ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

images

গান-বাজনা ব্যাপারটা ক্রমশ CSR (কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা) খাতে চলে যাচ্ছে!

আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এই দেশের হাতে গোনা সর্বোচ্চ দশ জন শিল্পীর বাইরে আর কেউ অ্যালবামের জন্য কোনো রয়ালটি পান না, অল্প ক’জন আছেন যাঁরা ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও’ থিওরিতে অ্যালবাম তুলে দেন প্রকাশকের হাতে, বাকিরা উল্টো প্রকাশককেই টাকা দেন অ্যালবাম প্রকাশের খরচ-বাবদ। এমনকি কোনো শিল্পীর প্রথম একটা বা দুটো অ্যালবামের কাটতি থাকার পরও পরবর্তী অ্যালবামের একটা বেশ বড় পরিমাণ তাঁর নিজেকেই বিক্রির ব্যবস্থা করে দিতে হয়, প্রকারান্তরে কিনে নিতে হয়!

এদেশের শিল্পীরা বেঁচে আছেন বিকল্প মাধ্যমের উপর ভরসা করে। স্টেজ শো, টিভি শো, সিনেমার গান, মোবাইলের কন্টেন্ট হিসেবে বিক্রি আর বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল করেই শিল্পীদের জীবিকা চলছে। এই চারটি মাধ্যমের কোনোটিতে সৃজনশীল গানের জন্ম হবার কথা নয়, হচ্ছেও না। শিল্পী চাইলেই তাঁর নিজের পছন্দে একটি গান করতে পারছেন না, গাইতে হচ্ছে বাজার মাথায় রেখে, যে বাজার ‘বাজারি জিনিস’-এরই পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। এদেশের শিল্পীরা এখনো গান করেন কেন, কে জানে!

ক’দিন আগে এক বিখ্যাত ও জনপ্রিয় লেখকের স্বাক্ষাতকারে পড়েছিলাম, বাংলাদেশের আঙুল গুণে পাঁচ জন লেখকের বাইরে আর কেউ কোনো রয়ালটি পান না। তাঁদের নিজেদের বই নিজেদেরই বিক্রি করতে হয় বা সৌজন্য সংখ্যার সিল মেরে বিলি করতে হয়, অথবা সারা বছরের সাংসারিক বাজেট কাটছাঁট করে জমানো টাকাটা মানসিক প্রশান্তি খাতে ব্যয় করতে হয়। লেখক হিসেবে বই প্রকাশনা থেকে ওই পাঁচ জন ছাড়া আর কারুর কোনো আয় রোজগার নেই। কেউ যদি তাঁর এই লেখক পরিচয়টিকে ‘ব্যবহার’ করে নাটক লিখে, টক শো করে বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি-বিশেষ অতিথি হয়ে কিছু বাড়তি কামাই করে থাকেন, সেটা অন্য কথা।

এর ফলাফল-স্বরূপ, এদেশে ওই পাঁচ জন লেখক ছাড়া আর কোনো লেখক যেমন প্রতিষ্ঠা পান নি, তেমনি এই যুগের তরুণ’রাও জীবনের লক্ষ্য হিসেবে লেখক হবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। এবং আমি খুব কষ্ট করে অনেক তরুণের লেখা পড়ে দেখেছি, তাদের বেশিরভাগের লেখালেখির সাধারণ অভ্যাসটিও গড়ে ওঠেনি, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত লেখাগুলি বানান ভুল, ব্যাকরণগত ভুল, শব্দগত ভুল, বিকৃত শব্দ ব্যবহার, উপমার অপরিমিত ও অযথাযথ ব্যবহার ইত্যাদি দোষে এতটাই দুষ্ট যে, অনেক ক্ষেত্রেই লেখার বিষয়বস্তু অনেক চিত্তাকর্ষক হওয়া সত্ত্বেও, পাঠক হিসেবে আমি সে লেখার গভীরে প্রবেশ করতে পারিনি। আর এ থেকেই আশঙ্কা জাগে মনে – এই পাঁচ জন বিদায় নিলে (একজন ইতোমধ্যেই বিদায় নিয়েছেন) এদেশের প্রকাশনা শিল্প কি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে?

সৃজনশীলতা, মননশীলতা ও মেধা বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর দুটো মাধ্যম হলো সাহিত্য ও সঙ্গীত। আমাদের দেশে এই দুটোরই ভবিষ্যত অন্ধকার। এবং তা নিয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথা নেই! বইয়ের ক্ষেত্রে তবু বাংলা একাডেমী কিছু বই প্রকাশ করে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ঢাকা বই মেলা ইত্যাদি কিছু না কিছু উদ্যোগ এখনো রয়েছে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে, গানের জন্য কোনো উদ্যোগই নেই! বিগত দুটো ঈদে যে সংখ্যক এলবাম প্রকাশ হয়েছে, তাকে গোনার মধ্যে ধরা যায় না, এবার পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে (এই উপলক্ষটি সাম্প্রতিক সময়ে অডিও এলবাম প্রকাশনার একটা উল্লেখযোগ্য মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল) একটিও এলবাম প্রকাশ হবে কিনা সন্দেহ! সামনে আসছে বাংলা নববর্ষ, অডিও প্রকাশ হবে না। তার ক’দিন পরই ঈদুল ফিতর, এলবাম প্রকাশের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ, অথচ এখনো কোনো শিল্পীই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারছেন না, তিনি ঈদ-এলবামের পরিকল্পনা করছেন! আমি অনেক শিল্পীর ব্যক্তিগত তথ্য জানি, তাঁরা ২০-৩০ কি ৫০টা পর্যন্ত গান করে বসে আছেন, এলবাম প্রকাশের সাহস পাচ্ছেন না। এই তালিকায় এমনকি আইয়্যুব বাচ্চু পর্যন্ত আছেন! বাকিদের কথা সহজেই অনুমেয়…

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অনেক পাটচাষী আছেন, যাঁরা সারা বছর জমিতে পাটচাষ করেন এবং বীজ-সার-কীটনাশক-সেচ ইত্যাদির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পাটের বাজার হ্রাসের কারণে মৌসুম শেষে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে সেই পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। তারপরও পরবর্তী মৌসুমে তাঁরা আবার পাটচাষেই ফিরে যেতে বাধ্য হন, কেননা তাঁদের জমিতে পাট ছাড়া অন্য ফসল ফলে না, কিংবা তাঁরা অন্য কোনো ফসল চাষ করতেও জানেন না। … আমাদের অডিও শিল্পও যে ক্রমশ এই ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং’য়ের শিকার হচ্ছে – সেটা কি কেউ খেয়াল করে দেখেছেন?