ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

১৯৯৯ সাল

এক ঘণিষ্ঠ ভাগ্নের কাছে শুনেছিলাম, রাজশাহীস্থ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি’র ভর্তির চিত্র। ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে প্রথম বিপত্তির শুরু। পিতার মাসিক বেতনের ঘরে সে বেচারা সরল মনে সত্যি কথাই লিখলো – ১২,০০০ টাকা। রেজিস্ট্রার হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‌‘আমাদের এখানে বেতনই তো ১৫,০০০ টাকা, ১২০০০ টাকা মাসিক আয় লিখলে হবে?’

ভাগ্নে বেচারা মিনমিন করে বললো, ‘মানে স্যার… ইয়ে, আব্বার আরো কিছু ইনকাম আছে…’।

‘কত?’

‘এই ধরেন, আরো হাজার তিনেক…’

‘তো সেটা লিখো!’

ভাগ্নে পিতার মাসিক আয়ের ঘরে ১৫,০০০ টাকা লিখে দিলো। যেনবা, বেতন এবং ‘আরো কিছু ইনকাম’ হতে প্রাপ্ত সমুদয় আয় সর্বকণিষ্ঠ সন্তানের পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়ে এই পরিবারটি সারামাস নিরুদ্দেশ যাত্রা করবে! … এবার ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষার নিয়ম হলো, ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ন্যূনতম ৩০ পেতে হবে। তাতে করে “অতিরিক্ত ভর্তি ফি” ছাড়াই মাত্র ২৮,০০০ টাকায় ভর্তি হওয়ার সূবর্ণ সুযোগ পাওয়া যাবে। আর যদি তা না হয়, অর্থাৎ পরীক্ষার্থী পাশমার্ক তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে অতিরিক্ত ভর্তি ফি বাবদ আরো ৭,০০০ টাকাসহ মোট ৩৫০০০ টাকা জমা দিতে হবে! বলাই বাহুল্য বাবার কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে সাতটা হাজার টাকা বাঁচাতে বেচারা ভর্তি পরীক্ষায় বসেছিল। সে এক অসামান্য অভিজ্ঞতা! সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশন্ড ক্লাসরুমে মোট সাতজন ইনভিজিলেটরের সামনে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে আমার ভাগ্নেসহ মোট পরীক্ষার্থী ২ জন! পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্র সেখানে বসেই খাতা দেখে নম্বর দিয়ে তাঁরা জানিয়ে দিলেন, ভাগ্নে পাশ, অপর পরীক্ষার্থী ফেল!

 

২০০৪ সাল।

একটা টিভি নাটক বানানোর জন্য আমরা গেছিলাম ধানমণ্ডির UODA ক্যাম্পাসে। এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নামডাক শুনি। এদের পড়াশোনার মান নাকি খুব ভালো। নাটকেও একটা সংলাপ ছিল, ছুটিতে বেড়াতে আসা প্রবাসী নায়িকা বলছে, “তোমাদের এখানে তো পড়াশোনার মান খুব খারাপ… হরতাল, মারামারি, তুচ্ছ কারণে ক্লাসবর্জন, পরীক্ষা বাতিল…”। নায়ক তার জবাবে বলছে, “ওসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়, আমাদের এটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, তাই পড়াশোনায় খুব সিরিয়াস”। প্রহসন হলো, ওই নাটকের শুটিংয়ের জন্য সেদিন গোটা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হলো। একটা কোর্সের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষাও নাকি চলছিল, সেটাও বাতিল করা হলো। আমরা মাথায় হাত দিয়ে বললাম, করেছেন কী! ফাঁকা ক্যাম্পাসে শুটিং করবো কীভাবে? ছাত্রছাত্রীভরা ক্যাম্পাস দেখাতে হবে না? তখন নোটিশ করে সব ছাত্রছাত্রীকে “শুটিংয়ের প্রয়োজনে” ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে বাধ্য করা হলো!

 

২০১২ সাল।

আমার একজন খুব নিকটাত্মীয় তখন AIUB-র শিক্ষক, বর্তমানে তিনি পড়ান East-West University-তে। তো, AIUB-তে থাকাকালীন তাঁর শ্বশুরবাড়ির দিককার এক ছোটবোনের ঘটনা তিনি বললেন। মেয়েটি এসএসসি এইচএসসি দু’বারই জিপিএ ফাইভ পাওয়া। সেই মেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবে বলে তার বাসায় এসেছে। তো শিক্ষক সাহেব তাকে জানালেন যে, যে-করেই হোক, ভর্তি পরীক্ষায় তাকে পাশ করতেই হবে, যাতে ন্যূনতম অপেক্ষমান তালিকায় সে থাকতে পারে। অপেক্ষমান তালিকায় থাকতে পারলে বাকিটা তিনি সামলে নেবেন। বেচারা নিজেই আমাকে বলেছিলেন, আমাদের ভর্তিপরীক্ষা তো নামকা ওয়াস্তে। মোটা টাকা নিয়ে ভর্তি করি, তারপরও কি ভর্তি পরীক্ষায় কড়াকড়ি করলে চলে? … আফসোস, মেয়েটা সেই পরীক্ষাতেও পাশ করতে পারেনি! পাশ মার্ক ৩০%-এর জায়গায় ২৭-২৮% হলেও কিছু করা যেত, মেয়েটা সর্বমোট নম্বর পেয়েছে ১০০-তে ১৯! … এবং সেই মেয়ে এআইইউবি’তে না হলেও অন্য একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

 

এই লেখাটি যাঁরা পড়ছেন বা পড়বেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা ছাত্রছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ঠিক এই মুহূর্তের পড়াশোনার চিত্রটা কেমন আমার খুব স্পষ্টভাবে জানা নেই। তবে পূর্ববর্তী তিন কালের তিনটি ঘটনা থেকে অনুমান করতে পারি, অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। … তো এই যদি হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার হাল-হকিকত, তাহলে সেটাকে পড়াশোনা না বলে বিলাসিতা বলাই যুক্তিযুক্ত। আর এই বিলাসিতা করার অধিকার একমাত্র তাদের, যাদের বাবার অফুরন্ত টাকা আছে। যার বাবার টাকাও নেই, হেলাফেলার ভর্তিপরীক্ষায় যেনতেনভাবে ২৫-৩০ নম্বর পাওয়ারও যোগ্যতা নেই, তার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দরকারটা কী? দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা উৎরানোর যোগ্যতা নেই কিন্তু মোটা টাকায় ডিগ্রি কেনার সাধ্য আছে – তাদের পক্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যুক্তিযুক্ত, অন্যদের জন্য নয়। কারণ আপনি গরীব ঘরের সন্তান, যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন না পড়তে, বাবার কষ্টার্জিত রোজগার ও সঞ্চয় ধ্বংস করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, যেখানে টিভি নাটকের শুটিংয়ের মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার জন্য ক্লাস-পরীক্ষা সাসপেন্ড হয়ে যায় – এটা কোন্ বিচারে যৌক্তিক? আপনি যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও কেনো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, যেখানে ভর্তি পরীক্ষা পাশ করলে যেমন ভর্তি হওয়া যায়, পাশ না করলেও নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিলেই ভর্তি হওয়া যায়? আপনার বাবার পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে আপনি কেন সেই বিশ্ববিদল্যালয়ে যাবেন, যেখানে শিক্ষা জিনিসটাই একটা পণ্যে পরিণত হয়েছে? আর শিক্ষাকে যারা পণ্য তো বটেই, রীতিমতো বিলাসদ্রব্যে পরিণত করেছে, তাদের উপর সরকার ভ্যাট বসাবে না কেন?

 

এবার বলবেন, দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ছাত্রছাত্রী এসএসসি এইচএসসি পাশ করে, সেই পরিমাণ আসন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নেই। অতএব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ছেলেমেয়েরা যাবে কোথায়? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অফুরন্ত আসন নেই, সেটা তো আগে থেকেই সবার জানা। আমাদের সময়েও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি আসনের বিপরীতে ৮০-৯০ জন করে প্রার্থী ছিল। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যেবার ভর্তি হলাম, সেবার মোট ১২০টি আসনের বিপরীতে ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল চৌদ্দ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী! অবিশ্বাস্য হলেও এটা সঠিক তথ্য। প্রতিবছরই এমনটা হচ্ছে। আমরা তো জন্ম থেকেই এমন চাহিদা-যোগানের বিপরীত সংঘর্ষ দেখছি। আমাদের মতো গরীব দেশে এভাবে চাহিদা-যোগানের বৈরিতা জয় করেই আমাদের টিকে থাকতে হয়। এটাই বাস্তবতা। এবং এই সংগ্রামে বিজয়ী হয়েই যার যা প্রাপ্য, আমরা তা আদায় করে নিচ্ছি। এই নির্মম সত্যটা জানতাম বলেই আমরা নিজেদের তৈরি করেছিলাম সেই লড়াইটা লড়বার জন্য, জিতবার জন্য। তাহলে এই ক’বছরে দিনকাল কী এমন বদলে গেল যে, এখন সবার সবকিছু বিনাচেষ্টায়, বিনা কষ্টে পেয়ে যেতে হবে? হিসাবটা খুব সোজা। যাদের মেধা আছে, তারা প্রতিযোগিতামূলক ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, স্বল্প আয়ে পড়াশোনা করবে। আর যারা সেই ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে না, তারা টাকা থাকলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে এবং বেতন-ভাতা-ফি’এর উপর সরকার নির্ধারিত ভ্যাট দিয়েই পড়াশোনা করবে। যদি সেইসব উচ্চমূল্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সামর্থ তাদের থাকে, তবে সাত-সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট দেয়ার সামর্থও তাদের থাকতে হবে। আর যদি সেটাও না থাকে, তার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আমার মনে হয় না, পরিবেশগত পার্থক্য ছাড়া শিক্ষার মানের দিক থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববদ্যালয়গুলো খুব একটা এগিয়ে আছে। … আর যদি কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভূক্ত কলেজগুলোতেও ভর্তি হতে না পারে বা না চায়, তাহলে তার উচ্চশিক্ষালাভের চেষ্টা আর না করাই ভালো। সবার দ্বারা সবকিছু তো হবে না, জানাই কথা।

 

জিপিএ যাই হোক না কেন, যদি সত্যিকার প্রস্তুতি কেউ নিয়ে থাকে, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে – কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না। আর যদি সে তা না পারে, তবে তার জন্য সে নিজেই দায়ী। দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-সরকারকে দায়ী করে কোনো লাভ নেই। দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-সরকার আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে, বরং সময়ের প্রয়োজনেই তার উত্তোরণ ঘটেছে।

 

তদুপরি কেউ যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাভাতা থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবী করতে চান, তা তিনি করতেই পারেন। তবে সেটা সরকারের কাছে কেন? সরাসরি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই দাবী করুন, যেন ভ্যাটবাবদ এই বাড়তি খরচটা ছাত্রছাত্রীদের বদলে তারা নিজেরাই দিয়ে দেয়। কিংবা এমনভাবে বেতন-ভাতা-ফি ইত্যাদি পুনর্নির্ধারণ করে, যেন অতিরিক্ত সাড়ে সাত পার্সেন্ট ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে বাড়তি বোঝা সৃষ্টি না করে। উদাহরণস্বরূপ, জুতোর উপর ভ্যাট বসানো হলো যে বছর থেকে, সেই বছর বাটা জুতোর গায়ে ভ্যাটের অংক লিখে দেয়া শুরু করলো। যেমন, জুতোর মূল দাম ৮০০ টাকা+ভ্যাট ৫% – ৪০ টাকা = মোট ৮৪০ টাকা। অথচ জুতোটার দাম গত বছর ৮৪০ টাকাই ছিল। এবার শুধু ভ্যাট বাবদ ৪০ টাকা আলাদা করে প্রদর্শিত করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যদি এভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বেতন-ফি থেকে সরকারের প্রাপ্যটা দিয়ে দেয়, ছাত্রছাত্রীদের তাতে আপত্তি থাকার কোনো কারণ দেখি না।