ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

পৃথিবীতে মানুষের যত রকমের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ঋণ থাকতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঋণ হলো মাতৃঋণ। অথচ এই ঋণটি শোধ করা সবচেয়ে সহজ হবার কথা। মা হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সন্তানের জন্মই দেন তার সবকিছুতে মুগ্ধ হবার জন্য। তাই মন থেকে, হৃদয়ের গভীর থেকে মাতৃঋণ স্বীকার করা মানেই তা শোধ হয়ে যাওয়া। কিন্তু সেই ঋণ স্বীকার না করে মা’র জন্য যত কিছুই করা হোক, ঋণের বোঝা তাতে তিল পরিমাণ কমে না, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে।

দেশমাতার ঋণও মাতৃঋণেরই মতো। সেই ঋণ শোধ করা যত কঠিন, ততটাই সহজ। গুরুতর প্রশ্ন শুধু এটাই যে, সেই ঋণটা আমরা স্বীকার করি কিনা? অনুভব করি কি করি না?

বিশ্বের অনেক দেশে দেশমাতার ঋণ শোধ করার জন্য রাষ্ট্র বাধ্যতামূলকভাবে কিছু বিধান, নিয়মকানুন নির্দিষ্ট করে রাখে। দেশমাতার সন্তান প্রতিটি নাগরিককে ক্যাটেগরি অনুযায়ী সেই নিয়মের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যেতে তারা বাধ্য হয়। মানুষের মতো একটি স্বাধীনচেতা প্রাণীকে নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে রাখা খুব শক্ত। মানুষের মতো করে আর কোনো প্রাণী এক জীবনে এত বেশি নিয়ম ভেঙ্গে থাকে বলে মনে হয় না। তারপরও রাষ্ট্রের বেঁধে দেয়া নিয়ম অধিকাংশ নাগরিক মেনেই নেয়, যখন কিনা সেটা ‘দেশের ডাক’ বলে বিবেচিত হয়। সিঙ্গাপুরের তরুণ নাগরিকদের ছাত্রজীবনের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে বাধ্যতামূলক রাষ্ট্র-নির্ধারিত চাকরিতে যোগদান করতে হয়। সেই চাকরির বেশিরভাগই মাঠে-ময়দানের কাজ। ফায়ার ফাইটিং, ট্রাফিক কন্ট্রোল, সৈনিক, সামাজিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, নির্মাণ শ্রমিক ইত্যাদি পেশায় ছ’মাস থেকে এক বছর মেয়াদে কাজ করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই প্রতিটি ছাত্রের ভেতরে ছোট-বড় সব রকমের কাজের প্রতি শ্রদ্ধার ব্যাপারটা তৈরি হয়ে যায়। … মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শুনেছি এরকম বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদানের এটা অপশন রয়েছে।

আমাদের দেশে এ ধরণের কোনো রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার বালাই নেই। আমাদের জন্য রাষ্ট্র একটা কাজই ঠিক করে দিয়েছে – নির্বাচনে ভোট দেয়া। জ্যান্ত লোকের পেটে ছোরা ভরে দিতে যে মুন্না ভাইয়ের হাত কাঁপে না, মেডিকেল কলেজের এনাটমি ক্লাসে মৃত লাশের বুক চিরে দেখাতে বলায় সেই মুন্না ভাই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়। আমাদের দেশের ভোটারদের হয়েছে তাই। আমরা কথায় কথায় রাস্তা আঁটকে, গাড়ি ভেঙ্গে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, বোমা মেরে সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিতে পারি; মহাপরাক্রমশালী জিন্নাহ-আইয়ূব-ইয়াহিয়া থেকে হালের এরশাদ-খালেদা-হাসিনাদের কাউকে ছেড়ে কথা বলি না, কিন্তু ভোটের সময় সেই খালেদা-হাসিনা-এরশাদরাই যে যেভাবে ব্যালট ধরিয়ে দেন, তাতেই বিনা বাক্যব্যয়ে ‘সিল মেরে’ পরম্পরা অব্যহত রাখি। তাই ভোটগ্রহণ অবাধ ও নিরপেক্ষ হোক কিংবা না হোক, সংসদে কিন্তু সাকা-নিজামী-মুজাহিদ’রা ঠিকই ঢুকে যায়। কারণ ভোটের দিনে ব্যালটে সিল মারাতেই যে আমাদের রাজনৈতিক ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং সেই ব্যালটে কার নাম ছাপা হবে – সেটা নির্ধারণ করে দেয়াতেও যে আমাদের যথেষ্ট ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে – এটা আমরা মনে হয় নিজেরাও ঠিকঠাক জানি না।

সে যাই হোক, দেশমাতৃকার ঋণ শোধের এই ঐচ্ছিক ও মৌসুমী দায়িত্বের কথা আমার আলোচ্য বিষয় নয়। আমি মনে করি, আমাদের বরং সময় এসেছে আবশ্যিকভাবে কিছু দায়িত্ব রাষ্ট্র কর্তৃক দেশের তরুণ নাগরিকদের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া। বিশেষ করে পরিষেবা ও জনসেবামূলক খাতগুলিতে আবশ্যিকভাবে ছাত্র-যুবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করাটাই বরং আমাদের মতো স্বল্প আয়ের দেশের জন্য এক ধরণের বিলাসিতা।

জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে সবচেয়ে আগে যে প্রশ্নটি আমাদের সামনে চলে আসে, তা হলো দক্ষ জনবলের অভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে কিংবা অনভিজ্ঞ উৎসুক অংশগ্রহণকারীদের দ্বারা উদ্ধারকাজ ত্বরাণ্বিত হবার চেয়ে বরং বিঘ্নিত হচ্ছে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় যাঁরা উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই অনভিজ্ঞ, সাধারণ অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবক। এঁরা জান-প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজে না লাগলে অনেক আহতকেই হয়ত সময়মতো বের করা যেত না, তাঁরা বের হতেন হতভাগ্য লাশ হয়ে। সেজন্য তাঁরা অবশ্যই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা পাবেন। তাঁদের অবদানকে এতটুকুও খাটো না করে বলছি, তাঁরাও যদি নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের মতো যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে উদ্ধারকাজে নামতেন, তাহলে হয়ত এই উদ্ধার তৎপরতা একুশ দিন ধরে চালাতে হতো না, হতভাগ্য দেড় হাজার নিহতের মধ্যে অনেকেই হয়ত অন্তত প্রাণটুকু হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারতেন। উদ্ধারকারীরা নিজেরাও আহত হয়েছেন অনেকেই, অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনকি মারাও গেছেন একাধিক ব্যক্তি। এই ক্ষয়ক্ষতিগুলো হয়তো এড়ানো যেতো, যদি তাঁদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ থাকতো। … তথাপি, রানা প্লাজার ভবন ধসে সাধারণ জনগণকে যতটা সুশৃঙ্খলভাবে পাশে পাওয়া গেছে, ইতোপূর্বে সিডর-আইলা ইত্যাদির সময় কিন্তু এতটাও চোখে পড়েনি।

বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রয়েছে দেশে, যেমন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বা সিআরপি, সন্ধানী… এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি অলাভজনক হওয়ায় এবং ট্রাস্টিবোর্ড দ্বারা সীমিত অর্থে পরিচালিত হওয়ায় ইচ্ছে থাকলেও জনবল বৃদ্ধি করতে পারে না, ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তরিক সাহায্যের হাত একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা দুস্থ সেবাপ্রত্যাশীর কাছ-পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না। অথচ বিশ্বব্যাপী এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছাসেবীদের স্বেচ্ছাশ্রমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। কোলকাতায় মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠা করা কুষ্ঠরোগীদের পুনর্বাসনে পরিচালিত আশ্রমে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে কোলকাতা তথা ভারত তো বটেই, সারা বিশ্ব থেকে ‘নানা বয়সী তরুণ’রা যোগদান করছেন। এমনকি সৌরভ গাঙ্গুলী, স্টিভ ওয়াহ’র মতো সেলিব্রেটি’রাও অকুণ্ঠচিত্তে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন। আমাদের দেশের রেড ক্রিসেন্ট কিংবা সিআরপি’র পাশে তাহলে আমরা নেই কেন?

দেশপ্রেম শুধুই একটা চেতনা নয়, একটা বায়বীয় বিষয় নয়। এটা একটা অনুশীলনের বিষয়। একটা হাতেকলমে চর্চা, একটা নৈমিত্তিক অভ্যাস, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা পরম্পরার ব্যাপার। আমাদের সীমান্তের স্থলবন্দরগুলিতে যে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকগুলি প্রবেশ করে, সেগুলিকে পণ্য খালাসের জন্য দেড় থেকে দুই, কখনো বা তিন দিন পর্যন্ত এপারে থেকে যেতে হয়। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ট্রাকের সাথে আসা ড্রাইভার-হেলপারসহ অন্য ভারতীয় লোকেরা এপারে একটা ম্যাচবাক্স পর্যন্ত কেনে না, পাছে তাদের দেশের মূদ্রা আমাদের এখানে হিসাব-বহির্ভূতভাবে খরচ হয়ে যায়! অথচ আমাদের এপার থেকে যে ট্রাকগুলিই ওপারে যায়, তারা আসার সময় ওপারের বাজার থেকে বিরাট বোঁচকা বেঁধে সদাইপাতি কিনে আনে, বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশীয় মূদ্রায়। … অপ্রিয় হলেও সত্য, এই দেশপ্রেম আমাদের মধ্যে নেই। আমরা ছোট থেকেই চোখের সামনে এমন কোনো নজির সাধারণত দেখিনা, তাই দেখে শেখার ব্যাপারটি অনুপস্থিত। থাকলো বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যাপারটি। আমাদের অগোছালো শিক্ষাব্যবস্থা ও তার দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাক্রমটি প্রণয়নের সময় এই বিষয়গুলি প্রণেতারা খুব একটা মাথায় রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। ফলে, আমরা আসলে এভাবে ভাবতেই শিখিনি ছোটবেলা থেকে। অথচ ভাবনাচিন্তা তো বটেই, এটা এমনকি নিয়মিত চর্চার ব্যাপার।

সেই চর্চাটা আমাদের আরো বেশি করে বাড়িয়ে তোলা প্রয়োজন। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন থেকেই চর্চাটা শুরু করা না গেলে আগামী প্রজন্ম হয়ত নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে দ্বিধা করবে না। তখন মাতৃঋণ শোধ করা তো দূরের বিষয়, স্বীকার করাটাই অবাস্তব বলে মনে হবে নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে।

সে কারণেই আমার প্রস্তাব, অবিলম্বে আমাদের দেশের তরুণদের জন্য ছাত্রজীবনের কোনো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে কোনো না কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে মাঠ পর্যায়ে বেতনভূক্ত কর্মচারী হিসেবে স্বল্পমেয়াদে চাকরি করার বিধান করতে হবে। সেই চাকরিটি বেতনের বিপরীতে হলে সুবিধাপ্রাপ্ত কিংবা সুবিধাবঞ্চিত – কোনো তরুণেরই তাতে আপত্তি করার অবকাশ থাকবে না, অভিভাবকেরাও ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর নামে এর বিরোধিতা করার অবকাশ পাবেন না। এই চাকরিগুলো হতে পারে – সরকারের সেবামূলক যেকোনো খাতের নিম্নপদে। যেমন:

  • সেনা/ নৌ/ বিমানবাহিনীর সৈনিক
  • ট্রাফিক পুলিশ সদস্য
  • অন্যান্য আধা-সামরিক বাহিনী সদস্য
  • ফায়ার ফাইটার
  • হাসপাতালের চিকিৎসা সহকারী
  • রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবী
  • আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম-এর স্বেচ্ছাসেবী
  • সিআরপি’র স্বেচ্ছাসেবী
  • ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন ইত্যাদি বিভাগের শিক্ষানবিশ সহকারী ইত্যাদি

এই চাকরিগুলোর শর্তাবলী ও আচরণবিধি এমনতর হবে যে, এই কাঠামোর মধ্যে থেকে তরুণ/ শিক্ষানবিশ স্বেচ্ছাসেবীরা কোনোপ্রকার দুর্নীতিতে জড়ানোর সুযোগ তো পাবেই না, উল্টো তাদের প্রত্যক্ষ নজরদারীর কারণে সহকর্মী নিয়মিত কর্মচারী-কর্মকর্তাটিও দুর্নীতির সুযোগ পাবে না। যেমন, শহরের প্রতিটি ট্রাফিক পোস্টে যদি নিয়মিত ট্রাফিক সদস্যদের পাশাপাশি একজন করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষানবিশ ট্রাফিক সদস্যের নিয়োগ দেয়া হয় এবং বিধান রাখা হয় যে, উক্ত শিক্ষানবিশ ট্রাফিক সদস্য তার কর্ম-অভিজ্ঞতা কোনো তৃতীয় পক্ষের নিকট (কোনো মতেই তা পুলিশ বা ট্রাফিক দপ্তরে নয়) মূল্যায়নের জন্য জমা দেবে, যার ফলাফল তার শিক্ষাজীবনের নম্বরপত্রে ভূমিকা রাখবে – তখন সেই শিক্ষানবিশ ট্রাফিক সদস্যের মূল্যায়ন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে বাধ্য। এবং সার্বক্ষণিক একজন ‘ওয়াচম্যান’ সঙ্গে থাকার কারণে নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মমতো আচরণ করতে বাধ্য থাকবেন।

এর বাইরেও আরো অনেক অনেক সুবিধা রয়েছে এই ব্যবস্থার, যা এক এক করে লিখতে গেলে এই রচনাটি সময় নিয়ে পড়ার ধৈর্য প্রায় কারুরই আর হবে না, অবশ্য আমার ধারণা এমনিতেই যথেষ্ট বিরক্তিকর মাত্রায় দীর্ঘ ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে লেখাটি। তাই এখানেই ইতি টানছি আর আশা করছি, পাঠকের আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা ফুটে উঠবে, যদি আদৌ তা নাও থেকে থাকে – সেটিও স্পষ্ট হবে।