ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

১.
গতকাল গণভবনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর ভোজসভা ছিলো। এমন একটা সফল বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে উঠতে না উঠতেই প্রবল প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের সাথে স্বপ্নের মতো দুটো সিরিজ শেষ করার পুরষ্কার হিসেবে এই সম্মান ক্রিকেটারদের প্রাপ্য ছিলো বৈকি। কিন্তু কেন জানি মনে হয়, আর ক’টা দিন সবুর করা হয়তো উচিত হতো। কারণ চলমান ক্রিকেট সূচি কিন্তু এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। আসল পরীক্ষা, অর্থাৎ টেস্ট সিরিজটাই এখনও শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। মিশন ইনকমপ্লিট রেখে ভোজ খেয়ে বেড়ানো কতটা যৌক্তিক কে জানে। হতে পারে, প্রধানমন্ত্রীকে বোর্ডকর্তাদের কেউ বুঝিয়ে থাকবেন, ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টিতে দারুণভাবে বিজয়ী হলেও টেস্ট সিরিজের ব্যাপারে তাঁরা খুব একটা আশাবাদি হতে পারছেন না, তাই জয়ের উল্লাস টাটকা থাকতে থাকতেই ভোজসভার ব্যাপারটা সেরে নেয়া ভালো। কে বলতে পারে, টেস্ট সিরিজ শেষ হতে হতে মুখগুলো এমন হাসিখুশি উচ্ছাসে ভরা নাও থাকতে পারে!

২.
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অসাধারণ নৈপূণ্যের পুরষ্কার হিসেবে নগদ অর্থ ক্রিকেটারদের আগে থেকেই প্রাপ্য হয়ে আছে। তারা কেবল বিশ্বকাপের আয়োজক সংস্থা অর্থাৎ আইসিসি’র কাছ থেকেই অ্যাপিয়ারেন্স ফি ও উইনিং বোনাস হিসেবে তিন কোটি টাকারও বেশি অর্জন করেছেন। এটা তাদের আয়, অতএব এর ভাগ তারা পাবেন। সেই সঙ্গে বোর্ড প্রদত্ত বোনাসও তাদের প্রাপ্য। তাদের খেলা দেখে খুশি হয়ে এবং তাদেরকে স্পন্সর করার মাধ্যমে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হয়ে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি পুরষ্কার দিতে চায়, সেটাও দোষের নয় মোটেই। সে বিচারে, এই বোনাসটাও তারা অর্জিত হিসেবেই গ্রহণ করবেন।

সমসাময়িককালে অনুর্ধ ১৪ কিশোরী ফুটবল দল নেপালে খুব চমৎকার নৈপূণ্য দেখিয়েছে, ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে গেছে, ভূমিকম্পের কারণে সেই ফাইনাল অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তারা একক চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন তো বটেই। অবশ্যই এই মেয়েরা দুর্দান্ত পারফর্মেন্স দেখিয়েছেন। টি-টুয়েন্টি ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই যেহেতু তাদের ইরান-বধ সম্পন্ন করে ফাইনালে ওঠা হয়ে গিয়েছিল, সকল টিভির স্ক্রলে ক্রিকেট দলের প্রতি অভিনন্দনবার্তার আগেই তাদের প্রতি অভিনন্দনবার্তা প্রচার করা উচিত ছিলো। আগে না হলেও, পরে অন্তত। … জানামতে, এইসব অভিনন্দনবার্তা প্রচারের কাজটা সংশ্লিষ্ট মহামান্যদের পক্ষে তাঁদের মিডিয়া সচিবরাই করে থাকেন। এটা অনেকটা প্রটোকলের ব্যাপার। নয়তো ক্রিকেট ম্যাচের শেষ বলটা হয়ে যাওয়ামাত্র টিভি-স্ক্রলে কী করে অভিনন্দনবার্তা লেখা হয়ে যায়? সেই হিসেবে, ফুটবল দলের সাফল্যে অভিনন্দনবার্তা প্রচার না হওয়ার দায় অনেকটাই বর্তায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী নেত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীবর্গ ও নেতানেত্রীদের মিডিয়া সচিবদের উপর। তাঁরা সম্ভবত অনূর্ধ ১৪ ফুটবল দলের অর্জনটাকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেননি, তাই সংশ্লিষ্ট ভিআইপি’দের পক্ষে অভিনন্দনবার্তা পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি।

কিন্তু তাই বলে ক্রিকেটারদের বোনাস দেয়াকে ফুটবল দলকে বোনাস না দেয়ার সাথে গুলিয়ে ফেলাটাও কি যৌক্তিক হচ্ছে?

ধরা যাক, দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় ভাই নটরডেম কলেজে পড়ে, ছোট বোন পড়ে ফুলতলা গার্লস স্কুলে। বড় ভাই পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে সারা কলেজে ফার্স্ট হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তার পুরো কলেজ জীবনের সকল একাডেমিক ফি মাফ করে দিয়েছে এমনকি নগদ অর্থে স্কলারশিপও দিয়েছে। ছোট বোনও প্রায় একই রকম কৃতীত্ব দেখিয়েছে ফুলতলা গার্লস স্কুলে, কিন্তু স্কুলের ফান্ডে তেমন টাকাপয়সা না থাকায় তারা কেবল একটা সার্টিফিকেট ও একটা ক্রে্স্ট উপহার দিয়ে দায়িত্ব সেরেছে। এখন আপনি সেই বোনটিকে কেন ফ্রি স্টুডেন্টশিপ ও স্কলারশিপ দেয়া হলো না, তার জন্য নটরডেম কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারেন কি?

দেশে অনেকগুলো খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, তাদের মধ্যে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবচেয়ে ধনী, কেননা ক্রিকেটটাই একমাত্র আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছুতে পেরেছে। অতএব, ধনী ক্রিকেট বোর্ড তার খেলোয়াড়দের মোটা অংকের বোনাস দেবে – এতে অন্য খেলার খেলোয়াড়দের নিয়ে হাহুতাশ করার কিছু দেখি না। আমাদের কিশোরী ফুটবল দলের সদস্যদের অনেকের বুট কেনার সামর্থ নেই, সেটা দেখার জন্য ফুটবল ফেডারেশন আছে, তারা বুট কিনে দেয়ার ব্যবস্থা করুক, করতে তাদের হবে। মেয়েদের সেটা প্রাপ্য, কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের কাছে তো প্রাপ্য নয়, প্রাপ্য ফুটবল ফেডারেশনের কাছে। তাহলে ক্রিকেটারদের বোনাসপ্রাপ্তিকে ফুটবলারদের না পাওয়ার সাথে মেলাচ্ছেন কেনো?

৩.
কিন্তু তারপরও কথা আছে। ক্রিকেটাররা যা নিজেরা অর্জন করে নিয়েছে, তার ঝুলিই তো কম সমৃদ্ধ নয়, তার উপর সরকার থেকে আরো আরো উপঢৌকন চাপানো কেনো? জানামতে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা সবাই স্বচ্ছল, রীতিমতো ধনীই বলা যায়। এবং আরো আরো উপার্জনের জন্য তাদের সামনের পথটাও যথেষ্ট সুগম। ক্রিকেটটা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে যাওয়ায় তাদের জাতীয় দলের বেতন-ভাতা অন্য সব খেলোয়াড়ের চেয়ে ঈর্ষণীয় মাত্রায় বেশি। সাথে আছে ম্যাচ ফি। ক্লাব ক্রিকেট ও আঞ্চলিক দলে ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলে আয় করার সুযোগ। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও নাম লেখানোর সুযোগ। বিজ্ঞাপন, এন্ডোর্সমেন্ট, স্পন্সরশিপ… এমনকি খেলা ছেড়ে দিলে কোচিং ক্যারিয়ার, আম্পায়ারিং, ম্যাচ রেফারিং করে আইসিসি’র সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ, টিভি কমেন্ট্রি দেয়া… অসংখ্য সম্ভাবনা তাদের জন্য উন্মুক্ত। ব্যক্তিগত ব্যবসাবাণিজ্যের কথা বাদই দিলাম। … এহেন ধনী ক্রিকেটারদের না চাইতেই, বোর্ড থেকে নয়, বরং সরকার থেকে বাড়ি দেয়ার ঘোষণা, তাও দুই দুইটা করে – এটা তেলা মাথায় তেল দেয়া। এর পেছনে যেহেতু অর্থায়ন করবে সরকার, অতএব এ টাকায় অন্য সব খেলার খেলোয়াড়দেরও অধিকার আছে। সবাই তাতে বাড়ি না পাক, অন্তত তাদের খেলোয়াড়ি অবকাঠামোর তো উন্নতি হোক। …

দিনাজপুর শহরে আমি মানসম্মত বা মানহীন কোনো ধরণের কোনো সুইমিং পুল দেখিনি। আমি তো দাবী করতেই পারি, আমার জেলায় ভালো একটা পুল থাকলে আমরাও অন্তত একজন আন্তর্জাতিক মানের, নিদেনপক্ষে দক্ষিণ এশিয় মানের সাঁতারু উপহার দিতে পারতাম! এই চিত্র বাংলাদেশের সব জেলার। … পিছিয়ে পড়া খেলার খেলোয়াড়দের বোনাস নাহয় নাই দিলেন, ব্যক্তিগতভাবে একটা টাকাও তারা উপহার বা অনুদান চায় না, কিন্তু তাদের খেলোয়াড়ি অবকাঠামোগুলো তো দিন। পনেরো জন ক্রিকেটারের ঢাকায় ত্রিশটা ফ্ল্যাটের দামে দেশের ত্রিশটা জেলায় জিমন্যাশিয়াম নয়ত সুইমিং পুল অথবা টেনিস কোর্ট তো বানানো সম্ভব। সেদিকটায় নজর দেবে কে?

৪.
ক্রিকেটারদের দাওয়াতের তারিখটা রানা প্লাজা ধ্বংসের ঠিক পরদিনই হওয়ায় ক্রিকেটারদের বোনাসের সাথে রানা প্লাজার হতাহতদের ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গটা সমান্তরালভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। এটা একদিক দিয়ে ভালো, আরেকদিক দিয়ে ভালো নয়। ভালো এইজন্য যে, এক প্রতিশ্রুতির কথা শুনে আরেক প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার ক্ষোভ বেরিয়ে আসাটা মন্দের ভালো। আর খারাপ এইজন্য যে, এই বোনাসের ঘোষণা যদি ২৫ এপ্রিল না এসে ১৩ মার্চ কিংবা ২৭ জুন আসতো, তাহলেও কি এর সাথে রানা প্লাজা প্রসঙ্গ আসতো? আমার ধারণা আসতো না। আর সেজন্যই, আগেরটা মন্দের ভালো হলে, এটা হলো মন্দেরও মন্দ।