ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্যক্তিত্ব

Father John

২০০৭ সালের দিকে হবে। দিনাজপুর যাচ্ছি বাসে চড়ে। যাওয়া তখনো শুরু হয়নি। বাস কাউন্টারের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছি আরো অনেক যাত্রীর সাথে, বাস এসে পৌঁছেনি। অনেকগুলো রুটে বাস ছাড়ে এই একই কাউন্টার থেকে, একটার পর একটা কোচ এসে ভিঁড়ছে, কন্ডাক্টর গন্তব্য ও যাত্রার সময় ধরে হাঁকছে, তাই শুনে নির্দিষ্ট যাত্রীরা উঠে পড়ছেন কোচে। এর মধ্যে সাড়ে ছ’ফুটের মতো দীর্ঘকায় এক ভিনদেশী ভদ্রলোক, চেহারা-সুরতে ইউরোপীয় বলে ঠাহর হয়, যে-কোনো কোচ এসে দাঁড়ানো-মাত্রই ছুটে যাচ্ছেন ব্যাকূল হয়ে। পিঠে বেকায়দা রকমের ওজনদার এক ব্যাকপ্যাক নিয়ে অনায়াসে ছোটাছুটি করছেন আর হাতের টিকেট দেখিয়ে একে-ওকে জিজ্ঞেস করছেন – ‘দিনাজপুর? দিনাজপুর??’, তারপর কোচ’টা অন্য কোথাও যাচ্ছে শুনে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন পূর্বের জায়গায়। আমার কথ্য ইংরেজি বরাবরই দুর্বল। লিখতে পড়তে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু বলার ব্যাপারে ঠিক ততোটাই নার্ভাস। তবু সাহস করে এগিয়ে গেলাম, অনেকক্ষণ ধরে মনে মনে সাজানো বাক্যটি আউড়ে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম, আমি কি আপনার টিকেট’টা একবার দেখতে পারি? অচেনা একটি ছেলে বলা নেই কওনা নেই তাঁর টিকেট দেখতে চাইছে – এতে বরং তাঁর বিরক্তই হবার কথা ছিল, কিন্তু তিনি তা হলেন না। খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে টিকেটটা আমার হাতে দিলেন, আমি সময় মিলিয়ে দেখলাম – আমরা একই বাসের সহযাত্রী। সে কথা তাঁকে বলতেই তিনি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে অনুরোধ করলেন – উদিউ প্লিস মেক মি এ কল ওয়েন বাস এরাইভ? আমি সাথে সাথেই তাঁকে আশ্বস্ত করলাম – শিয়র, মাই প্লেজার!

বাস আসতেই আমরা উঠে পড়লাম, দু’জনের সিট পড়েছে দুই সারি তফাতে। তিনি নিজের স্থানে লাগেজ রেখে আমার সিটের পাশে দাঁড়িয়ে আলাপ শুরু করলেন। আমার বাঙালী ভদ্রতা-জ্ঞানে অস্বস্তি লাগছে, বয়স্ক একজন মানুষ, তাও বিদেশী – দাঁড়িয়ে আছেন আর আমি বসে… এক সময় পাশের সিটের সহৃদয় যাত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের পাশাপাশি বসার সুযোগ করে দিয়ে পেছনে চলে গেলেন, আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। ততক্ষণে আমার ইংরেজি বলার প্রাথমিক জড়তা কেটে গেছে, নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি এত সাবলীলভাবে কী করে বলতে পারছি – তা ভেবে। জানলাম, ভদ্রলোকের নাম জন, জন্মসূত্রে ইতালিয়ান। আমি গদগদ হয়ে বললাম, ইটালিয়ানরা তো দারুণ ফুটবল খেলে! তিনি বললেন, তুমি পছন্দ করো? অদ্ভূত! আমি পছন্দ করতে পারি না। এরা কবে আক্রমণাত্মক ফুটবল শিখবে? বড় বেমানান! আমি থতমত খেয়ে গেলাম, ইতালির রক্ষণাত্মক ফুটবল যে আমারও ভালো লাগে না – এ কথা এখন আর বলার উপায় নেই, কেননা একটু আগেই তাদের ফুটবলকে ‘ট্রেমেন্ডাস প্লে’ বলে ফেলেছি! তবে মুগ্ধ হলাম তাঁর সোজাসাপ্টা মূল্যায়ন শুনে, যদিও সত্যিকার অর্থে আমাকে বিস্মিত হতে হলো – যখন জানলাম, ফুটবল-পাগল এই মানুষটি আসলে একজন যাজক। রোমান ক্যাথলিক সেইন্ট হিসেবে দীক্ষা নেয়ার পর বর্তমানে তাঁর ধর্মীয় পদবী – ফাদার! অথচ তাঁর জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট-কেডসের বেশভূষা দেখে কে তা অনুমান করবে? আমার ততক্ষণে ইংরেজি বলার প্রাথমিক জড়তা কেটে গিয়ে মুখ ছুটে গেছে, আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে ক্রিশ্চিয়ানদের আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি বা মতবাদের পার্থক্য এবং গোষ্ঠীগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে জানতে চাইছি, তিনিও বলছেন। মাঝে একটু শঙ্কিত বোধ করলাম, গভীর রাতে ইঞ্জিনের আওয়াজ আর চাকার ঘর্ষণকে ছাঁপিয়ে আমাদের এই উচ্চস্বরের আলাপ অন্য যাত্রীদের আবার না ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়! কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলাম – বিরক্ত হওয়া দূরে থাকুক, কাছাকাছি প্রায় সবাই আগ্রহ নিয়ে আমাদের আলাপ শুনছেন, বোঝার চেষ্টা করছেন। দৃষ্টি বিনিময় হতেই একজন জানতে চাইলেন – কী বলতেছে ভাই? আমরাও একটু বুঝি!

যমুনা সেতু পেরোনোর পর যাত্রা বিরতি। দু’জনে এক সাথে নামলাম, আমার তখন ধূমপানের বদভ্যাস ছিল, কিন্তু তাঁর সামনে সঙ্কোচ করে পকেটে হাত দিলাম না। তিনি কীভাবে যেন বুঝতে পেরে গেলেন, বললেন, তোমার যদি ধূমপানের ইচ্ছে জাগে, তুমি তা নিঃসঙ্কোচে করতে পারো। অনুমোদন পেয়ে সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম, তাঁকে সাধতেই বললেন, আমি এতে অভ্যস্থ হতে পারিনি, তবে মাঝে কয়েকবার লোকাল চুরুট (বিড়ি) খেয়েছি! টু হার্ড টু ইনহেল!

বাস আবার ছাড়লে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, সেই ঘুম যখন ভাঙলো, দেখি বাস ফাঁকা! ভোরের আলো ফুটছে, সব যাত্রী নেমে গেছেন, চলে গেছেন যে যার গন্তব্যে, শুধু ফাদার জন বসে আছেন বনেটের উপর। কী লজ্জা! বাস কখন দিনাজপুর পৌঁছে গেছে, আমি টেরও পাইনি! আমি সিটে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছি আর ফাদার কিনা বসে আছেন আমার কাছ থেকে বিদায় নেবেন বলে! যাহোক, আমি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে জানতে চাইলাম,

–       ফার্স্ট টাইম অ্যাট দিনাজপুর?

–       নত রিয়েলি, বাত নত এ প্রবলেম তু ম্যানেজ!

–       ডোন্ট বি শাই… লেট মি হেল্প ইউ টু রিচ ইউর প্লেস…

–      নো নো, থ্যাংকস… ইউ মেদ মাই জার্নি প্লেজার… নো মোর হেল্প আই নিদ… মে আল্লাহ্ ব্লেস ইউ!

এক রোমান ক্যাথলিক সেইন্ট আমার জন্য করুণা ভিক্ষা করছেন ‘আল্লাহ্’র কাছে! বিস্ময়ে অভিভূত আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। আমার জন্য সত্যিকার চমক শুরু হলো তখন!

ফাদার জন কথা বলছেন রিকশাওয়ালার সাথে –

–       কশবা মিশন যাবে?

–       যাবো

–       কোতো নিবে?

–       তিরিশ ট্যাকা

–       এতো তো হোবে না! যখন এতা দিনের বেলা, ভাড়া হোয় খুব বেশি তো বড়জোর সাত তাকা, এখন দিনের শুরু বলে তুমি পেতে পারো দোশ তাকা। আমি বিদেশী বলিয়া দিলাম আরো পাঁচ তাকা, মিলিয়া হোলো পনের তাকা… যদি থাকো সন্তুষ্ট, তবে চোলো যাই…

আমি হতভম্ব হয়ে ছুটে গেলাম,

–       হোয়াট আ সারপ্রাইজ ফাদার, ডু ইউ নো বেঙ্গলী?

–       বলিতে যেমন পারি, বুঝিতেও পারি…

–       তাহলে আগে বলেন নি কেন?

–       কী বিস্ময়কর! আমি ভাবিলাম, তুমি বোধহয় বাংলা জানো না!

এই ফাদার জনের সাথে আমার ও আমার পরিবারের পারিবারিক বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়ে গেল। সেটা আরেক মজার গল্প।

ফাদার জন দিনাজপুরে বসবাস করছেন ১৯৯৮-৯৯ সাল থেকে, স্থানীয় সেইন্ট ফিলিপস হাইস্কুলের হোস্টেলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে এখানে তিনি কর্মরত। প্রথম পরিচয়ে যে-কাউকে খুব মজা করে বলেন – একশো চল্লিশটা শয়তান ছেলেকে পিটাইয়া মানুষ বানানোর কাজ করি! বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত দিনাজপুরের সরল-সোজা মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি তাঁকে এতটাই আকর্ষণ করেছে যে অল্প ক’দিনের জন্য এই শহরে এসেই তিনি এর প্রেমে পড়ে যান – শহরের নয়, দিনাজপুরের গ্রামের। আদিবাসী সাঁওতাল, ওঁরাও প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের সাথেই তাঁর বেশি ওঠাবসা, সেই মানুষদের তিনি করুণা নয়, ভালোবাসার বন্ধনে আপন করেছেন। পেশায় ধর্মযাজক হলেও তিনি ধর্মবাণী প্রচারের চেয়ে বরং মানুষের সাথে মিশতেই বেশি পছন্দ করেন। কারো উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার তিনি ঘোর বিরোধী, তিনি শুধু নৃবিজ্ঞানীদের মতো খুব কাছে থেকে তাদের জীবনযাত্রা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের লোকাচার অণুবীক্ষণ করেন। এদেশে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী দুটো যন্ত্র – তাঁর একশো পঁচিশ সিসি’র হোন্ডা মোটরসাইকেল আর ক্যানোনের খুব শক্তিশালী একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা। এই ক্যামেরাই তাঁর সাথে আবার আমার দেখা করিয়ে দিলো।

২০০৮ সালের পহেলা বৈশাখের সকালে সারপ্রাইজ ভিজিটে দিনাজপুর গিয়েছি, মাত্র দশ দিন আগে বিয়ে করা নতুন বউকে চমকে দিতে। সদ্য শেষ হওয়া শোভাযাত্রার ভীঁড় ক্রমশ কমে আসছে, হঠাৎ দেখি ফাদার জন! তাঁর বিখ্যাত ভটভটি চালিয়ে আমাদের দিকেই ছুটে আসছেন। বলাই বাহুল্য, আমাকে তিনি চিনতে পারেন নি, আসলে তাঁর লক্ষ্য আমার মামাতো বোন মৌলি। এসেই তিনি খুব পরিচিতের মতো বললেন, ‘এই মেয়ে, তুমি কোথায় থাকো? আজ তোমার বাড়ি চিনে আসবো, চলো’। … আমরা বরাবরের মতো সপরিবার শোভাযাত্রায় যোগ দিতে গিয়েছিলাম, তাঁর কথা শুনে সপরিবার অবাক হলাম। তখন তিনি রহস্য ভাঙ্গলেন। গত বছর এই পয়লা বৈশাখের র‍্যালিতেই তিনি ছবি তুলেছিলেন মৌলি’র, সেই ছবি ইতালির একটি প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হয়েছে। আর্থিক কোনো পুরস্কার নয়, কেবল সার্টিফিকেট এবং সেই সাথে ছবিটির বিশাল একটি এনলার্জমেন্ট স্থান পেয়েছে একটি বিখ্যাত ফটোগ্রাফি মিউজিয়ামে। কোনোদিন যদি মৌলি সেই মিউজিয়ামে যাবার সুযোগ পায়, তো নিশ্চয়ই সে মুগ্ধ হয়ে যাবে তার প্রমাণ সাইজের প্রতিকৃতি দেখে! তো, এই আনন্দ সংবাদটি এবং সেই সাথে পুরস্কার জেতা ছবিটি হাতে হাতে দেয়ার জন্য তিনি পুরো এক বছর ধরে মৌলিকে খুঁজছিলেন মনে মনে, আজ আবার এক নববর্ষের শোভাযাত্রাতেই পেয়ে গেলেন। আমার মামা অর্থাৎ মৌলি’র বাবা বললেন, আপনি তো ছবিটা দেখিয়ে শহরের কারো কাছে খোঁজ চাইতে পারতেন! তিনি সাথে সাথে দাঁতে জিব কেটে বললেন, কিছুতেই না, কিছুতেই না! তাতে ওর অসম্মান হয়ে যেত না কি? আমি আবারও মুগ্ধ হলাম তাঁর সৌম্যমূর্তিতে।

ফাদার জন সাধারণত ইংরেজি বলেন না। বাংলা ভাষাটা পুরদস্তুর রপ্ত করতে তাঁর যে আন্তরিকতা, সেটা আমি এ কালের কোনো বাঙালির মধ্যে আদৌ দেখিনি। বাক্যের মধ্যে বিশেষ কোনো শব্দ মনে মনে খুঁজে না পেলে আগের শব্দটিকে টেনে ধরে থাকেন, তবু তার বদলে লাগসই ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করেন না। যেমন, একদিন আমাদের কিছু ছবি তুলেছিলেন তিনি, সেই ছবিগুলো কীভাবে দেবেন তা জানাতে গিয়ে বললেন, ‘বাসায় গিয়ে ছবিগুলো ক্যামেরা থেকে নামিয়ে একটা-আ-আ-আ-আ…’ আসলে ‘ডিস্ক’ শব্দের কোনো বাংলা প্রতিশব্দ আছে কিনা মিলিয়ে দেখতে গিয়েই ‘একটা’র উপর এত লম্বা টান! আবার তাঁর বাংলা বাক্যগঠন রীতিও বেশ মজার। একদিন হঠাৎ বাসায় এসে হাজির, হাতে একটা পলিব্যাগে গরম জিলাপি। ব্যাপার কী? জিলাপি কেন? তিনি জানালেন, ‘যখন যাচ্ছি বাইকে চড়ে শহরের পথে, দেখলাম এটা দোকান রাস্তার পাশে, প্রস্তুত হচ্ছে গরম জিলাপি খুব উত্তমরূপে… ভাবলাম আনন্দময় হবে যদি তা ভাগাভাগি করা যায় আপন কিছু বন্ধু-স্বজনের সাথে, তো থেমে গেলাম ও নেমে গেলাম বাইক থেকে আর কিনে নিলাম গরম জিলাপি আর বাইক ঘুরিয়ে চলে এলাম তোমাদের জায়গায়… কারণ তোমাদেরকেই উত্তম বন্ধু-স্বজন ভাবলাম!’ যে করেই হোক, বাংলা তাঁকে বলতেই হবে – এই নাছোড়বান্দা মনোভাবের পেছনে তাঁর যুক্তি হলো, ভাষা হলো প্রতিটি জাতির, সংস্কৃতির দরজার মতো। আমি তোমার ভাষা শিখলাম মানে তোমার ঘরে ঢুকতে পারলাম। তোমার ভাষাকে ভালোবাসলাম মানে তোমার ঘরে আমার একটা পাকাপোক্ত স্থান করে নিতে পারলাম।

আমাদের বাড়িতে যেকোনো উৎসব-অনুষ্ঠান আয়োজনে তিনি পরিবারিক সদস্য কিংবা নিকট আত্মীয়ের মতো যোগদান করেন। নববর্ষ, ঈদ, কারো বিয়ে, জন্মদিনসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে। এমনও হয়, নববর্ষ বা ঈদের আগে আগে তিনিই আমাকে ফোন করেন, দিনাজপুর কবে যাচ্ছি তা জানতে। এই আন্তরিকতাটুকু এত ভালো লাগে! আবার ক্রিসমাসের দিনে বাসায় এসে পরিবারের সবাইকে সাথে করে নিয়ে যান তাঁর মিশনে, আপ্যায়ন করেন তাঁর পরিবার-পরিজনের মর্যাদায়। সবচেয়ে মজা লাগে, যেকোনো কিছু খেতে দিলে খুব আগ্রহ করে হাত পেতে নেন এবং চামচ রেখে দিয়ে হাতে তুলে চেটেপুটে খান। একবার আম্মু তাঁর ছোলার ডালের হালুয়া অমন চেটেপুটে খাওয়া দেখে ভাবলেন, খুবই পছন্দ হয়েছে নিশ্চয়ই, তাই আরেক বাটি এনে দিলেন, তিনি এটাও চেটে খেলেন। আম্মু যখন আবার দিতে যাচ্ছেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন বারবার পরিবেশনের রহস্য এবং জানালেন, ‘বিশ্বজগত টিকে আছে যে ক্ষূধার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে, সেই ক্ষূধা নিবারণের ‘উপায়’কে আমি অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তাই তার একটি কণাও অপচয় করতে আমি আগ্রহী নই’।… কী অসাধারণ তাঁর চিন্তা!

আবার আরেক দিন, খাবারের স্বাদ-গন্ধ ইত্যাদি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়ায় অভিনব এক দর্শনের কথা বললেন। ‘আপনি লবণ বেশি খান, না কম?’ কিংবা ‘তরকারিতে কতটা পরিমাণ ঝাল পছন্দ করেন?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, আমার কাছে মশলার আন্দাজ গুরুত্বপূর্ণ নয়, মশলা ব্যবহারকারীর প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি ঝাল বেশি দিয়ে রাঁধেন, আমার জানার কথা নয় – এটা ইচ্ছাকৃত বেশি, নাকি ঝাল এমনটাই হবার কথা। তাই আমি ধরে নেবো, এই রান্নার প্রক্রিয়াটা এমনই। আমি তাই খাবারকে স্বাদ দিয়ে বিচার করি না, বিচার করি খাবার পরিবেশনকারীর আন্তরিকতা দিয়ে। আপনি আমাকে ভালোবেসে, আগ্রহ করে খেতে দিচ্ছেন, নাকি দায়সারাভাবে, কর্তব্যবোধ থেকে কিংবা বাধ্য হয়ে খাওয়াচ্ছেন – তার উপর নির্ভর করে, আপনার খাবার আমার জিভে কেমন স্বাদ সৃষ্টি করবে। … সেই প্রসঙ্গেই জানালেন, আদিবাসি পল্লীতে গিয়ে তাঁকে প্রায়ই ইঁদুর, বাদুড় এসবও খেতে হয়। কেননা হতদরিদ্র এই মানুষগুলো তাঁকে আপ্যায়ন করতে চাইলে তিনি তাদের ব্যবহারের আন্তরিকতায় কখনো না করতে পারেন না। আর যেহেতু মাছ-মাংস কেনার সাধ্য তাদের নেই, আবার আমিষ ছাড়া ব্যাঞ্জন তাদের কাছে অতিথিসেবার পক্ষে যথেষ্ট মনে হয় না, তাই তারা খুব সঙ্কোচের সাথে জানতে চায় – ইঁদুরের মাংস খেতে ঘেন্না করবে না তো, ফাদার? যে তাকে ‘ফাদার’ সম্বোধন করছে, তার মনে তিনি দুঃখ দেন কী করে! অগত্যা… এবং এখানেও তাঁর কখনো অরুচি কাজ করে না, কেননা পরিবশনের আন্তরিকতাই তো চূড়ান্ত কথা! আম্মু তারপরও জানতে চাইলেন, খ্রীষ্টধর্মে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট উদারতা আছে জানি, তারপরও কি ইঁদুর-বাদুড় এসব খাওয়ার অনুমোদন আছে? তিনি বললেন, খ্রীষ্টধর্মে মানুষের মনে দুঃখ দিতে নিষেধ করা হয়েছে, ইসলাম ধর্মেও কিন্তু তাই। আমার একটা না শুনে কেউ যদি দুঃখ পান, আমি সেই না কখনো বলবো না।

ফাদার জন সম্পর্কে শেষ কিছু কথা বলে ইতি টানবো। আমাদের ধারণা ছিল, এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই খুব ধনী পরিবারের সন্তান, নয়তো দেশ-মহাদেশ ছেড়ে কোথাকার কোন অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে আছেন কীভাবে? অন্তত এদেশের মিশন থেকে তাঁকে নিশ্চয়ই অনেক টাকাপয়সা দেয়া হয়। … কৌতুহলের শেকলবন্দী হয়ে একদিন প্রশ্ন করেই ফেললাম – ফাদার, এখানে আপনার জীবিকার উৎস কী? মানে চলে কীভাবে? মিশন নিশ্চয়ই আপনার দেখভাল করে…? ফাদার খুব সঙ্কোচের সাথে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেন, ঈশ্বরের কৃপায় চলে যায় আরকি… ঈশ্বর চালিয়ে নেন! একবার যখন আঁগল ভেঙ্গেই গেছে, তখন পুরোটা না জেনে আর ছাড়ছি না – এমন মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন করেই চললাম, তিনি আমার প্রায় জেরা করায় কিছুই মনে করলেন না। একসময় নিজে থেকেই বললেন, তিনি যে বছরে একবার করে ইতালিতে যান, সেটা কেবলই তাঁর মা, পরিবার পরিজনকে দেখার জন্য নয়। তিনি আসলে যান জীবিকার সন্ধানে। এদেশের মিশন তাঁকে কিছুই দেয় না, শুধু হোস্টেলের আবাসিক শিক্ষক হবার সুবাদে থাকার একটা ঘর ছাড়া। উপরস্তু হোস্টেলের ব্যয়-বরাদ্দের একটা বড় অংশ তাঁকে বহন করতে হয়। তিনি মাস দু’য়েকের জন্য ইতালি গিয়ে তাঁর পরিচিত স্বচ্ছল বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে সহযোগিতা সংগ্রহ করেন, আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষে করেন। সেই টাকা দিয়ে এদেশে নিজে চলেন, আদিবাসীদের মধ্যে টিউবওয়েল, স্যানিটেশন, লাইব্রেরী ইত্যাদি নানা রকম উন্নয়ন প্রচেষ্টায় হাত লাগান, আবার হোস্টেলের ছেলেদের জন্যও ব্যয় করেন। খুব নাচার হয়ে বললেন, আমি কত টাকা আনতে পারছি, তার উপর নির্ভর করে, আমার ছেলেরা সপ্তাহে ক’দিন ভালো খাবার খাবে!

আজকাল মোবাইল কম্পানীগুলো অতি বিচিত্র উপায়ে দিন বদল, কাছে থাকা বা দূরে যাওয়া, ছোট্ট একটা কাজ, বন্ধুত্ব ইত্যাদি নানান গালভরা বুলি শেখাচ্ছে আমাদের। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, এই মানুষটির আত্মত্যাগ, দেবতুল্য দৃষ্টিভঙ্গি আর অক্লান্ত সংগ্রামী অথচ অতি সরল জীবনযাত্রার গল্প অন্তত একটা বিজ্ঞাপনের কাহিনী হিসেবে হলেও চিত্রায়ণ করি। কথাও বলেছিলাম অনেকের সাথে। সবাই কোনো না কোনোভাবে এড়িয়ে গেছেন, কেউ গা করেন নি। এমন না যে ফাদার জন খুব আশা নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন যে, আমরা তাঁর জন্য অনেক কিছু করবো, তাঁর সংগ্রামের স্বীকৃতি দেবো। তিনি জানেন, এটা তাঁর একার লড়াই, একাই তাঁকে লড়ে যেতে হবে। তথাপি আমার মনে হয়, যে দেশের, যে মানুষদের জন্য তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ জীবনের প্রায় পুরোটাই উৎসর্গ করে বসে আছেন, তাদের কাছ থেকে ন্যূনতম একটা স্বীকৃতি তাঁর সংগ্রামকে আরো অনেক বেশি বেগবান করতো, যাতে পক্ষান্তরে লাভবান হতাম কিন্তু আমরাই। এদেশের গণমাধ্যমে তাঁর সংগ্রামী জীবনের ছিটেফোটা উঠে আসলেও সেটা তাঁর নিজ দেশের বন্ধু-বান্ধবদেরও মুখ বন্ধ করে দিতো, যারা প্রায়শ তাঁকে পরামর্শ দেয়, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার সময় কিন্তু পেরিয়ে যাচ্ছে! আর তিনি হাসিমুখে প্রতিবাদ করেন – জঙ্গল কেটে ফেলে সভ্য হওয়া যায় না বন্ধু, কারণ জঙ্গলে যা আছে শহর-সভ্যতায় তার কিছুই নেই! জঙ্গলে মানুষ আছে, শহরে আছে কেবল সম্বোধন – মানুষ নেই!