ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 
cricket

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকে প্রায় কখনই পছন্দ করতে পারিনি। ওদের যন্ত্রের মতো পেশাদারিত্ব, সূত্রের মতো নির্ভুল খেলা, গোঁয়ারের মতো জিততে থাকা, ছাপাখানার মতো একঘেয়েমী তৈরি করে। খেলা কার? যে-কারো সাথে অস্ট্রেলিয়ার – ব্যস, অস্ট্রেলিয়া জিতবে – এটা বসে বসে দেখার কী আছে?

সেই অস্ট্রেলিয়াও হারতে শিখলো। খুব কষ্ট করে। হারলো তো হারলো বিশ্বকাপটাই হেরে বসে থাকলো। তাও ফাইনালেরও আগে! একেবারে কোয়ার্টার ফাইনালে! তখনই জানলাম, অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনালে উঠলে ফাইনালেও ওঠে, আর ফাইনালে উঠলে কাপটাও জিতে নেয়। ৯৬-এ অবশ্য পারেনি, রানাতুঙ্গার পাহাড়ের মতো প্রতিরোধ ডিঙ্গাতে পারেনি। সেই-ই শেষ, তারপরের ইতিহাস সবার জানা। ক্রিকেটে যন্ত্রযুগের সূচনা।

কিন্তু গতবার সেমিতে ওঠাই হলো না। সবাই উল্লাস করেছে। আমার বিষন্ন লেগেছে। আমি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থক তো নই-ই, এদের খেলাই আমার ভালো লাগেনি, প্রায় কখনো। তার কারণ হতে পারে, দেশের বাইরে আমার প্রথম পছন্দ দ. আফ্রিকাকে ৯৯-এ ওইরকম ভাবে ছিটকে দেয়া, ২০০৩-এ সৌরভের ভারতকে ফাইনালে ভয়ঙ্করভাবে নাস্তানাবুদ করা, ২০০৭-এ বিতর্কিত ডাকওয়ার্থ লুইসের সুবিধা নিয়ে শ্রীলংকাকে বঞ্চিত করা… অনেক অনেক কারণ। তথাপি অজি’রা বাদ পড়ায় আমার ভালো লাগেনি। সত্যি বলছি। গত বিশ্বকাপে আমার ব্যক্তিগত দুই ট্রাজেডি হলো – বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে না পারা, আর অজি’দের সেমিফাইনালে উঠতে না পারা।

অজি’দের আগাম বিদায়ে কেন খারাপ লেগেছিল, সেটা তখন বুঝতে পারিনি। বুঝতে চেষ্টা করে খুবই অবাক হয়েছিলাম যে, কারণটা ধরতে পারছি না! আশ্চর্য, আমি যাকে পছন্দ করি না, তার হারে আমার মন খারাপ হবে কেন?

উত্তরটা পেতে অপেক্ষা করতে হলো আরও প্রায় দুই-আড়াই বছর। যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের ক্রিকেট বোর্ড আইসিসি’তে বিগ-থ্রি ফর্মুলাসহ আরো নানান কায়দাকানুন পাশ করিয়ে নিলো, যার দ্বারা আইসিসি তথা ক্রিকেট পরিচালনব্যবস্থাতেই সংস্থাটার আধিপত্য হয়ে যায় একচ্ছত্র, একমেবাদ্বিতীয়ম। আইসিসি’র এফটিপি তাঁরা সাজাবেন, বৃহৎ টুর্নামেন্টগুলো তাঁরা আয়োজন করবেন, মোট রাজস্বের সিংহভাগ তাঁরা ভোগ করবেন, যেকোনো মূল্যে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান তাঁদের দখলে রাখবেন এবং এই নিয়মে ছোট দলগুলোকে কোনোভাবেই আর উপরে উঠে আসতে দেবেন না। ২০১৯-এর বিশ্বকাপে টেস্ট প্লেইং নেশন অর্থাৎ আইসিসি’র পূর্ণ সদস্য হয়েও দুটো দেশকে মূল পর্বে খেলতে আসার জন্য পরীক্ষায় বসতে হবে সহযোগী সদস্যদের সাথে! চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে আর টাকার জোরে প্রাপ্ত ক্ষমতার কী ভয়ঙ্কর অপব্যবহার!

আর ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম, কেন মন কু-ডাক ডাকছিল। অস্ট্রেলিয়া চার চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েও (শেষ তিনবার টানা চ্যাম্পিয়ন) ক্রিকেটটাকে নিজ দেশে ধর্মের মতো প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তার দরকারই তারা বোধ করেনি। ক্ষমতা মানেই দুর্নীতি, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানে নিরঙ্কুশ দুর্নীতি! অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেটিয় সামর্থের প্রতি আস্থাশীল থেকে জেতার মন্ত্র রপ্ত করেছে। ক্রিকেট একাডেমি থেকে নিয়ে ক্রিকেট ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত তৈরি করেছে, তাই মাঠের খেলার প্রতি, খেলোয়াড়দের সামর্থের প্রতি কখনও আস্থা হারায়নি। ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়েই প্রমাণ করে দিলো, তারা আসলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্য ছিল না, এখনও নেই। তাই, গোলেমালে হরিবোলে এযাত্রা কোনোরকমে চ্যাম্পিয়ন হয়েই (শুনতে পাই, সেই ফাইনাল নিয়েও নাকি অনেক নয়-ছয় করা হয়েছিল!) তারা জায়গাটা ধরে রাখার জন্য টেবিল-গেম শুরু করে দিলো।

যেকোনো ধর্মেই বিশ্বাসীদের পাশাপাশি অবিশ্বাসীও থাকে। তাই ধর্মপ্রচারকদের প্রধান কাজ হয়ে পড়ে অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাস দূর করা। সেজন্য অনেক হাস্যকর, মনগড়া কাজকারবারও তাদের করতে হয়। বেশিদূর যেতে হবে না, এই ফেসবুকেই আপনি ভূরি ভূরি ফটোশপ জালিয়াতি দেখবেন, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অতিউৎসাহীদের তৎপরতা। ভারতীয়রা ক্রিকেটকে ধর্ম বানিয়েছে, তারপর উপর্যুপরি হারতে হারতে সেই সেই ধর্মের খোদ গুরুরাই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে ক্রিকেটারদের উপর! এদিকে আমজনতা তো মোজেজা (ধর্মের অলৌকিকত্ব) দেখার জন্য অধীর, উন্মাতাল (ধর্মমাত্রই কড়া ডোজের মাদক, যার প্রভাব থেকে ধার্মিকের মুক্তি নেই!), ফলে যেকোনো উপায়ে দলটাকে বিশ্বকাপ জেতানো সেই ধর্মগুরুদের জন্য ফর্জে আইন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এবার যদি ক্রিকেট-ধর্মের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, অযোগ্যকে উচ্চাসনে বসিয়ে দেয়াটা কেবল হাস্যকর পরিস্থিতিই সৃষ্টি করে না, সেটা ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ঙ্কর বিপদজনকও হয়ে দাঁড়ায়। মুচির এক দিনের বাদশাহ হওয়ার গল্প কে না জানে? সিংহাসনে বসেই মুচি-রাজা আদেশ দিলো, স্বর্ণ-রৌপ্যের মুদ্রা বাদ, এখন থেকে রাজ্যে চলবে চামড়ার টাকা! … তবু রক্ষা যে মুচিরাজার ক্ষমতার মেয়াদ সূর্যাস্তের সাথে সাথেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো।

ক্রিকেটের মুচিরাজা’দের রাজত্বের সূর্যাস্তটা দেখতে পাচ্ছি যোগ্য সম্রাট অজি’দের আধিপত্যে। যন্ত্রের মতো পেশাদারিত্বই সই, সূত্রের মতো নির্ভুল খেলা খেলে ওরা গোঁয়ারের মতোই জিততে থাকুক, ছাপাখানার মতো একঘেয়েমী নিয়ে তাই দেখে যাবো, তবু অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী মুচি-রাজাদের খপ্পর থেকে ক্রিকেট তো বেঁচে ফিরুক!

Hail YELLOW LEADERS, your THRONE is awaiting… REGAIN the POWER and SAVE THE CRICKET!!