ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
মুখের ভাষার জন্য সবচেয়ে বেশি সমালোচিত সেলিব্রেটি সম্ভবত “অনন্ত জলিল”। বাংলাদেশে তো বটেই, সারা বিশ্বজুড়েই সম্ভবত রেকর্ডটা অনন্তর দখলে। আমার জানামতে, উচ্চারণের দুর্বলতার জন্য কাউকে হেয় করার রীতি বিশ্বের আর কোথাও এত প্রকটভাবে নেই।
অথচ আমি প্রায় নিয়মিত আমাদের মিডিয়ার বদৌলতে নানা পেশায় কর্মরত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের ভুলভাল বাক্যগঠনে, বিকৃত উচ্চারণে, সামঞ্জস্যহীন জগাখিঁচুড়ি ভাষায় কথা বলতে শুনি। উচ্চপদস্থ আমলা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা থেকে অনুষ্ঠান উপস্থাপক, কণ্ঠশিল্পী থেকে আইনজ্ঞ – সাবলীল ভাষায় গুছিয়ে কথা বলার দক্ষতা কারুর নেই। অথচ এমন নয় যে, বাঙালীরা জাপানীদের মতো “কথা নয়, কাজ” নীতিতে বিশ্বাসী। এমন নয় যে, কথা না বলে বলে তাদের বলার অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে বা গড়েই ওঠেনি। কথা তারা বলতেই থাকেন, অনবরত বলতে থাকেন এবং যা বলেন তা ভুল উচ্চারণে, ভুল ব্যাকরণেই বলে যান। সবচেয়ে বেশি এই কাজটা করেন মিডিয়াকর্মীরাই। তাঁদের উচ্চারণে প্রকাশক হয়ে যান পকাশক, প্রধান হয়ে যান পধান। অথচ বেচারা অনন্ত জলিল – বাঙালী জাতির ভুল উচ্চারণের ব্র্যান্ড এম্বাসাডর হয়ে বসে আছেন!
যেকোনো লাইভ রিপোর্টিংয়ে শুনবেন, স্বপ্রণোদিত প্রতিটি বাক্যে অযাচিত ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঢুকে পড়ে “কিন্তু” শব্দটি। “… এখানে কিন্তু যেমনটা আপনি জানেন, তেমনটা কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, একটু আগে কিন্তু আপনি বলছিলেন, সেটা কিন্তু আমি আবার শুনিনি, আমি কিন্তু আপনাকে বলছিলাম, আপনি কিন্তু আমারটা শুনেননি…” কিন্তু চলছেই!
আমরা যতই একটা বাকসর্বস্ব জাতিতে পরিণত হচ্ছি, ততোই আমাদের বাগ্মিতা হ্রাস পাচ্ছে। মাতৃভাষার হাজার পাঁচেক শব্দ নাকি শিশু তার মাতৃগর্ভ থেকেই শিখে আসে! আমার ধারণা, আমাদের দেশের মানুষেরা মাতৃগর্ভের ওই পাঁচ হাজারের পর মাতৃভাষার আর কোনো কিছুই শেখে না।
যেকোনো ভাষার একটি প্রমিত রীতি আছে। যেটাকে সেই ভাষার “মান-ভাষা” বলা হয়। অর্থাৎ ওই ভাষাটাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে নিয়ে এর পাশাপাশি নানান আঞ্চলিক ভাষা থাকতে পারবে, থাকবে। এক অঞ্চলের মানুষ যখন পরস্পর কথা বলবেন, তখন চাইলে তাঁরা তাঁদের আঞ্চলিক রীতিতেই কথা বলতে পারবেন, বলবেন। কিন্তু যখন এক অঞ্চলের মানুষ আরেক অঞ্চলের সাথে কথা বলবেন, তখন তাঁদের সেই মান ভাষাটি ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। ব্যাপারটাকে আরও সহজ করে বোঝানো যায় এভাবে, আমি যখন উজবেকিস্তান বা সোমালিয়ার একজন নাগরিকের সাথে কথা বলবো, তখন আমি বাংলা বললে তাঁরা সেটা বুঝবেন না, তিনি উজবেক বা সোমালীয় ভাষায় বললে আমি বুঝবো না। তাই আমাদের উভয়ের এমন একটি ভাষা বেছে নিতে হবে, যেটা আমরা উভয়ে বুঝবো। যেমন ইংরেজি। ইংরেজি যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান-ভাষা হয়ে থাকে, তো বাংলা ভাষারও একটা মান-ভাষা আছে। যে ভাষায় সংবাদপত্রে লেখা হয়। যে ভাষায় বইপত্রে লেখা হয়। যে ভাষায় আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলা হয়। সরকারি বিবৃতি দেয়া হয়। সেই ভাষাটাকে আমাদের ক’জন উচ্চশিক্ষিত মানুষ আয়ত্ব করতে পেরেছেন?
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মানে সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে সন্ধ্যায় পাড়ার মঞ্চে হিন্দী গানের সাথে ফিল্মি ড্যান্স নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মানে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক হয়ে গেছে কিংবা আমরা বিশ্বের যেকোনো ভাষাকে আমাদের মাতৃভাষা দাবী করার অধিকার পেয়ে গেছি – এমনও নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মানে বিশ্বের সকল মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দেয়ার দিন; যার যেটা মাতৃভাষা, সেই ভাষাটাকে মায়ের মমতায় আঁকড়ে থাকার, সেই ভাষার উৎকর্ষ বিধানে সচেষ্ট থাকার শপথ নেয়ার দিন।
যে ভাষাভাষীদের জাতীয় সঙ্গীতে লেখা আছে – “মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি”, মাতৃভাষা স্বকীয়তা হারালে, মাতৃভাষার সৌন্দর্য্য মলিন হলে কেন তারা নয়নজলে ভাসে না? আমাদের বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লিখে গেছেন একজন অবাঙালী – এটা জেনে সেই শৈশবেই আমার অনুভূতি ছিল লজ্জার, হতাশার, ব্যর্থতার। যদি এইভাবে ভাষা বিকৃতি চলতেই থাকে, যদি “মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা”র নামে বাংলা প্রমিত ভাষা তথা মান ভাষাটিকেই মেরে ফেলার এই প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাহলে আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে হয়তো একজন বাঙালীও বেঁচে থাকবেন না, যিনি শুদ্ধ করে বাংলা মান-ভাষাটিকে বলতে ও লিখতে জানবেন। তখন আবারও হয়তো কোনো অবাঙালীকেই উদ্যোগী হতে হবে এই ভাষাটিকে সুসংহত, সুন্দর করতে নতুন একটি ব্যাকরণ লিখার জন্য। মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের জন্য রক্ত দেয়া বিশ্বের প্রথম জাতির জন্য সেটা কতটা সম্মানজনক হবে, তা ভেবে দেখার সময় বোধ করি এসে গেছে।
সকল মাতৃভাষা টিকে থাকুক তার স্বকীয় মহিমায়।
ভাষার জন্য ভালোবাসা।