ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আপনার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান এই মনুষ্যজাতি, ভালো থাকার সপক্ষে অতি অদ্ভূত সক্ষমতা ও অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিল এই পৃথিবীতে। এমনকি আমাদের পাপমোচনের জন্য আপনি এই ধরিত্রিতে এসে এত দুঃখ, এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা-দুর্ভোগ-লাঞ্ছনা ভোগ না করলেও, এমনকি স্বীয় প্রাণ বিসর্জন না দিলেও আমরা বোধকরি খুব একটা মন্দ থাকতাম না। মন্দ থাকবোই বা কী করে? মন্দ থাকার জন্য প্রথমেই মন্দ ব্যাপারটি আদতে কী সেটা তো জানা প্রয়োজন! হায় পরম-পিতা, আপনার অবুঝ সন্তানেরা যে ভালো-মন্দের প্রভেদ করতেই আর মোটে আগ্রহী নয়! ফলে, তাদের এই নিত্য ভালো থাকা রোধে সাধ্য কার?

কী অদ্ভূত এক বিশ্বাস নিয়ে আপনি এসেছিলেন এই ধরিত্রির বুকে সেও সেই দুহাজার বছরেরও আগে, আপনি বিশ্বাস করেছিলেন পাপের পঙ্কিলতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত আপনার সন্তানেরা স্বর্গের দ্বার হতে ফিরে যাবে, যদি তাদের জীবদ্দশায় সেই পাপ স্খলনের জন্য আপনি, পরম পিতা, আপনার পিতৃদায় নিয়ে পবিত্র আত্মার সন্ধান না করেন, মঙ্গলজ্যোতির শুভদৃষ্টিতে তাদের অন্তরের কৃষ্ণগহ্বর আলোকিত না করেন, শ্বেতশুভ্র আস্থার হাত বাড়িয়ে কেশাগ্রাবধি ক্লেদসাগরে অস্তমিত সন্তানদের মুক্তির পথে ফিরিয়ে না নেন।

তাই আপনি পবিত্র আত্মার প্রতিনিধি হয়ে জন্ম নিলেন এই ধূলিধূষরিত মর্ত্যে, মেষপালকের অতি-অনুল্লেখযোগ্য জীবনযাপন করলেন, রোগ-জ্বরাক্রান্ত মানবগোষ্ঠীকে দিলেন চিকিৎসা, সেবা আর আস্থা। পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়লেন মানব-রিপুর সন্ধানে। আপনি লড়াই করেছেন অসুন্দরের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, অশূচির বিরুদ্ধে… অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে। অথচ, আপনার প্রধান শত্রু, আপনার সন্তান এই মানবজাতির প্রধান শত্রু যে অবিশ্বাস তার জলজ্যান্ত নমুনা যে ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল আপনারই একান্ত অনুসঙ্গীদের মাঝে! আপনি তো সর্বোজ্ঞ, আপনি কি জানতেন না এই ঘৃণ্য সত্য? জানতেন। নিশ্চয়ই জানতেন। জানতেন বলেই না শেষের সেই রাতে, শেষবার পানপাত্র হাতে নিয়ে, বন্ধু-শিষ্য-সহচর পরিবেষ্টিত হয়েও যেন কোণঠাসা বাঘের মতো একাকীত্বের অসহায়তায়, অথচ পর্বৎ-গুহায় ধ্যানমগ্ন ঋষির অবিচলতায় আপনি দেখতে পেয়েছিলেন আপনার আসন্ন পরাজয়, সন্নিকট নির্মম মৃত্যু। তখনও পর্যন্ত সময় কিন্তু ছিল আপনার হাতে। সহস্রাব্দব্যাপী শান্ত জলধির মতো স্থির-কল্প যে সময় আপনারই অপেক্ষায়, তার নিয়ন্ত্রণ তখনও পর্যন্ত তো আপনারই হাতে। আপনি চাইলেই একান্ত অনুগত সময় আপনাকে নিয়ে চলে যেত সকল অবিশ্বাস আর কৃতঘ্ন ষড়যন্তের ঊর্ধ্বে। কিন্তু আপনি তা চাইবেন কেন?

সন্তানের শেষ পাপটুকু স্বীয় শণিতধারায় ধুয়ে ফেলে তবেই আপনি স্বর্গে ফিরে যেতে চাইলেন। তাই রয়ে গেলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অনুসারী আর একজন অবিশ্বাসীকে সাথে নিয়ে – সমগ্র মানবজাতির পাপের সমান বৃহৎ সেই ক্রুশ বহনের অপেক্ষায়। শেষ পাপ জেসাস? আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলেন, আপনাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করাই হবে আপনার সন্তানদের শেষ পাপ? না, সে বড়জোর প্রত্যাশা হতে পারে, বিশ্বাস নয়। যে সন্তানেরা আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা অতীতেই কখনও রাখেনি, তাদের কাছে এই অন্তিম মুহূর্তে বড়জোর প্রত্যাশাই রাখা যায় তবে এই হোক তোমাদের শেষ পাপ! … হায় পরমপিতা, আমরা আপনার শেষ প্রত্যাশাটুকুও আমলে নিতে এতটুকু সচেষ্ট হইনি! কথায় বলে, পাপ নাকি বাপকেও ছাড়ে না। দেখুন, আমরা কী নিষ্ঠার সাথে, পরম দায়িত্বজ্ঞান করে সন্তান থেকে সন্তান অবধি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, জাতির পর জাতি ব্যাপ্ত করে বিপুল আগ্রহে খনন করে চলেছি পাপ-পঙ্কিলতার মহাসমুদ্র! হায় জেসাস! তবে কি শেষ পাপ ভেবে আপনার সেই আত্মত্যাগ বৃথাই গেল? এই ভুল বুঝতে পেরেই কি তবে তৃতীয় রাত্রীতে আপনার ঐতিহাসিক সেই পুনরুত্থান!

 

তারপরও মোটের উপর আমরা হয়ত ভালোই আছি। এককালে এই মাটির পৃথিবী ছিল সদাপ্রভূর স্বর্গরাজ্য। আজ আমরা আপনার সেই স্বর্গভূমিকে আমাদের নিজস্ব নিয়মে ‘কাস্টমাইজ’ করেছি। রাত্রী না এলে দিনের মহিমা কি বোঝা যায়? কালোর বুকেই না সাদার অবয়ব ফোটে। মন্দ যদি না-ই থাকে, ভালোর প্রভেদ বুঝবো কী করে? আমরা তাই আপনার রেখে যাওয়া পূণ্যময়  পৃথিবীতে নিজ দায়িত্বে পাপের বীজ বুনেছি, বুনেই চলেছি। লোভ, ঘৃণা, ক্রোধ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ আর স্বার্থপরতার জল-হাওয়া-সার-কীটনাশক দিয়ে পরম যত্নে প্রতিপালন করছি পাপের বীষবৃক্ষ। ভালো-মন্দ, উচ্চ-নীচ, ন্যায়-অন্যায়, পূণ্য-পাপের ভারসাম্যরক্ষায় আমরা সদা সচেষ্ট থাকি। ভারটা সর্বদা সাম্যের দিকে রাখতে পারি না, তেমনটা চেষ্টাও করি না প্রায়শ। কী জানেন, আজকাল মনে যা থাকে, তাকে মুখে আনাকে খুব বড় বোকামী বলে ধরে নেয়া হয়। সম্পূরকভাবেই, মুখে আমরা অনর্গল তা-ই বলে থাকি, যা কখনো মনে নিই না। তো, এই কপটতার বহুগামী চর্চায় আমরা বেশ ভালোই একটা মিঠেকড়া-টক-ঝাল-মিষ্টির পৃথিবী দিব্বি বানিয়ে নিয়েছি। আর কী আশ্চর্য, আপনার মহৎহৃদয়ের ছিটেফোটা এখনও যে আমাদের সংকীর্ণ মনের গহীনে রয়ে গেছে, তারই প্রমাণস্বরূপ কিনা কে জানে, আমাদের একান্ত নিজস্ব, সার্বভৌম অধিকারের এই পৃথিবীতেও, আমরা কিন্তু আপনাকেও একটা স্থান দিয়ে রেখেছি! আপনি কী সৌভাগ্যবান আমাদের এই মানবকূলের মহাশক্তিধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবর্গ আজও আপনার নাম নেয়! এরা আপনারই নাম নিয়ে সাগর পেরিয়ে বোমা ফেলে আাসে বীরপুরুষের বেশে! এদের প্রায় সকল কর্মকাণ্ডের সূচনা হয় একটি স্তোকবাক্যে ইন গড উই ট্রাস্ট। না ভুল করবেন না, এটা কোনো প্রার্থনা কিংবা প্রতিজ্ঞা নয়। এ হলো নিছকই এক বিবৃতি। কারণ আমরা তো জানিই, আপনাতে বিশ্বাস অর্পন না করলেও আপনার বিশেষ কিছু করবার নেই। সেই যে একবার দুহাজার বছর আগে আপনি অবিশ্বাসীদের পাপ সাথে নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মরে গেলেন, আবারও কি ফিরে আসবেন এই মর্ত্যে? আবারও মরতে! … ফলে, আমরা আপনার কষ্ট লাঘবের জন্যই কিনা, আগেভাগে স্বীকার করে নিলাম আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি। ব্যস, আপনিও খুশি থাকলেন, আমরাও নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে আমাদের জাত-ব্যবসা শুরু করে দিলাম… জানেন তো, আমাদের ব্যবসায়ীরা আজকাল বেশ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে ইন গড উই ট্রাস্ট, অল আদার পে ক্যাশ! হা হা হা…

 

তো, জেসাস এভাবেই আমরা যুগে যুগে আমাদেরই গড়া অবিশ্বাসের নিগড়ে স্বীয় আত্মাকে বেঁধে রেখে এমন পাপের বেসাতি চালিয়েই যাবো, আপনি আমাদের নিয়ে ভাববেন না। আমরা এভাবেই ভালো থাকবো। আপনার চলে যাওয়ারও প্রায় সাড়ে ছশো বছর পর আপনারই আরেক উম্মত এসেছিলেন এই ধরিত্রিতে। তিনিও সবাইকে শান্তি ও সংহতির বাণী শুনিয়ে গেলেন। আমরা তাঁর কথাও জেনেছি, শুনেছি, মেনেছি। তারপর আবার সব যে-কে-সেই! … আমাদের আর অবতারের দরকার নেই, হে পিতা। আমরা আসলে এভাবেই থাকবো। ভালো-মন্দের সংজ্ঞা কী? সে বড়ই আপেক্ষিক প্রশ্ন। সেই তর্কে না গিয়ে স্বীয় বিবেচনাকেই বাস্তব ধরে নিয়ে আমরা আমাদের এই থাকাটাকে ভালোই বলতে চাই। ভালো বললেই তো ভালো থাকা যায়। এই যে আগামীকাল শুরু হচ্ছে ডিসেম্বর, আপনার জন্মমাস। আমরা সারাটা মাস ধরে ক্রিসমাস ডে পালন করবো। চার্চে মোমবাতি জ্বালাবো, বাইরে আলোকসজ্জা। ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হবে, নতুন কাপড়, নতুন জুতো, খেলনা, চকোলেট… আর অপেক্ষায় থাকবো, কখন সান্তা ক্লজ আসবেন আর নিরন্ন-বঞ্চিতদের উপহারসামগ্রী দিয়ে যাবেন। আমরা কিন্তু ফিরেও দেখবো না পার্শ্ববর্তী অসহায় মানুষটিকে ওসব সান্তা বুড়োর কাজ, আমরা কেন তাঁর কাজে দখলদারী করবো? সবার কাজ সবার দায়িত্ব ভাগ করা, ইউ নো? উই আর হ্যাপি এন্ড উই আর অলরাইট। জানেন তো, আজকের পৃথিবীতে অলরাইট থাকার সূত্র কী? ফার্স্ট অব অল, ফরগেট হুইচ রং এন্ড হোয়াট’স রাইট, দ্যাটস দ্য ওয়ে টু বি অলরাইট

 

জেসাস, সত্যি বলছি আমরা বোধহয় ভালোই আছি!