ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

Bangla-movie-3

হোক, একটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক। প্রয়োজনে অসম প্রতিযোগিতাই হোক। এই বেসুরো কেত্তন আর কত?

চলচ্চিত্রের সাথে প্রধানত দুটো ব্যবসা সরাসরি জড়িত, ১. চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্প, ২. চলচ্চিত্র প্রদর্শন শিল্প।

আমরা নির্মাণ শিল্পকে বাঁচানোর জন্য অনেক রকম ব্যবস্থাই নিয়ে থাকি। সরকার বিএফডিসি নামে একটা বিশাল কর্পোরেশন খুলে রেখেছেন সেই স্বাধীনতার আগে থেকেই, সেখানে নির্মাণ কারখানা পর্যন্ত আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এমনকি একজন নতুন প্রযোজক/পরিচালকও মোট কারিগরি ব্যয়ের মাত্র ২৫% জমা রেখে পুরো ছবি বানিয়ে নিতে পারেন, ছবি সেন্সরে পর্যন্ত জমা করে দিতে পারেন, বাকি ৭৫% ছবি রিপ্রিন্টের সময় দিলেই চলে। বিশ্ববাজারের সাথে তুলনা করলে আমাদের চলচ্চিত্রের কারিগরি ব্যয় নামমাত্র। এত সস্তায়, এত সুবিধায় ছবি বানানোর সুযোগ ক’টা দেশে পাওয়া যায়? তার উপর সরকার প্রতি বছর ছবি বানানোর জন্য অনুদান পর্যন্ত দিয়ে থাকে নিয়ম করে। তারপরও সিনেমা হলে দু-চার সপ্তাহ চলার মতো ছবি বানানো যাবে না কেন? দেশে কি ফিল্ম বানানোর মতো মেধাবী লোকজন একেবারেই নেই?

অপরদিকে প্রদর্শন শিল্প বাঁচানো তো দূরে থাক, একে মেরে ফেলার সবরকম কলকাঠি আমরা ক্রমশ নেড়েই চলেছি। একটা সিনেমা হল যে পরিমাণ জায়গা, তাও শহরের কেন্দ্রস্থলে “অকুপাই” করে রাখে, তা যেকোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য চক্ষূশূল! শহরের মাঝখানে হীরার দামে বিকোবে যে জায়গা, সেখানে দোকান না, বাজার না, মার্কেট না, ফ্ল্যাট না, এপার্টমেন্ট না, কারখানা না… বসে থাকবে এক সিনেমা হল! অর্থাৎ এত বড় একটা জমি থেকে লাভবান হবে একজন মাত্র ব্যবসায়ী বা একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান! – এটা মেনে নেয়া আমাদের দেশের বাস্তবতায় খুব কঠিন ব্যাপার। অতএব, ফিল্মের বারোটা বাজাতে হবে। মানে আসলে ফিল্ম দেখানোর বারোটা বাজাতে হবে। ভালো সিনেমা তৈরি হলে হল থাকবে ভরপুর, লাভবান হবে একটিমাত্র গোষ্ঠী। ফলে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা, উদ্ভট কাহিনী, অসম্ভব রকমের ভাড়ামীপূর্ণ অভিনয়… সবরকমের নেতিবাচকতা ঢুকিয়ে সিনেমার বারোটা বাজাতে হবে। হয়েছেও তাই। এরই ফাঁকে ইমপ্রেস, ছবিয়াল জাতীয় কিছু ধান্দাবাজ “গৃহপালিত সিনেমা” বানিয়ে পুরস্কার-টুরস্কার হাতিয়ে নিয়ে মিডিয়া-মাফিয়া হয়ে বসে আছে, যাদের কোনো ছবি পুরো সপ্তাহ কোনো জেলাশহরের সিনেমা হলে পর্যন্ত চলে না! তারা প্রত্যেক ঘরে ঘরে সিনেমা রিলিজ দিয়ে জোর গলায় চিৎকার করছেন, আমরাই সিনেমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, সিনেমা ঘরে বসে দেখার মাধ্যম নয়, সিনেমার সাফল্যের সূচক হচ্ছে “বক্স অফিস” (টিকিট ঘর), টিআরপি নয়।

ফলে একে একে সিনেমাহলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বিশাল দালান ভেঙ্গে মার্কেট হচ্ছে, সেই মার্কেটে সিনেপ্লেক্স হচ্ছে যা বসার ঘরের একটু বৃহৎ সংস্করণ আরকি। সেই সিনেপ্লেক্সে আবার বিদেশী সিনেমাই মুক্তি পাচ্ছে, তাতে কারুর মাথাব্যথা নেই! স্পাইডার ম্যান, স্পিড, মিশন ইম্পসিবল প্রদর্শিত হলে কারো কিছু যায় আসে না, হিন্দি সিনেমা মুক্তি পেলেই যত আপত্তি?!

আমি স্বীকার করি, হিন্দি সিনেমা মুক্তি পেলে আমাদের সিনেমা অনেক বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়বে, অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। কিন্তু সেটা সাময়িক। সংগ্রাম না করে কিছুই অর্জন করা যায় না। আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্প আদৌ যে বেঁচে আছে – তাও কিন্তু না। এদেশে সারা বছর ক’টা ছবি মুক্তি পায়? কজন নায়ক আছেন, ক’জন নায়িকা আছেন? সব ধরণের চরিত্রে অভিনয় করতে সক্ষম ক’জন অভিনেতা অভিনেত্রী আছেন? কজন নির্মাতা আছেন? কতজন নিবেদিতপ্রাণ প্রযোজক আছেন? ক্যামেরাম্যান অনেকই আছেন হয়তো, ডিওপি ক’জন আছেন? লাইড ডিরেক্টর…? আজ পর্যন্ত কোনো একটা সিনেমার সঠিক মানসম্পন্ন প্রি-প্রোডাকশন মার্কেটিং, মিডিয়া প্ল্যান, প্রোমোশনাল প্ল্যান কি কেউ করেছেন বা করতে পেরেছেন? কজন তরুণ চিন্তা করেন, পড়াশোনা শেষ করে এফডিসিকে কর্মস্থল বানাবো, মূলধারার ফিল্মের নির্মাতা, অভিনেতা, ডিওপি, এডিটর, স্পেশাল ইফেক্ট-মেকার ইত্যাদি হবো? … যেকোনো ব্যবসাকে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে গেলে, সেই ব্যবসায় গতিশীলতা থাকতে হয়, সেই ব্যবসাকে যেন সবাই হটকেক হিসেবে নিতে পারে, সেই ব্যবসায় ঢোকার জন্য একটা সংগ্রাম যেন থাকে নবীন/প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। আমাদের চলচ্চিত্র ব্যবসায় হাতি দিয়ে টেনে এনে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলেও ব্যবসায়ীদের ধরে রাখা যায় না। বহু ছবি’র নতুন প্রযোজক মাঝপথে টাকাপয়সা গচ্চা দিয়ে মৌজ-মাস্তি করে কেটে পড়েছে, এমন নজির ভুরি ভুরি। সরকার ঘোষণা করলেই চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে যাবে – ব্যাপারটা আসলেই এত সরল-সোজা নয়। একটু খোঁজ নিলেই জানবেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প রেভিনিউএর বিচারে এমনকি মূদ্রণ-শিল্পেরও নিচে অবস্থান করে! কী হাস্যকর!!

বরং আমাদের মনযোগ দেয়া উচিত প্রদর্শন-শিল্পকে বাঁচানোর দিকে। এদেশের প্রতিটি সিনেমা হল সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন হাউজফুল থাকুক, দর্শকের মাসিক বিনোদন পরিকল্পনায় অন্তত ২দিন সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখার বাজেট বরাদ্দ হোক, দেশে সিনেমার ভালো দিন আসতে বাধ্য। আর যখন দর্শক হলে যাচ্ছে, ছবি দেখছে, দেখার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, ছবি দেখাটা কৌতুহল থেকে বিনোদন, তা থেকে ক্রমশ নেশায় পরিণত হচ্ছে, তা দেখে প্রযোজক নিশ্চিত হবেন যে, বৃহত্তর দর্শকের চাহিদা মাথায় রেখে সিনেমা বানালে এই মাধ্যম থেকে দশ গুণ মুনাফা তুলে আনা সম্ভব – তখন প্রযোজক টাকা লগ্নি করতে বাধ্য। ছোট দেশ, ছোট বাজার এসব কোনো কথা নয়। পঞ্চাশ-ষাট থেকে একশ’ কোটির ছবি বানানোর প্রযোজক/সিন্ডিকেট বাংলাদেশে আছে। অবশ্যই আছে। আর কোন্ ব্যবসায় কোনোরকম অবকাঠামো (কারখানা, জনবল ইত্যাদি) নির্মাণ না করেও পঞ্চাশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একশ কোটি টাকা মূনাফা করা যায়? তাও মাত্র এক বছরে বা তারচেয়েও কম সময়ে!

সেই ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগটা দিন। ফাঁকা মাঠে শাকিব-অনন্ত’র গোল তো অনেক দেখলাম, সেই গোলে কিন্তু কেউ জেতে না, গোলমালই বাড়ে শুধু।