ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

গতকালকের বৃষ্টিতে সমস্ত শহর ডুবে গেল, সেটা অতিবৃষ্টির কারণে নয়। এর চেয়েও দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টি আমি মাত্র ক’দিন আগে দিনাজপুরে দেখে আসলাম। টানা চব্বিশ ঘন্টারও বেশি। শহরের এমনকি নিচু এলাকাগুলোরও তেমন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। অন্তত একটা রাস্তাও ডুবে যায়নি। হাসপাতালে আমার শাশুড়ি মারা গেলেন, বাইরে তখনও ঝমঝম বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বাড়ি নিয়ে আসলাম, পথঘাট স্বাভাবিক ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তাঁর কবর খোঁড়া হয়েছে, আমরা ভিজতে ভিজতে তাঁর কাফন-কর্পুর ইত্যাদি কিনেছি, লাশের খাটিয়া এনেছি, লাশ গোসল দিয়েছি। বৃষ্টি থেমেছে ঠিক সকাল সাতটায়। আমরা তাঁর জানাজা পড়েছি সকাল ১০টায়। তারপর খাটিয়া কাঁধে পায়ে হেঁটে মাইলখানেক দূরের গোরস্থানে দাফন করে এসেছি। বৃষ্টি থামার তিন ঘন্টার ব্যবধানে শহরে নেমে একবারের জন্যও মনে হয়নি, গত ২৪ ঘন্টা টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। অথচ দিনাজপুর খুব পরিকল্পিত শহর নয়। অতি পুরাতন, অনুন্নত এক শহর, যেখানে “বিশেষ ধরণের” কোনো সুয়ারেজ ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত নেয়া হয়নি, নেয়ার প্রয়োজনও হয়নি। … ঢাকা শহর অচল হয়ে গেল কেন তাহলে?

প্রশ্ন করি নিজেকে। আমরা পথেঘাটে বাদাম-চানাচুর-চিপস-চকলেট-আইসক্রিম ইত্যাদি খেয়ে কাগজের ঠোঙ্গা বা মোড়ক ফেলি কোথায়? ডাস্টবিন আমাদের চোখে পড়ে না, আমরাও খুঁজি না। চোখে পড়লেও তার অবস্থা এতই শোচনীয় থাকে যে, আমরা তার কাছে যাওয়ার চিন্তাও করি না। একজন মানুষ কতটা সভ্য তা তাঁর বাসার ড্রয়িং রুম দেখে নয়, রেস্টরুম দেখে বোঝা যায়। ঠিক তেমনি, একটা শহর কতটা সভ্য সেটা বোঝার জন্য পার্ক-মনুমেন্ট-হাইরাইজ বিল্ডিং নয়, দেখতে হয় সে শহরের সুয়ারেজ ব্যবস্থা। আমাদের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় সব ক’টি প্রধান সড়কের উপর একদম খোলা পড়ে থাকে ডাস্টবিন – সারাদিন! আমরা সেই ছোটবেলায় বিটিভিতে প্রমোশনাল দেখতাম (এত দিনে ভারতীয় চ্যানেলগুলোতেও দেখতে পাচ্ছি), খোলা জায়গায় মলত্যাগ করা যাবে না। অথচ আমাদের শহর আজকের তারিখ পর্যন্ত মলত্যাগ করে খোলা রাস্তার উপর! আপনি কাকে দোষ দেবেন? শহরের পনের হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে, নাকি দেড় কোটি বাসিন্দাকে? প্রতি দশ হাজার মানুষের আবর্জনা একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কীভাবে পরিস্কার করবে, যদি সেই দশ হাজারের মধ্যে অন্তত এক হাজার জন নিজেরা সচেতন না হন?

আমার বিল্ডিংয়ে প্রতিদিন কিচেন ওয়েস্টেজ নিতে লোক আসে, তাদের বিল মাসে ৩০ টাকা, অর্থাৎ দৈনিক মাত্র ১ টাকা। এই ১ টাকা উপরের একাধিক ফ্ল্যাটের বাসিন্দা খরচ করতে রাজী নন। ফলে, তাঁদের রান্নাঘর থেকে প্রায় সারাদিনই ধুপ-ধাপ করে এটা-সেটা নেমে আসে নিচে, দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানের প্যাসেজটাকে ভাগাড়ে পরিণত করে। একবার তো উপর থেকে ফেলা আবর্জনার প্যাকেট মাঝপথে খুলে গিয়ে সমস্ত ময়লা এসে পড়লো আমার রান্নাঘরে! অভিযোগ করতে গেলাম, সরাসরি অস্বীকার করলো সবাই! তো এই সমস্যার সমাধান কে করবে? কে আমার বাড়ির পাশের প্যাসেজ পরিস্কার রাখবে? মেয়র সাহেব?

এই তো আর এক মাসের কম সময়ের মধ্যে উদযাপিত হবে ঈদুল আজহা। গত তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যারা পশু কোরবানী করবেন, তারা প্রায় সবাই নিজের বাড়ির সামনেই করবেন, খোলা রাস্তার উপর পশুর রক্ত, মলমূত্র-আবর্জনা ছড়িয়ে রেখে মাংস নিয়ে ঘরে উঠে যাবেন। খুব দয়া হলে এক বালতি পানি নামকাওয়াস্তে চালিয়ে দেবেন, তারপর সেই যে দরজায় খিল দেবেন, আর বাইরে তাকিয়ে দেখবেন না। অথচ ওই জায়গাটাকে ঘিরে আরো অন্তত চারটা বাড়ি, তাদের চল্লিশটা ফ্ল্যাটের অগণিত মানুষের কী হবে, এমনকি তাঁর নিজের পরিবারেরই বা কী হবে, তা নিয়ে তিনি ভাববেন না। গত বছর আমি আমার এলাকার এক স্বনামধন্য ডাক্তারকে দেখেছি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে হাতিরঝিলে গরুর ভূঁড়ি পরিস্কার করাতে! একজন ডাক্তার, উন্মুক্ত জলাশয়ের পানি নোংরা করতে এতটুকুও বিচলিত হচ্ছেন না! তাহলে অন্যরা কী করবেন?

আমরা বর্ষাকালে রাস্তায় পানি জমে যাওয়াটা দেখি, প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা দেখি, অথচ শুকনো ঋতুতে ধোঁঁয়ার মতো ঘিরে থাকা ধূলোর পাহাড় দেখি না। বিশ্বের কোন্ দেশের রাজধানী এরকম ধূলি-ধূসরিত? পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে আমরা একটা পরিচ্ছন্ন রাজধানি গড়তে পারিনি, তিন মাসে দুজন মেয়র তা করে ফেলবেন? ইলেকশনের আগে মেয়র-প্রার্থীরা ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন। ভুল করেছিলেন। ঝাড়ু হাতে নিয়ে নয়, রাস্তায় ঝাড়ু চালিয়ে। ঝাড়ু চালাতে হতো শহর নোংরাকারি দু’চারজন নগরবাসীর পাছায়… তাহলে যদি কারো টনক নড়তো!

আমাদের শহর নোংরা আছে থাকবে, কারণ আমরা নগরবাসীরাই চাইনা একটা পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে উঠুক। আমরা এতটাই স্বার্থপর যে, আমাদের নিজেদের বাড়ির… না বাড়ির নয়, শুধুমাত্র নিজেদের ফ্ল্যাটের এক-দেড় হাজার স্কয়্যার ফিট জায়গা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেই আমাদের চলে যায়, সেটা করতে গিয়ে ওই বিল্ডিংয়েরই চারপাশ পুঁতিগন্ধময় হয়ে গেলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। লক্ষ্য করে দেখবেন, গতকাল শহরের ঠিক যে জায়গায় যার কাজ পড়েছিল বা যে এলাকায় যিনি গিয়েছিলেন, সেই এলাকার পানিবন্দী অচলাবস্থা নিয়েই তিনি চিন্তিত। যিনি শান্তিনগরে আঁটকে থেকেছেন, তিনি শান্তিনগরের দুর্ভোগে বিচলিত, যিনি গ্রীনরোডে বন্দী, তিনি গ্রীনরোডের মুক্তি কামনায় উদ্গ্রীব। অথচ গোটা শহরটা নিয়ে কেউ উদ্বিগ্ন নন, সম্পূর্ণ রাজধানী নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই! কারণ দেড় কোটি বসতির এই নগর আসলে দেড় কোটি ভাগে বিভক্ত। সবাই তাঁর নিজেরটুকুকেই নিজের ভাবেন, প্রতিবেশীকে নিয়েই কেউ চিন্তিত নন, সমগ্র শহর তো অনেক বড় ব্যাপার।

 

ফলে নগরবাসীর নগরের প্রতি দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা যতদিন আসবে না, জলাবদ্ধতাও ততদিন যাবে না।