ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

আইপিএল, বিগব্যাশ, বিপিএল ইত্যাদি টুর্নামেন্ট আয়োজনের ফর্মুলাতেই গলদ আছে। একেকটা টুর্নামেন্টে একটি দলের অংশ নেয়া তাদের সব ক’টি ম্যাচ থেকে প্রাপ্ত আয় দলের পেছনে ফ্র্যাঞ্চাইজির মোট বিনিয়োগের সমান তো দূরে থাকুক, কাছাকাছিও নয়। তাহলে একটি (কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক) কর্পোরেট কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনে দল গড়ছে কেন? তাদের লাভটা কোথায়? শুধুই সিএসআর? … অথচ আমরা সবাই জানি, এ ধরণের লিগে অংশ নেয়া প্রতিটি দলই টুর্নামেন্ট শেষে লাভে থাকে, কেবল লাভেই নয়, বিপুল লাভে থাকে, তা সে টুর্নামেন্টের পয়েন্ট টেবিলে দলের অবস্থান একদম তলানীতে থাকলেও। … অতএব, এখানে নিশ্চয়ই কোনো “গিরিবিল্টি” আছে!

আমি তাই আইপিএল বা বিপিএল কোনোটা নিয়েই খুব একটা আগ্রহী নই। আমার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় কিছু খেলোয়াড় আছেন, টিভির সামনে পড়ে গেলে তাঁদের খেলা দেখি। এই তাঁরা প্রায় সবাই আমাদের দেশের ক্রিকেটার। যতদিন আমাদের মাশরাফি, তামিম, মুশফিক, রুবেল’রা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মাঠে সেভাবে ব্যস্ত হতে পারেননি, ততদিন শচীন, ডোনাল্ড, লারা, জয়সুরিয়া, মুরলীধরণ, ওয়াসিম আকরাম’রা মনোযোগ টেনেছেন। কিন্তু মাশরাফি’রা মাঠ দখল করে নিলে পরে বিশ্বের সেরা ওপেনিং জুটি বলতে আমি তামিম-সৌম্য-বিজয়’দেরই বুঝি। মিডল অর্ডারে কোন্ দলে কারা খেলেন আমি খোঁজ রাখি না, কারণ সাকিব-মুশফিক-রিয়াদ’দের উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমার কাছে স্টেইন না মালিঙ্গা সেরা তা নিয়ে মতবিরোধ নেই, কারণ রুবেল-মাশরাফি-মুস্তাফিজের ধারেকাছেও আমি তাদের কাউকে ভাবি না। কেউ আমাকে অন্ধ-জাতীয়তাবাদি বলতে পারেন, আমি সেটা কমপ্লিমেন্ট হিসেবেই নেবো।

আচ্ছা, এই বিপিএল-টা আসলে কী? ক্রিকেটারদের গাড়ি-বাড়ি কেনার জন্য বোনাস স্কিম? দুর্যোগ মোকাবেলায় এফডিআর? রিটায়ারমেন্ট পলিসি? গত দুটো আসরে তো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো কোনো ক্রিকেটারেরই টাকা শোধ করেনি। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটারদেরই ছাড় দিয়ে পাওনা টাকার ষাট থেকে সত্তুরভাগ মাফ করে দিতে হয়েছে। ছাড় দেয়ার পর যেটুকু পাওয়ার কথা, সেটাও না দিয়ে কয়েকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি নিজেরাই হাপিশ হয়ে গেছে! অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বোর্ড এবার সব ক্রিকেটারের দাম বেঁধে দিয়েছে, তাও আবার দেশি ক্রিকেটারদের! অর্থাৎ একজন দেশি ক্রিকেটার বাঁধাধরা পারিশ্রমিকের বেশি দাবী করতে পারবেন না, অথচ সমযোগ্যতার একজন বিদেশী ক্রিকেটার ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাবেন। ফলে মাশরাফি আর আফ্রিদি সমান যোগ্য (কিংবা মাশরাফি আফ্রিদির চেয়েও বেশি যোগ্য) হলেও আফ্রিদি পাচ্ছেন মাশরাফির চেয়ে বেশি। একইভাবে, মুশফিকের চেয়ে সাঙ্গাকারার কিংবা তামিমের চেয়ে গেইলের পারিশ্রমিকও আনুপাতিক হারে বেশি! আমরা তাহলে কাদের লাভের জন্য এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করলাম?

এটাও ঠিক যে, বিদেশী ক্রিকেটারের অংশগ্রহণ ছাড়া আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জমে না। সেদিক বিবেচনায় বিদেশীদের অংশগ্রহণের জন্য দেশিদের ছাড় দেয়া – এ পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়। যদিও মেনে নেয়ার ধারাবাহিক পর্ব কম বিতর্কিত ছিল না। নিরাপত্তা ইস্যুতে যেখানে বিশ্বের কোনো দেশের কোনো দল পাকিস্তান সফর করতে রাজি নয়, সেখানে আমরা কয়েক দফা আমাদের বোর্ডকে জাতীয় দল পাঠাতে উদ্যোগ নিতে দেখেছি, শেষ পর্যন্ত নারী ক্রিকেটারদের পাঠিয়েও দিয়েছি। তারও আগে, নিজেদের মাঠে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সিরিজ আয়োজনের গেটমানি থেকে প্রথমে প্রায় পুরোটা, পরে অর্ধেকটা দাবী করেছে পাকিস্তান বোর্ড, সে দাবী না মেটালেও আমরা তাদের বিমান ভাড়া পর্যন্ত গুণেছি। ভাগ্যিস সিরিজটা আমরা সর্বোতভাবে জিতেছিলাম, ফলে এই বিমানভাড়া আমাদের গায়ে লাগেনি, দয়ার দান বলেই হাসিমুখে দিতে পেরেছি। তো এইসব নানামুখী “ছাড়” না দিলে বিপিএলের দ্বিতীয় আসরের মতো এই আসরেও পাকিস্তানী ক্রিকেটারদের দেখা যেত না।

তাতে কী হতো?

এই নিয়ে তৃতীয়বার বাংলাদেশে বিপিএল হচ্ছে, আজও কোনো ভারতীয় ক্রিকেটার আমরা চোখে দেখলাম না। ইংল্যান্ডের মধ্যম সারির (ইংল্যান্ড দলটাই মধ্যম সারির, তাদেরও মধ্যম সারির!) দু-একজনকে দেখা গেলেও, অস্ট্রেলিয়ার কেউ কি আছেন? এবার কেউ নেই, অতীতে কেউ এসেছিলেন কিনা আমার জানা নেই। গেইল তো “মার্সেনারি ক্রিকেটার”, সারা দুনিয়া চষে বেড়ান, তাঁর কথা আলাদা। দরিদ্র ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটারদের অনেকেই এসেছেন। নিউজিল্যান্ডের ক’জন আছেন? এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকারও তো উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে শুধুই পাকিস্তানীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এত এত ছাড় দিতে হলো কেন?

এসবই মেনে নেয়া যায়। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অফিশিয়ালি আপত্তিকর কথাবার্তা বলা শুরু করেছে, সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় তাদের পার্লামেন্টে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং উদ্বেগ ও অসন্তোষ জানিয়ে অফিশিয়াল বিবৃতি দিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিবাদ জানানোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তাদের অসন্তোষ জানানোর কথা বলেছে এবং তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে “পাকিস্তান আর্মি বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধ করেনি” বলে সদম্ভ মিথ্যাচার করেছে, সে মুহূর্ত থেকে এই দুই দেশের মধ্যকার সকল পর্যায়ের সবরকম সম্পর্ক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা পাকিস্তানের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য সিন্ডিকেটে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রও পাকিস্তানের এই দম্ভ ও মিথ্যাচার এবং অনধিকার চর্চাপূর্বক স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। … এরকম একটা পরিস্থিতিতে বিপিএলের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানীদের সদর্প বিচরণ আমাকে ব্যথিত করে। আমাকে লজ্জিত করে, নিন্দিত করে।

এ পর্যন্ত যে ক’টা খেলা দেখেছি, তাতে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের ছাঁপিয়ে বিদেশী ক্রিকেটারদের পারফর্মেন্স খুব একটা চোখে পড়েনি। এক সাঙ্গাকারাই যা একটু আলো টানছেন নিজের দিকে। আর মাঝে মাঝে রোবি বোপারা, মোহাম্মদ আমের বা স্যামুয়েলস – এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তথাপি অতি বিরক্তিকর ব্যাপার হচ্ছে যে, আমাদের মিডিয়া কোনো এক অজ্ঞাত কারণে (কিংবা সর্বজনজ্ঞাত পাকিপ্রেমের কারণে) কথায় কথায় পাকিস্তানী ক্রিকেটারদের বীরত্বগাথা প্রচারে পঞ্চমুখ। পাকিস্তানের কোন্ ক্রিকেটার সরাসরি হেলিকপ্টারে করে মাঠে নামলেন, কে নাকি পনের ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষ করেই মাঠে নেমে ম্যাচসেরা হলেন, কে আবার বিপিএলএর পারফর্মেন্স দিয়ে জাতীয় দলের দরজা খুললেন… এত ইনিয়ে বিনিয়ে, ফুলিয়ে-ফেনিয়ে কেন তাদের নিয়ে মাতামাতি করতে হবে? “ইগনোর” একটা খুবই দরকারি শব্দ, যেটার অর্থ আমাদের মিডিয়াগুলোতে কেউ জানেন বলে মনে হয় না। ভারতীয়দের দেখে শিখুন! যে সিরিজে তারা জেতে, সেটাতে তো বটেই, যে সিরিজ হেরে ভূত হয়ে যায়, সেটাতেও তারা প্রতিপক্ষকে কী অদ্ভূত উদাসীনতায় ইগনোর করে! আর যদি বা উল্লেখ করে, এমনভাবে করে যে খবরটা পড়ে তারা নিজেরাই সেটাকে ইগনোর করতে পারলে বাঁচে। মাঠে মুস্তাফিজকে ধাক্কা মারলো ধোনি, সেই মুস্তাফিজের কাছে নাকাল হয়ে ম্যাচ হেরে গেল ভারত, অথচ আনন্দবাজার ইয়া বড় গপ্প ফেঁদে বসলো – ম্যাচ শেষে হোটেলে ফিরে মাশরাফি নাকি মুস্তাফিজকে নিয়ে ধোনির কামরায় গেছিলেন, মুস্তাফিজকে আইপিএলে খেলানোর জন্য তদ্বির করতে! ধোনির অটোগ্রাফসহ ব্যাট চাইতে!! … পক্ষান্তরে আমাদের মিডিয়া কী করছে? মাশরাফির প্রশংসা করতে গিয়েও পাক ক্রিকেটারের রেফারেন্স টানছে। আজকের বিডিনিউজেই দেখলাম, ‘অসাধারণ নেতা’ মাশরাফিতে মুগ্ধ শোয়েব মালিক !!

আজন্ম বেনিয়া কর্পোরেট স্বার্থ বিজয়ের মাসে জাতীয় দলের অধিনায়কের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে তুলে দিয়েছে পরাজিত, দাম্ভিক মিথ্যাচারি দেশের ততোধিক দাম্ভিক এক ক্রিকেটারের হাতে। অসম্মানটা বুঝতে না পারার মতো মূর্খ আপনারা নন। তথাপি আপনারা এ নিয়ে কিছুই বলছেন না। ওহে বেকুব মিডিয়া, পাকিদের ইগনোর করতে না-ই বা শিখলেন, কোনটা ইগনোর করার নয় – সেটা তো শিখুন!