ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ফেসবুকে আমার এক বন্ধু প্রশ্ন করেছেন:
“বাংলাদেশ ফুটবল টিমের ভাল কোচিং স্টাফ নেই কারন বাফুফের টাকা নেই। বাফুফের টাকা নেই কারন ভাল স্পন্সর নেই। ভাল স্পন্সর নেই কারন খেলার সময় মাঠ ফাকা থাকে। খেলার সময় মাঠ ফাকা থাকে কারন দর্শক খেলা দেখতে যায় না। দর্শক খেলা দেখতে যায় না কারন প্লেয়াররা ভাল খেলে না। প্লেয়াররা ভাল খেলতে পারে না কারন তাদের ভাল কোচিং স্টাফ নেই। …এই দুষ্টচক্র কে ভাঙ্গবে?”

তাঁর প্রশ্নটা আমাকে সত্যিই ভাবালো। এ তো সত্যিই দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মতোই এক দুষ্টচক্র, এ শেকল ভাঙ্গার উপায় কী? কার এগিয়ে আসা প্রয়োজন সবার আগে? ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, সবার আগে দর্শককেই এগিয়ে আসতে হবে। “খেলা পছন্দ না হলে প্রয়োজনে গালি দেবো, তবু মাঠে যাবো। মাঠের খেলা মাঠেই দেখবো”– এই মানসিকতা না থাকলে হবে না। আমি অনেকবার টিভিতে পশ্চিমবঙ্গের লীগ-ম্যাচগুলো দেখেছি, তাদের দুই সেরা দল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ দেখে আমাদের লীগম্যাচের চেয়ে খুব ভালো কিছু মনে হয়নি। তারপরও কিন্তু সেসব ম্যাচে দর্শকভর্তি থাকে গ্যালারিগুলো। তারা হৈচৈ করে, চিৎকার করে, নিজ দলকে সাপোর্ট দেয়, প্রতিপক্ষর দর্শকদের তাড়া করে… এভাবে গড়পড়তা একটা ম্যাচকে তারা রীতিমতো জমিয়ে দেয়। আমরা মাঠে যাইনা বলে আমাদের ম্যাচ জমে না, খেলোয়াড়রাও মন লাগিয়ে জান লড়িয়ে খেলার মতো উৎসাহ পান না। অতএব, আমাদেরই যেতে হবে সবার আগে।

না হয় খেলার টানে নয়, নিছক অবসর কাটানোর জন্যই গেলাম, সেটাও তো মন্দের ভালো। ছুটির দিনে ঢাকাবাসীর কোথাও যাওয়ার জায়গার যে কত অভাব, সেটা শুক্রবারগুলোতে হাতিরঝিল, শিশু পার্ক, শাহবাগ-টিএসসি,চন্দ্রিমা উদ্যান, রবীন্দ্র সরোবর বা শিশুমেলায় গেলেই বোঝা যায়। তো, যদি বন্ধুবান্ধবসহ সুলভ টিকেটে স্টেডিয়ামে গিয়ে বিকেলটা কাটানোর সুযোগ পাওয়া যায়, আমরা কেন যাবো না? কেন যাই না!প্রথম প্রথম ম্যাচ না জমলে নিজেরা নিজেরা আড্ডাবাজি করে চলে আসবো, তারপর গ্যালারিভরা দর্শক দেখে যখন খেলোয়াড়দের টিম-স্পিরিট বেড়ে যাবে, খেলায় অটোমেটিক্যালি প্রাণ আসবে, তখন আমরা এই দর্শকেরাই ম্যাচের উত্তেজনায় বাদামের খোসা ছাড়াতে ভুলে যাবো। ফুটবল তো বাংলা সিনেমা না যে, এতে অশ্লীলতা ঢুকে গেছে বলে বউ-বাচ্চা নিয়ে দেখা যাবে না!প্রয়োজনে লীগের বড় ম্যাচগুলো সব ছুটির দিনে আয়োজন করা যেতে পারে, যেমনটাইংল্যান্ডে “সানডে লীগ”(ক্রিকেট) হয়। তারপর দর্শক একবার খেলার নেশায় পেয়ে বসলে তখন নাহয় সন্ধ্যেবেলা ফ্লাডলাইটে খেলা হবে – প্রতিদিন! মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টন, কমলাপুর থেকে অফিস-ফেরতা দর্শকেরা টিকেট কেটে দলে দলে ঢুকে পড়বেন স্টেডিয়ামে। … এটা কি খুবই অলীক স্বপ্ন?

বাফুফেরও অনেক দায়িত্ব আছে। আমাদের ক্লাব ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে তাদের মার্কেটিং পরিকল্পনা কিছু আছে বলে মনে হয়না। কবে কোথায় কোন্ ম্যাচ – কেউ কি তা জানেন? অথচ লা-লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খবর আমরা সবাই জানি, ফিক্সচার মুখস্ত! আগে যে আবাহনী মোহামেডানের সমর্থক গোষ্ঠী ম্যাচের দিন ঢোল-বাঁশি-কাঁশি এমনকি ইঁট-সুরকি-লাঠি নিয়ে হাজারে-বিজারে মাঠে আসতো, তারা এখন আসে না কেন? এমন কি করা যায় না, গেটমানির ২৫-২৫ করে ৫০% দুই দলকে দিয়ে দেয়া হলো, তখন নিজেদের লাভের অঙ্ক কষে ক্লাবগুলোই হাজার হাজার দর্শক ধরে আনার ব্যবস্থা করবে। তারাই ম্যাচের আগে প্রচারের ব্যবস্থা করবে।

আমাদের ফুটবল যেহেতু এখন একেবারে রুগ্ন শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে, তাই একে বাঁচাতে সরকারিভাবে কিছু ‘ইনটেনসিভ কেয়ার’ দিতে হবে। যেমন, লা-লিগা বা সিরি-আ কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রতিটি ম্যাচের এক্সক্লুসিভ ও অ্যাট্রাক্টিভ ম্যাচ-প্রোমোশনালস প্রচার হয় স্পোর্টস চ্যানেলগুলোতে। আমাদের দেশে যেহেতু আলাদা স্পোর্টস চ্যানেল নেই, বিটিভিসহ প্রায় সব চ্যানেলে এরকম কিছু এট্রাক্টিভ প্রোমো, বিনা মাশুলে বা নামমাত্র মাশুলে প্রচারের জন্য প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় থেকে দিক-নির্দেশনা ‘চাপিয়ে দিতে’ হবে, যাতে তারা প্রচার করতে বাধ্য হয়। হোক না, ফুটবলের স্বার্থে একটু চাপ সৃষ্টি হোক সবার উপর। তারপর একবার লিগ জমে গেলে এই ফুটবলই কত কত গুণ উজাড় করে ফেরত দেবে, তার কি কোনো হিসেব আছে?

ফেসবুক টুইটারের এমন রমরমা যুগে ঢাকা লীগসহ ঘরোয়া কোনো আসরের খেলার বিষয়ে কোনো আপডেট দেখা যায় না। বাফুফে, ডামফা, বাংলাদেশ লীগ কমিটি, আবাহনী, মহামেডান, শেখ জামাল, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স … এদের প্রায় সবারই ফেসবুক পেজ আছে, অথচ খোঁজ নিয়ে দেখলাম প্রায় কোনোটারই বিশেষ কোনো আপডেট নেই। আবাহনী মোহামেডান সেই কোন আমলে ফেডারেশন কাপ আর সুপার কাপ জিতেছিল, তারই ছবি দিয়ে পাতা ভরিয়ে রেখেছে, মাঝের তিন-চার বছর কোনো অ্যাক্টিভিটি নেই! এজন্যই তাদের ফ্যানপেজের জনপ্রিয়তাও নেই। আবাহনী-মোহামেডানের পেজে লাইকের সংখ্যা হাজারের নিচে, শেখ জামাল কোনোরকমে হাজার পনেরো বা তার কিছু বেশি, খোদ বাফুফে’র লাইকের সংখ্যা বিশ হাজারের নিচে!সম্ভবত পেজগুলোর কোনো ডেডিকেটেড অ্যাডমিনও নেই। অথচ এক মুশফিকের ফ্যানপেজেই লাইক পার হয়ে গেছে ত্রিশ লাখ!

ফুটবল নিয়ে চর্চা করতে হবে। মাঠে যেমন, মাঠের বাইরেও সমান তালে। তবেই না ফুটবল-উন্মাদনা সৃষ্টি হবে দেশে। তবেই না দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা বালক-কিশোরেরা সাকিব তামিম মাশরাফির পাশাপাশি মামুনুল এমিলি জামাল ভূঁইয়া হওয়ারও স্বপ্ন দেখবে!

এই আকালের যুগে যতজন দর্শক তবু সিনেমাহলে যান, স্টেডিয়ামে যাননা তার সিকিভাগও। কেন রে ভাই? একটা ফুটবল ম্যাচ কি বস্তাপচা অবাস্তব জগাখিঁচুড়ি-মার্কা সিনেমার চেয়েও দেখার অযোগ্য? … আমি আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম একবার গুলিস্তানে গিয়ে, এটা জেনে যে, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আবাহনী-মুক্তিযোদ্ধার ম্যাচের প্রবেশমূল্য নাকি পাঁচ টাকা! মাত্র পাঁচ টাকা!! আমি টিকেট কেটে গ্যালারিতে গিয়ে দেখি ওই গ্যালারিতে জনা পঞ্চাশেক দর্শক আছে (কারণ ওই গেটটা গুলিস্তান-জিপিও-বাইতুল মোকাররমের দিককার, তাই প্রবেশ সহজ), বাকি গ্যালারিগুলোতে কাক পর্যন্ত নাই!

বাফুফে সভাপতি একাই এতবড় একটা মাথাভারি সংগঠন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি তো কোটি টাকা প্রাইজমানির ফেডারেশন কাপ, সুপার কাপ টুর্নামেন্ট একাধিকবার করে দেখালেন, এবারের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপেও স্বাগতিকরা বিজয়ী হলে কোটি টাকার বোনাস ঘোষণা করেছিলেন, চেষ্টা তো তিনি করছেন। বাকিরা কী করেন?
বাংলাদেশের মানুষ রাত ৩টা ৪টা পর্যন্ত জেগে থেকে লা-লিগা দেখে, পাশের দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ফুটবল লীগ দেখে আর মজা পেলে নিজেদের লীগ দেখবে না? কেন দেখবে না! কোনো শত্রুতা তো নেই!