ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

মানবসভ্যতার ইতিহাস যত পুরাতন, বর্ষবরণের ইতিহাসও তাই। অর্থাৎ সভ্যতার শুরু থেকেই নতুন বছরকে বরণ করার একটা রীতি চলে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানবগোষ্ঠীর মাঝে। তবে এই বরণ কতটা হৃষ্টচিত্তে? প্রায় প্রতিটি সভ্যতায় বর্ষবরণের ইতিহাস হৃদয়-বিদারক, ভীতিকর আতঙ্কজনক।

কারণ প্রতিটি সভ্যতাতেই বর্ষবরণ প্রথার উদ্ভব ধর্মীয় আচার-প্রথা থেকে, যা মূলত পারলৌকিক শক্তি হতে উদ্ভূত ভীতির কাছে নতি স্বীকারের প্রক্রিয়া বিশেষ।

ব্যাবিলনীয় সভ্যতা

এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া বর্ষবরণের সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাস চার হাজার বছর আগে, ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের ব্যাবিলনীয় সভ্যতায়। ব্যাবিলনীয় বীজ (Babylonian Akitu) বপন উৎসবের মধ্য দিয়ে শুরু হতো এই বর্ষবরণ। নামটি বীজ বপন হলেও এই উৎসবে বীজ বপন বা কৃষিকাজের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে কৃষিনির্ভর সভ্যতা হওয়ায় এই নামটা দেয়া হয়ে থাকতে পারে।

বসন্ত বিষুবের (২০ মার্চ) ঠিক পরের চন্দ্রোদয়ের দিন হতে শুরু হতো আকিটু। এই উৎসবে অন্যান্য রীতির সাথে একটি অদ্ভূত আয়োজন ছিলো। আকিটুর ভোরে প্রভু মাডর্ক-এর মন্দিরে, ছিন্নবস্ত্রে নগ্নপায়ে হাজির হতেন সম্রাট। প্রধান পুরোহিত তাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিতেন মাডর্কের মূর্তির সামনে এবং তার দুই গালে চপেটাঘাত করতেন। সম্রাটের দুই গাল রক্তাভ হয়ে উঠলে তাকে কানে ধরে টেনে হিঁচড়ে হাজির করা হতো মন্দিরের বাইরের সিঁড়িতে, যেখানে হাজার হাজার উৎসুক নাগরিক সম্রাটের পরিণতি দেখার জন্য হাজির থাকতো।

এই চপেটাঘাত ও কানমলা খেয়ে সম্রাটের চোখে যদি অশ্রু দেখা যেতো, তাহলে ধরে নেয়া হতো, প্রভু মাডর্ক তাকে তার গত এক বছরের সকল ভুল-ত্রুটি ও পাপের জন্য ক্ষমা করেছেন এবং আরও এক বছরের জন্য সম্রাট হিসেবে অনুমোদন করেছেন।

আর তাই সম্রাট কাঁদতেন এবং সেই কান্না দেখে উল্লাসকারী প্রজাদের তিনি ঝাপসা চোখেই চিনে রাখতেন। তাদের কপালে পরবর্তীতে কী জুটতো, তা সহজেই অনুমেয়। আকিটুর স্থায়িত্ব ছিলো মোটামুটি ১২ দিন। সম্রাটসহ রাজ্যের সকল প্রজা এই ১২ দিন ছুটি কাটাতো। উৎসব উপলক্ষে অবকাশের প্রচলন পৃথিবীতে এই প্রথম।

আকিটুর পূর্বরাতে নরবলী দেওয়া হতো প্রভূ মাডর্ককে খুশি করতে। কারণ মাডর্ক সন্তুষ্ট না থাকলে সম্রাটের বিগত বছরের কর্মকাণ্ড অনুমোদন হবে না। এ যেন ঠিক বর্তমানকালের ঘুষ দিয়ে অডিট রিপোর্ট পাশ করানোর মতোই কারবার!

রোমান সভ্যতা

রোমান সভ্যতায় দুই চেহারাবিশিষ্ট দেবী জেনাসের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হতো। জেনাসের একটি চেহারার নাম পরিবর্তন, অপরটির নাম সূচনা।

বলা হয়, জেনাস তার পেছনে ফিরিয়ে রাখা মুখে বিদায় জানান পুরাতন বছরটিকে এবং সামনে তাকানো চেহারায় বরণ করেন নতুন বছরকে। রোমানরা বর্ষবরণের দিনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতো, দিনের কিছু সময়ের জন্য হলেও। তদের বিশ্বাস ছিলো, বছরের প্রথম দিন ছুটি কাটানোর মানে বাকি বছরটা অলসতায় কাটানো। এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে রোমান সম্রাটগণ পরবর্তীতে শ্রমজীবী মানুষদের বছরের প্রথম দিন অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করতো, যাতে বছরের বাকি দিনগুলো রাজ্যে সমৃদ্ধি বজায় থাকে।

আজকের খ্রিষ্টিয় নববর্ষ রোমান সভ্যতায় পালিত নববর্ষেরই বর্তমান ধারাবাহিকতা।

মিশরীয় সভ্যতা

মিশর নীলনদের দান, মিশরীয় সভ্যতাও নীলনদেরই স্থাপনা। মিশরীয়রা বর্ষবরণ করতো নীল দেবতাকে সন্তুষ্ট রাখতে, যাতে নদে বন্যা আসে, দুকূল প্লাবিত করে মরুসভ্যতাকে উর্বর করে। হায়, তারা তখনও পর্যন্ত সেচ-ব্যবস্থা আবিষ্কার করতে পারেনি বিধায় যেচে পড়ে বন্যাকে স্বাগত জানাতো, রীতিমতো উৎসব করে, নরবলী দিয়ে।

প্রায় ৭০ দিন অদৃশ্য থাকার পর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র সাইরাস মধ্য জুলাইয়ের যে রাতে উদয় হতো, সেই রাতে মিশরীয়রা সমবেত হতো নীলনদের তীরে। ৭০ দিনের উপোষ নক্ষত্রের প্রতি ৭০ জন কুমারী বালিকাকে বলী দিয়ে নীলনদকে স্ফিত হতে অনুরোধ করা হতো। সেই বালিকাদের আতঙ্কিত হাহাকারে নীল দেবতার প্রাণ কেঁদে উঠতো, দুকূল ছাপানো বান ডাকতো নদে। সেই বানের জলেই তিলে তিলে গড়ে উঠেছে আজকের মিশরীয় সভ্যতা।

চাইনিজ নিউ ইয়ার

প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত টিকে যাওয়া একমাত্র বর্ষবরণ উৎসব। তিন হাজার বছর আগে, শাং রাজবংশে প্রবর্তিত এই উৎসবকে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বর্ষবরণ উৎসব বলা হয়। হবে নাই বা কেন? দেড়শো কোটি মানুষ একসাথে যে উৎসব পালন করে, তার সাথে পাল্লা দেবে সাধ্য কার? তবে বর্তমানকালের এই চোখ ধাঁধানো রঙ আর আলোর উৎসবের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ইতিহাস।

প্রচলিত চীনা উপকথা অনুসারে, তিন হাজার বছর আগে নিয়ান (Nian) নামে এক রক্তপিপাসু দানো কিংবা ড্রাগন ছিলো, যার আক্রমণে বছরে একবার অন্তত একটা গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। চাইনিজ নিয়ান শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ বছর বা সময়। অর্থাৎ প্রতি বছর নিয়ানের আক্রমণে গ্রামশুদ্ধ মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে প্রথমে নিয়ানের উদ্দেশ্যে নরবলী দেয়া শুরু হলো। এই প্রথা চলে বেশ কয়েক বছর। তাতেও যখন কাজ হচ্ছে না, তখন শুরু হলো মশাল জ্বালানো, লাল উজ্জ্বল আলোর লণ্ঠন জ্বালিয়ে বছরের ওই সময়টা গ্রামগুলো সব আলোকিত করে রাখা, যাতে রাতের আঁধারে নিয়ান আক্রমণ করতে না পারে। সেই লণ্ঠন জ্বালানোর উৎসবই কালক্রমে আজকের চাইনিজ নিউ ইয়ার।

নওরোজ

পারস্য সভ্যতার বর্ষবরণ উৎসব নওরোজও টিকে আছে আজকের তারিখ পর্যন্ত। নওরোজ শব্দের অর্থ নতুন দিন। প্রামাণ্য ইতিহাসে দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দের আগে নওরোজ উদযাপনের নজির না থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ বলেন, নওরোজের সূচনা হয়েছিলো খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দিতে, আকিমিনীয় সাম্রাজ্যে। এমনকি ৩৩৩ খ্রিষ্টপূর্বে আলেকজান্ডার দি গ্রেট যখন পারস্য জয় করলেন, তখনও নওরোজ হতো, যা নিয়ে আলেকজান্ডারের উদ্ধৃতিও পাওয়া যায়।

সূচনা থেকেই নওরোজ সরকারি ছুটির দিন ছিলো। এই ছুটি অনুমোদন করতে আলেকজান্ডারও বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকি সপ্তম শতাব্দিতে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরও নওরোজ টিকে গেছে, আজও টিকে আছে। বলা হয়ে থাকে, নওরোজের কিছু প্রথা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যেমন শস্যবীজের উপাসনা, ডিম রঙ করে ঘর সাজানো, এমনকি ঘরে তৈরি মদ্যপান।

শরিয়া আইনের কট্টর পৃষ্ঠপোষক হওয়ার পরও এসব বিলুপ্ত করতে পারেননি আয়াতাল্লাহ্ খামেনি, রাফসানজানি, এবং সাম্প্রতিককালের আহমাদিনেজাদ। আহমাদিনেজাদ তো বলেই ফেললেন, এই ভূমিতে ইসলামের চেয়ে পূরাতন নওরোজের ঐতিহ্য। তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে নওরোজ বাতিল করতে গেলে বা এর রীতিরেওয়াজে পরিশোধন আনতে গেলে তা ইসলামের জন্যই হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। আর ইসলাম জোর খাটায় না – এটাই ইসলামের সৌন্দর্য।

বাংলা নববর্ষ
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে বাংলা সাল গণনার ইতিহাস জড়িত। ভারতবর্ষে ইসলামী শাসন প্রবর্তনের পর থেকে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার হয়ে আসছিলো। এর পূর্বে সংস্কৃত বর্ষপঞ্জি থাকলেও মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় হিজরি বর্ষপঞ্জি টিকে যায়। কিন্তু চান্দ্র বর্ষ হিসেবে হিজরি ক্যালেন্ডার ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে গণনা হতো, যাতে করে সৌরবর্ষের হিসাবে গোলমাল বেধে যেত।

খাজনা আদায় যেহেতু ফসল ঘরে ওঠার সাথে সম্পর্কিত, সেহেতু অসময়ে নববর্ষ এলে প্রজারা খাজনা দিতে পারতো না। এ নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিরাট অসন্তোষ দেখা দিতো। মুঘল সম্রাট আকবর দি গ্রেট এই সমস্যার সমাধান করেন বলে সবচেয়ে জনপ্রিয় মতটি প্রচলিত। সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন।

ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরি সালের মুহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

এই বিশাল বঙ্গভারতের এত এত রাজ্য ও এত এত ভাষাভাষী প্রজা থাকতে বাঙালিদের জন্যই কেন বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন সম্রাট আকবর? কারণটা সহজেই অনুমেয়, মুঘল সাম্রাজ্যের পর্বতসম রাজকোষের অধিকাংশই পূর্ণ হতো ভারতের সবচেয়ে উর্বর অংশ ভাটি অঞ্চলের বঙ্গভূমির খাজনা থেকে। তাই বঙ্গভূমির মানুষের সুবিধাটাই সম্রাটকে আগে দেখতে হবে – এটাই তো স্বাভাবিক।

বঙ্গাব্দের প্রচলন সংক্রান্ত ভিন্ন একটি মত বলছে, প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন। আধুনিক বঙ্গ, বিহার এলাকা তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ অনুমান করা হয় যে, জুলীয় বর্ষপঞ্জির বৃহস্পতিবার ১৮ মার্চ ৫৯৪ এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির শনিবার ২০ মার্চ ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। তবে অপর মতটিতে সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের দিনকে স্মরণীয় করে রাখার মতো যে ঐতিহাসিক প্রমাণ বর্তমান, এই মতটিতে ১৪ মার্চ বা ২০ মার্চের পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এ তো গেল বঙ্গাব্দের ইতিহাস। কিন্তু বঙ্গাব্দের প্রচলনের সাথে বাংলা বর্ষবরণের ইতিহাস একটু আলাদা। মুঘল আমল থেকেই বছরের প্রথম দিন ছিলো হালখাতা, অর্থাৎ বিগত বছরের খাজনা পরিশোধের শেষ দিন ও নতুন বছরের খাতা খোলার দিন। যদিও খাজনা পরিশোধ করা কোনো কালেই প্রজাদের জন্য খুব সুখকর অভিজ্ঞতা ছিলো না। তারপরও খাজনা দিতে পারুক বা না পারুক, সেরেস্তাদারের কুঠিতে হাজির হতে হতো সব প্রজাকে।

খাজনা দিতে পারলে তাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো, না পারলে চাবুকের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হতে হতো। এই রীতি প্রচলিত ছিলো ইংরেজ আমল পর্যন্ত। তো হালখাতা উপলক্ষে এই জনসমাগমকে কেন্দ্র করেই প্রথম মেলার উৎপত্তি। সেই মেলাই টিকে আছে আজও ঐতিহাসিক সব নাম নিয়ে।  বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবচেয়ে পুরাতন ঐতিহাসিক বৈশাখী মেলাগুলোর সবকটিই অনুষ্ঠিত হয় কোনো না কোনো প্রাচীন সেরেস্তা বা কুঠিবাড়ির পাশে। অর্থ্যাৎ বাঙালি জীবনে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিলো।

এই আতঙ্ক দূর করতেই  জমিদার কবি রবীন্দ্রনাথ বর্ষবরণের বর্তমান রূপটির প্রবর্তন করেন। তরুণ বয়স থেকেই তিনি দেখতেন বছরের প্রথমদিন তাদের জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কাচারি ভরে যেত দুস্থ-অভূক্ত, শীর্ণকায় প্রজাদের আতঙ্কিত শঙ্কিত পদভারে। এরা সবাই এসেছে খাজনা দিতে। হয় অর্থ বা শস্যমূল্যে, নয়তো চাবুকের আঘাতে খাজনা দেবে তারা।

তরুণ রবিকবি জমিদারীর এই অমানবিক দিকটি দেখে যারপরনাই ব্যথিত হয়েছিলেন। তাই জমিদারির দায়িত্বভার যখন থেকে নিজের হাতে পান, তখন থেকেই তিনি বর্ষবরণের আনন্দ-আয়োজন করেন। পহেলা বৈশাখের ভোরের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নৃত্য-গীত-বাদ্যের আবাহনে নতুন বছর যেন আতঙ্কের সাথে নয়, আনন্দের উপলক্ষ হয়ে বাঙালির ঘরে আসে, এটাই ছিলো তার অভিপ্রায়। বলাই বাহুল্য, খাজনা আদায়কে তিনি গৌণ উপলক্ষে পরিণত করে বর্ষবরণকেই লক্ষ্য বানান।

ঠাকুরবাড়ির অনুকরণে বাংলাদেশে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ শুরু করে ছায়ানট, স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে। সেই উৎসবেই স্বাধীনতার পর যোগ হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং আরও নানান আয়োজন। খুবই অবাক ব্যাপার হলো, রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত বর্ষবরণের রীতিটিকে বাংলাদেশ প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে আমাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে ফেললেও, পশ্চিমবঙ্গে তা খুব একটা উজ্জ্বল নয়।

পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতায় বর্ষবরণ উপলক্ষে মদ্যপানের নজির পাওয়া যায়। মিশরীয় সভ্যতায় বর্ষবরণে মদ্যপান বাধ্যতামূলক ছিলো, বাড়াবাড়ি ছিলো অন্য সভ্যতাগুলোতেও। এমনকি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নওরোজে অদ্যাবধি মদ্যপান প্রচলিত। খ্রিষ্টীয় বর্ষবরণের  থার্টি ফার্স্ট নাইটে রয়েছে মদ্যপানের প্রথা। বঙ্গাব্দের বর্ষবরণেই কেবল মদ্যপানের নজির পাওয়া যায় না। কারণটাও সহজেই অনুমেয়। বাংলা নববর্ষের আয়োজনের সবটাই হয় প্রকাশ্য দিবালোকে, প্রখর সূর্যালোকে, খোলা রাস্তায়।

ব্রাজিলের কার্নিভাল আর চীনের নিউ ইয়ারকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন শোভাযাত্রা। তবে এ দুটোই অনুষ্ঠিত হয় রাতে। বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে রঙিন শোভাযাত্রা, যা অনুষ্ঠিত হয় দিনের আলোয়, প্রখর সূর্যালোকের নিচে।

দিনদুপুরে এত বড় একটা শোভাযাত্রাকে বর্ণাঢ্য রঙ্গে সাজানো খুব সহজ ব্যাপার নয়। আমি নিজেই একাধিকবার নববর্ষের শোভাযাত্রায় বেশ কয়েকজন ইয়োরোপীয় পর্যটককে দেখেছি, যারা ঢাকায় এসেছেন শুধুমাত্র এই শোভাযাত্রা দেখেতে। তাদের সীমাহীন কৌতুহল, কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি (রিহার্সাল) ছাড়া এত বড় একটা ‘প্রসেশন’ এত ‘কালারফুল’ ও এত সুশৃঙ্খলভাবে কী করে ‘অর্গানাইজ’ করা গেল? এত তীব্র আলোর নিচে এত উজ্জ্বল প্রসেশন কী করেই বা সাজানো গেল।

মন্তব্য ০ পঠিত