ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমরা ফেলানি হত্যার বিচার চেয়েছি। সীমান্তে ফেলানির আগে/পরে আরো অনেককে পাখি শিকারের মতো গুলি করে মারা হয়েছে। আমরা প্রায় সব সময়েই হত্যার, বিশেষত সীমান্তে হত্যার বিচার চেয়েছি, চেয়ে থাকি। কিন্তু ফেলানি হত্যার বিচার চেয়ে যেভাবে আমরা সংগঠিত হয়েছিলাম, প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলাম, আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে দেখেছিলাম, সেটা অন্য হত্যাকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে তেমন একটা ঘটেনি। ফেলানি হত্যার কিছুদিন পরই সম্ভবত, চাঁপাই নবাবগঞ্জ সীমান্তে বাংলাদেশের এক গরু ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে গিয়ে উলঙ্গ করে বেত্রাঘাত করা হয়েছিল ও পুরো ঘটনাটা মোবাইলের ক্যামেরায় ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল। আমরা সেই ঘটনারও প্রতিবাদ করেছিলাম। … এসব ঘটনায় আমরা কেবল হত্যাকাণ্ডটিরই প্রতিবাদ করেছি বা করছি এমন নয়। আমরা আসলে প্রতিবাদ করেছি, কারণ আমরা যেটা সহ্য করতে পারিনি, সেটা অপমান, বর্বরতা। যেটা হত্যাকান্ডের চেয়েও ভয়াবহ। সীমান্ত পার হওয়ার সময় কাউকে সীমান্তরক্ষী গুলি করে মেরে ফেললে তাতে বড়জোর দুঃখিত হওয়া যায়, কিন্তু তার প্রতিবাদ করা যায় না, যদি না সীমান্ত পার হওয়াটা বৈধ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু সেই অনুপ্রবেশকারীকে, সে বৈধ বা অবৈধ যেমনই হোক, গুলি করে মেরে তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখে দিলে তখন আর তার অনুপ্রবেশ বৈধ কি অবৈধ তা বিচারের অবকাশ থাকে না। কারণ এটা বর্বরতা! মানবতার অপমান, মনুষ্যত্ব ও মানব-সভ্যতার উপর ভয়ঙ্কর আঘাত। আমরা ফেলানির জন্য কেঁদেছিলাম, ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম, ক্রোধে ফুঁসে উঠেছিলাম, সেটা আসলে তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি তার মৃতদেহের প্রতি অসম্মানে, মানবতার অপমানে।

রাজন কী অপরাধ করেছিল তা খুব নিশ্চিতভাবে আমার জানা নেই। টিভিতে শুনেছি, সে নাকি চুরি করেছিল। কী চুরি করেছিল তা জানিনা। টাকা হতে পারে, সোনাদানা হতে পারে, খাবার হতে পারে, হতে পারে মোবাইল, ক্যামেরা, ঘড়ি বা অন্য কিছু। এটাই তার প্রথমবার চুরি ছিল, নাকি বারবারই সে চুরি করে ধরা পড়তো, তাও জানি না। পত্রিকা পড়লে হয়তো বিশদ জানা যেত। আমি পত্রিকা পড়িনি। কাগজে ছাপা পত্রিকা আজকাল আর পড়ি না। ইন্টারনেটে সব পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ পাওয়া যায়, তাই কাগজ কেনার খরচটা বাদ দিয়েছি। কিন্তু আমি অনলাইনেও এই সংবাদটা পড়িনি। সন্তর্পনে এড়িয়ে গেছি। আমার সাহসে কুলায়নি। কারণ প্রায় প্রতিটা অনলাইন পত্রিকায় এই রিপোর্টটার সাথে একটা ভিডিও যুক্ত করা আছে। কোনো কোনো অতি উৎসাহী ইন্টারঅ্যাক্টিভ সাইটের ভিডিও আপনা থেকেই প্লে হয়ে যায়। আমি সেই ঝুঁকি নিতে পারিনি।

রাজন যা কিছুই চুরি করে থাকুক, সেই চোরাই বস্তু যত মূল্যবানই হোক, চুরিটা অভাবগত বা স্বভাবগত যে কারণেই হোক, তার শাস্তি প্রাণদণ্ড হতে পারে না। শাস্তিটা যাই হোক, সেটা দেয়ার এখতিয়ার জনগণের থাকতে পারে না। এমনকি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্বারা বিচার-নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দু-চারটা চড় থাপ্পড়ের বেশি আর কোনো শাস্তিই কি কারো দেয়ার এখতিয়ার আছে? কিন্তু তারা শাস্তি দিয়েছে। নিজেদেরকে বিচারকের আসনে বসিয়ে নিজেরাই নালিশ শুনানি করেছে এবং শাস্তির বিধান করেছে। তারপর সেই শাস্তি কার্যকরের দায়িত্বও নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর শাস্তিও কার্যকর করা হয় রাতের অন্ধকারে, জেলখানার চারদেয়ালের ভেতর, মাথায় যম-টুপি পরিয়ে। আমাদের মহান জনতা এমনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করলেন যে, তারা প্রকাশ্যদিবালোকে শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষের সামনে ছেলেটাকে খুঁটির সাথে বেঁধে পেটালেন। ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণে সে মরে না যায়। ছেলেটাকে তার নিজের মৃত্যু অসহায় হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে বাধ্য করা হলো! এবং হাসতে হাসতে এই পুরো প্রক্রিয়াটার ভিডিও ধারণ করা হলো মোবাইলের ক্যামেরায় ! তারপর সেই ভিডিও তারা হৃষ্টচিত্তে আপলোড করে দিলেন ফেসবুকে, ইউটিউবে! কেন?

হত্যা কেন করা হয়েছে? ছেলেটা চুরি করেছিল। চুরির শাস্তি হিসেবে প্রাণদণ্ড অনেক বড় হয়ে গেলেও অন্তত একটা অযুহাত তো তৈরি করা গেল। কিন্তু হত্যার ঘটনাটা ভিডিও করা হয়েছিল কেন? সেই ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল কেন? এর কী জবাব আছে? জবাব একটাই – আমরা দেখবো বলে!

পাশ্চাত্য দেশে স্নাফ মুভি (Snuff Movie) বলে একটা অতি কুৎসিত ব্যাপার আছে। সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দামে বেচাকেনা হয় অতি সাধারণ প্রযুক্তিতে, প্রায় বিশেষত্বহীনভাবে বানানো এই জঘন্য মুভিগুলো। যার দর্শক হাতেগোনা দু-চারজন। একেকটা মুভি তৈরি হয় একজন বা খুব ছোট্ট একদল দর্শকের কথা মাথায় রেখে, তাদের চাহিদা পূরণ করতে। এই মুভির প্রধান উপজীব্য হলো বর্বরতা, পৈশাচিকতা, হত্যাকাণ্ড। একদল অতিমাত্রায় ধনী লোক তাদের বিপুল ধনরাশি কোথায় কীভাবে খরচ করবে ভেবে না পেয়ে বিকৃত রুচির নানান খেয়ালে মেতে ওঠে। তারই একটা পর্যায়ে তাদের মধ্যে বিকার তৈরি হয় – মানুষের মৃত্যুদৃশ্য দেখতে হবে। কীভাবে একটা মানুষ মারা যায়, মৃত্যুর সময় তার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, কীভাবে প্রাণ যায়, কতটা সে তড়পায় – এসব দেখতে হবে। আর এজন্যই তারা অর্ডার দেয় পেশাদার খুনীচক্রকে, যাও একটা খুনের দৃশ্য ভিডিও করে নিয়ে এসো। সহজ শিকার হিসেবে খুনী বেছে নেয় কোনো পতিতাকে, যে জানতেও পারে না তার সাথে কী ঘটতে যাচ্ছে। বড়জোর একটা পর্ণ ভিডিও তৈরি হবে ভেবে চড়া পারিশ্রমিকের লোভে সে রাজি হয়। তারপর যৌনসঙ্গমের এক পর্যায়ে মেয়েটিকে হত্যা করা হয় একদম অতর্কিতে। আর পুরো দৃশ্যটার লাইভ ভিডিও করা হতে থাকে। সেই ভিডিও ক্যাসেট হস্তান্তর করা হয় লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে।

রাজনের হত্যাকাণ্ড ও তার ভিডিও ধারণ একটা সস্তাদরের স্নাফ মুভির চেয়ে বেশি কী? পশ্চিমা স্নাফ মেকাররা তখনই একটা স্নাফ তৈরি করে, যখন তার ক্রেতা পাওয়া যায়। ক্রেতা ছাড়া একটা মানুষের জীবনের সমান মূল্যের এমন ব্যয়বহুল ভিডিও কে বানাবে? অথচ দেখুন, আমাদের দেশে প্রকাশ্য দিবালোকে এ রকম স্নাফ মুভি একটার পর একটা তৈরি হয়েই যাচ্ছে। কারণ আমরা দেখছি। আমি হলফ করে বলতে পারি, গত ৪৮ ঘন্টায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি হিট পড়া, শেয়ার হওয়া ভিডিও ছিল রাজনের হত্যাকাণ্ডের ভিডিও। এই ভিডিওটার সাথে একই সময়ে যদি হাবিব ওয়াহিদ বা হৃদয় খানের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের কোনো ব্র্যান্ড নিউ মিউজিক ভিডিও লঞ্চ করা হতো, নির্ঘাত সেটা ফ্লপ করতো। যেভাবে কোনো তারকা শিল্পীর সেক্স স্ক্যান্ডাল ভাইরাল হয়ে ছড়াতে থাকে সেকেন্ডে সেকেন্ডে, একইভাবে এই ভিডিওটাও ছড়িয়ে পড়েছে, পড়ছে ক্রমশ। আজ একটু আগে বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলের নিউজে পর্যন্ত সেই ভিডিও আবার প্রদর্শন করা হলো, আমি পাশের ঘরে বসে রাজনের কাঁকুতি-মিনতির আওয়াজ শুনে বরফের মতো জমে গেলাম! কেন বারবার প্রচার করা হচ্ছে এই ভিডিও? কারণ আমরা দেখছি। আমাদের কৌতুহলের সীমা নেই! আমাদের আগ্রহেরও বলিহারি! আমাদের হুজুগ এত প্রবল… উৎসাহ এমনই অসীম! যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে আপলোড করেছে, তাদেরকে প্ররোচিত করেছি আসলে তো আমরাই! আমরাই তাদের টার্গেট কাস্টমার ছিলাম, আমরাই এই স্নাফ মুভির দর্শক। বিনেপয়সার সস্তা দর্শক।

এবং সেজন্যই এটা হতে থাকবে। আপনি যতই প্রতিবাদে সোচ্চার হোন, যতই মানববন্ধন করুন, বিক্ষোভ মিছিল করুন, ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে লাখ লাখ লাইক শেয়ার যোগাড় করুন, কোনো লাভ নেই। এটা হতেই থাকবে। কাউকে হত্যা করাটা জরুরী হয়ে না পড়লেও হত্যার খবর সৃষ্টি, হত্যার ভিডিও আপলোডের জন্যই এটা ঘটতে থাকবে। কারণ বাজার যাঁচাই হয়ে গেছে। মার্কেট সাইজ এতই বিশাল যে, প্রডিউসারকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বাণিজ্যনীতি অন্তত তাই বলে। তাছাড়া জিনিসটা তো একরকম সহজই, অনেক নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন। গণধোলাইয়ের বিচার আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। আর যে হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত বেশি তোলপাড় হবে, তার বিচারের সম্ভাবনা ততই কমে যাবে – এটা যেন পরীক্ষিত সত্যে পরিণত হতে চলেছে। ফেলানী হত্যার বিচার ভারত সরকার যেমন করেনি, তেমনি বাংলাদেশেও তো এক শবে বরাতের রাতে ৬-৭জন কিশোরকে গণধোলাইয়ে মেরে ফেলার বিচার আজও হয়নি, গরুচোর সন্দেহে কয়েক দফা কয়েকজনকে মেরে ফেলা হয়েছে যার বিচার হয়নি, গাজীপুরের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস পুরোটাই পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেয়া হয়েছে যার বিচার হয়নি, দুই দফা হরতাল-অবরোধের বাহানায় “জনতার ছোঁড়া” পেট্রোল বোমায় নিহতরা বিচার পায়নি, তারও অনেক আগে সাগর-রুনীর হ্ত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, রাজীব-অভিজিতসহ অনলাইন এক্টিভিস্টদের হ্ত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, দুই দুইজন ধর্মীয় নেতাকে বাসায় ঢুকে জবাই করে হত্যার বিচারও হয়নি এবং আমরা ধরে নিতে পারি, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় কোনোটারই বিচার আর হবেও না হয়তো। … কে বলতে পারে, আগামী শবে কদরের রাতে কিংবা ঈদের দিনেই ঠিক একই কায়দায় ম্যাস এবং সোশ্যাল মিডিয়া দখল করে নেয়া এরকম আরো এক বা একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটবে না? সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করা হবে না? হতেই পারে, এবং হবে। আমরা ভীষণ কৌতুহল নিয়ে, ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে, বেকায়দা ক্ষোভ-ক্রোধ-রোষ নিয়ে সেসব আগ্রহের সাথে দেখবো বলেই এসব হবে।

অতএব, বিচার-শাস্তি চেয়ে প্রাণপাত না করে আমাদের বরং আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত – বিনে পয়সায় এমন মহামূল্যবান স্নাফ মুভি দেখতে পাচ্ছি, আর কী চাই?

“ভাবো সেই অসহায় শিশু
বাদামী-হলুদ চোখ মেলে
বিভৎসতার যত ছবি দেখে ফেলে…
ওইটুকু ছেলে…

কে মরেছে, কে বেঁচে নেই
কার দায় হিসেব করার?
ওই শিশু জেনে গেছে
অযুহাত মানুষ মারার…” *

ফেসবুকে ইভেন্ট খুলছেন, এখানে ওখানে প্রতিবাদে জড়ো হচ্ছেন, হোন। তবে তার আগে নিজের আত্মার কাছে অন্তত পরিস্কার থাকবেন – আপনার মনের ভেতর কোন অনুভূতিটা প্রবল ছিল, ছেলেটাকে মেরে ফেলার জন্য ক্ষোভ, নাকি কীভাবে মারা হলো তাকে সেটা দেখার কৌতুহল? যদি দ্বিতীয়টাই জয়ী হয়, তাহলে খামাখা খেটেখুটে ঘরের বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। পিসি’র সামনে বসে থাকুন, যেকোনো সময় আবার আসবে এই বস্তু – বিনে-মাগনার বিনোদন! বহুমূল্য স্নাফ মুভি – একদম ফ্রি!!!

 

* বন্ধু কবি দেবাশীষ রায়-এর লেখা গানের লিরিক থেকে কবিতাংশ সংকলিত