ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

কাঁচাবাজারে ঢুকতে বেরুতে কিংবা অনেক ঝাঁ-চকচকে শপিং মলের পাশেও, কিছু ছোট দোকান থাকে, দোকানগুলো দেখলেই বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগে। প্রায় শূন্য, ফাঁকা একটা ঘর, কোনোরকমে একটা জরাজীর্ণ টেবিল পেতে তার পেছনে নড়বড়ে চেয়ারে বসে উদাস চোখে হাই তুলছে কেউ। এরা ঠিক কী বিক্রি করে তা কে জানে? কোনো কোনো দোকানে চেয়ার-টেবিলেরও বালাই নেই, মাটিতেই যা-হয় একটা বসার ব্যবস্থা করে নিয়ে দেয়ালে ভেঁড়ানো শূন্য র‍্যাকের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন দোকান-মালিক। তাঁর কাঁচাপাকা ভ্রু’য়ের নিচে চোখের মণিদুটো আজকাল আর জ্বলজ্বল করে না আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র উপন্যাসের ভাগ্য-বিড়ম্বিত মাছ-শিকারী বুড়োর মতো। এসব দোকানে কখনও আদৌ কোনো কেনাবেচা হয় কিনা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। এই দোকানই যদি হয়ে থাকে একটা পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন, তবে সেই পরিবারটি কী করে বেঁচে আছে?

ছেলেবেলায় আমাদের কলোনীতে প্রায়ই ফুটবল খেলা হ’ত। বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে, ঢেঁড়া পিটিয়ে আয়োজন করে ‘ফ্রেন্ডশিপ ম্যাচ’ হ’ত আমাদের স্কুলের মাঠে। খেলা দেখতে ভীঁড় করত আশপাশের দশ গ্রামের মানুষ, আধাবেলার জন্য একেবারে মচ্ছব বসে যেত। খেলা উপলক্ষে আগেভাগে ছুটি হয়ে যেত স্কুল, বিকেল ও সন্ধ্যার প্রাইভেট পড়াও মাফ! সে এক নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার বিকেল! জিলাপি-বাতাসা-চালতার আচার, বাদাম, ছোলা, ঝালমুড়ি, চানাচুর, আইসক্রিম, ডাব, শশা, আমড়া, পানিফল, পিয়াজু, বেগুনী, চা-সিগারেট থেকে নিয়ে হরেক রকম খাবারের দোকান, সাথে টুকটাক খেলনারও পশরা। একবার তো বৈশাখী মেলার চরকি (নাগরদোলা) পর্যন্ত এসে হাজির। পরে অবশ্য চরকি’র ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে ব্যাঘাত হচ্ছে বিধায় চরকি বন্ধ করে ফেলা হলো। … আঠারো বছরে নেহাত কম-সমবার এই ‘তামাশা’ দেখার সৌভাগ্য জোটেনি কপালে।

আজ প্রায় পনের বছর পর মনে করতে গিয়ে সেই হরেক স্বাদের স্বপ্ন-বিক্রেতাদের প্রায় কারুর মুখ মনে পড়লো না আমার, মনে পড়ে গেল কেবল এক কাশির ওষুধ বিক্রেতার মুখ। ক্যারম বোর্ডের ঘুঁটির মতো চ্যাপ্টা চাকতি-সদৃশ সেই বিস্বাদ কাশির ট্যাবলেট আমি কখনো কিনেছি বলে মনে পড়ে না, কিন্তু প্রায়শ মনের জানালায় হানা দিয়ে যান দশাসই চেহারার ঘর্মাক্ত সেই আধা-প্রৌঢ় ট্যাবলেট বিক্রেতা। তাঁর ঝুলে পড়া চওড়া কাঁধের অসহায়ত্ব নিয়েও তিনি যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, তাঁর পেছনে এলাকার তাবৎ বিচ্ছু ছেলেপুলের দল, যারা তাঁকে উত্যক্ত করছে, তাঁর ছেঁড়া প্যান্টের কোমর থেকে বেল্টের অভাবে ঝুলে থাকা গরু বাঁধার দড়ি ধরে টানাটানি করছে, বহু ব্যবহারে ছিঁড়ে যাওয়া কাঁধে ঝোলানো আদ্দিকালের রেস্কিনের ব্যাগের ফুটো থেকে ট্যাবলেটের শিশি বের করে নেয়ার চেষ্টা করছে। এই বিচ্ছুর দলকে দূরে সরিয়ে দিতে তিনি থেকে থেকেই হাঁক দিচ্ছেন, বদ্ধ উন্মাদের মতো টকটকে লাল চোখ পাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় চিৎকার করতে করতে তাড়া করছেন –

খুলুর খুলুর কাশি

কাশিই গলার ফাঁসি

সবার হাসাহাসি

তোমার গলায় বাঁশি

রাখেন কেন পুষি?

 

খকর খকর কাশি

গলায় বাজে কাঁশি

বেদম হাসাহাসি

এর চে’ ভালো ঘুঁষি

রাখেন কেন পুষি?”

মাঠ জুড়ে ব্যাপক বিনোদন, অথচ দিনশেষে একটাও বিক্রি হলো না! চালতার আচার গুড়ের জিলাপির কাছে কোথায় লাগে কাশির বড়ি!

পঞ্চাশোর্ধ সেই আধবুড়ো দশাসই লোকটিকে দেখে এক পড়ন্ত বিকেলে আমার বাবার কথা মনে হয়ে গেল, কেন যে! কী এক না-বোঝাতে-পারা মায়ায় আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম, এই বিচ্ছু ছেলেগুলির চেয়েও ভয়ঙ্কর এক বিচ্ছু ওঁৎ পেতে আছে তাঁর ঘরে, যার নাম খিদে! তাঁরই সমবয়সী আমার বাবা পথে বেরুলে কতজন হাত তুলে সালাম দেয়, কুশলাদি জিজ্ঞেস করে, সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দেয়। অথচ এই লোকটি যেখানেই যান, গুঁড়ো গুঁড়ো কাঁচা-বাচ্চারা “খুলুর খুলুর কাশি” বলে তাঁকে খেপায়, যাতে তিনি একটা সময় ধৈর্যের শেষ সীমাটুকু পেরিয়ে গিয়ে, “যা শালা কাঙ্গালের বাচ্চারা, ফিরি খায়া যা” বলে সব ক’টা ট্যাবলেট ছুঁড়ে দেন আকাশের দিকে, আর হরিলুটের বাতাসার মতো সবাই তা খুঁটে খুঁটে খেতে পারে। নেহায়েত ক’টা টাকার জন্য … অথচ সে টাকাও তো জুটলো না!

এক পড়ন্ত বিকেলে এই ভগ্নস্কন্ধ অপটু-বিক্রেতা বুকভরা হাহাকার নিয়ে নিস্পলক চেয়েছিলেন আমার দিকে, কারণ তাঁকে দেখে আমার বাবার কথা মনে হয়েছিল!

দেড়-দুশো লিরিক নিয়ে আমার একটা সবুজ খাতা হারিয়ে গেছে। আর কখনো ফিরে পাবো না। সে খাতার গানগুলোও আর হবে না লেখা। খাতাটা কোনো অ-সুরের হাতেই পড়ে থাকবে, নয়তো তার একটা দুটো গান তো বাতাসে ভেসে বেড়াতো! … অপচয়, কী নিদারুণ অপচয়! এর পরেও আমি আরো অনেক গান লিখেছি, কিন্তু সেই সবুজ খাতার মতো সেগুলো আর সবুজ হয়নি। … অবশ্য, এ কালের শ্রোতারা হয়তো সবুজের বদলে ধূষর গানই বেশি পছন্দ করেন…

হারিয়ে যাওয়া সবুজ খাতাটার কথা আজকাল প্রায়ই মনে পড়ে। যখন কোনো সদাই-শূন্য দোকানদারকে চৈত্রের দুপুরে উদাস বসে হাই তুলতে দেখি, কিংবা যখন কৈশোরের জানালার শিক ধরে দাঁড়ান সেই বৃদ্ধ কাশির লজেন্সওয়ালা, হারিয়ে যাওয়া সবুজ খাতাটির অভাব তখন খুব বোধ করি, খুব! সবুজ পাতার কোমল ভাঁজে একবার হলেও আমি তাঁদের কথা লিখেছিলাম, আমি লিখতাম – আমার কলম সাক্ষী! এই বীরভোগ্যা শহর সেসব শুনতে চায়নি, পড়তে চায়নি।

তবু যেন আবছা আবছা মনে পড়ে, আমি লিখেছিলাম। আমি লিখতাম!