আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহপাক ক্ষমাশীল ও দয়ালু হিসেবে কুরআন শরীফের বিভীন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। তার শান্তির ধর্মের গোলাম হিসেবে আমাদের ব্যক্তি ও রাষ্ট্রিয় জীবনেও আমাদের মহান স্রষ্ট্রার ক্ষমার গুনটি আমাদের পরিচর্যা করার চেষ্টা করা উচিত।

আমাদের ইসলাম ধর্মে ন্যায় বিচারের কথা একাধিকবার বলা হয়েছে। অথচ আমরা দেখতে পাই একজনকে হত্যার বদলে আটজনকে হত্যা করা হলো, এটা কিভাবে ন্যায় বিচার হতে পারে??? আটজন ডাকাতির সাথে জড়িত থাকলেও আটজনইকি তাকে হত্যা করেছে? হয়তো দুই তিনজন সরাসরি হত্যার সাথে জড়িত ছিল, হয়তো সেখানে দু/একজন হত্যার বিপক্ষে ছিল, কিন্তু যেহেতু হত্যা হয়েছে তাই সে দলের সবার উপরই হত্যার দোষ পড়ছে। সর্বপরি একজন এর বিপরিতে আটজন কখনই ন্যায় বিচারের উদাহরণ হতে পারেনা।

ইসলামের ন্যায় বিচার এ নিশ্চই ১জনের বদলে ৮জনকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়নি? চোখের বদলে চোখ হলে নিশ্চই তা ১টি চোখের বদলে ৮টি চোখ উপড়াবার বিধান নয়, ১টির বদলে একটিই হবে। নয়তো তা জিঘাংসাকে উসকে দেবে। অপরাধের মাত্রার বিবেচনায় আটজনে বিভীন্ন ধরনের শাস্তি হতে পারতো, কারও যাবৎজীবন, কারও স্বল্প সময়ের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড, কারও ফাঁসি, আর্থিক দন্ড…ইত্যাদি।তারা একই অপরাধে অপরাধী হলেও, একই মাত্রার আপরাধে অপরাধী নয়। মাত্রা ভেদে শাস্তি ভিন্নতর হবে।