ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

বাংলাদেশ ছোট্ট আর স্বল্প আয়ের এক মধ্যবিত্ত দেশ। জন্ম থেকেই যুদ্ধ করে যাচ্ছে হাজার প্রাকৃতিক আর মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে। এতো সবের পরও এ দেশ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার ঊর্বর ভূমি। এখানে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আনপ্যারালাল উচ্চতায় আসীন। সাকিব, মাশরাফি, মুসফিক, রুবেল, রিয়াদ, তাসকিনদের নাম এখন সেই টেকনাফের অজপল্লি থেকে তেতুলিয়ার শেষ মাথা অবধি।

এক সময়ে এ দেশের বাবারা স্বপ্ন দেখতেন, তার সন্তান বড় হয়ে একদিন “বড় ক্রিকেটার” হবেন। আজ শুধু বাবাদের কাছে নয়, একেবারে অন্দর মহলে, মায়েদের কাছেও পৌছে গেছে ক্রিকেট। এ দেশের মায়েরাও আজ স্বপ্নের জাল বুনেন ছেলেকে নিয়ে। তবে একজন সৌরভ-সচিন অথবা ওয়াকার-ওয়াসিম নয় বরং বড় হয়ে একজন সাকিব আল হাসান কিংবা মুশফিক হবে, এই ভাবনায়। 

এখানে ক্রিকেটের জন্য পেট্রল বোমা বন্ধ হয়, হরতাল শিথিল হয়, অবরোধ প্রত্যাহৃত হয়, যানজট উঠে যায়, অফিস কাছারী ছুটি হয়ে যায়, কোলের শিশুরা স্তনপান ভুলে যায় আর মায়েরাও ভুলে যায় “পাখি” কিনবা “দিদি নাম্বার ওয়ান” দেখা।এখানে কাঠ ফাটা রোদ্দুর থেকে ঝুম বৃষ্টি বা দিন এনে দিন খাওয়া গেরস্তের শিশুটি থেকে ধনীর দুলাল, সর্বত্রই ক্রিকেট। মোট কথা ক্রিকেট এখানে এক “ম্যানিয়া”।

দেশের মানুষের মধ্যে ক্রিকেট সম্পর্কে উন্মাদনাও অন্যান্য খেলাধুলার চাইতে অনেক বেশি। এর কারণ বহুবিধ হলেও প্রধানত খেলাটির শ্রেষ্ঠ আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহনই মূল। ভদ্রজনোচিত খেলা, খেলোয়ারদের চারিত্রিক আর সৌর্য্যের সাতন্ত্র্যতাও জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। মাশরাফি, মুসফিক, সাকিবরা জানেন কী ভালোবাসায় এদেশের মানুষের হৃদয়ের কতটা গভীরে তাদের অবস্থান!
বাংলাদেশ ক্রিকেট টেস্ট খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে খুব বেশি দিন নয়। বর্তমান আওয়ামী সরকার ছিয়ানব্বই-দুহাজার এক টার্মে যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনকার সময়ে। তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ছিলেন জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী। বলা প্রাসঙ্গিক, সেসময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পিছনে জোড়ালো ভুমিকা রেখেছিলেন তত্কালীন আইসিসি প্রেসিডেন্ট; যিনি বর্তমানে বিসিসিআই বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট শ্রী জগমোহন ডালমিয়া। ডালমিয়ার সাথে আমাদের বোর্ডের বন্ধুত্ত্ব এখনও অটুট আছে, আশাকরি ভবিষ্যতেও এই বন্ধুত্ত্ব অব্যাহতভাবে অটুট থাকবে এবং আরও নিবিড় হবে।
ক্রিকেট মূলত মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তির খেলা হলেও আজ এটি একটি বড় ব্যবসায়িক পন্য। ক্রিকেট মানেই আজ টাকা আর টাকা। ক্রিকেটার মানেই টাকা উতপাদনের ম্যাশিন। আর যেখানে অর্থের দাপট বেশি, সেখানে মানবিকতা, ভালোবাসা মূল্যহীন হয়ে পরে। মানুষের আবেগের লেনেদেনও গণনা করা হয় অর্থের এককে। সন্দেহ নেই, এটা ক্রিকেটের এক খারাপ দিক। এ ধারা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে তাহলে ক্রিকেট তার জনপ্রিয়তা হারাবে, এতেও কোনো সন্দেহ নেই।
সুখের কথা হলো এই যে, বাংলাদেশে ক্রিকেট এখনো সেভাবে ব্যবসার বড় পন্য হয়ে উঠেনি, যতটা উঠেছে ভারত পাকিস্তান সহ ক্রিকেটের পরাশক্তি খ্যাত অন্যান্য দেশে।
ফুটবলের সৌন্দর্য্য যেমন ইওরোপে তেমনি ক্রিকেটের নান্দনিকতা এশিয়ায়- এ কথা বলা বোধ হয় অত্যুক্তি নয়। আবার এ কথাও সত্যি এই এশিয়াই ক্রিকেটের বুকে ছুড়ি মেরেছে। ক্রিকেটের সব থেকে বড় কলঙ্ক উন্মোচিত হয়েছে ভারত আর পাকিস্তানে। ক্রিকেটকে পুঁজি করে জুয়ারিদের টোপে পড়ে খেলোয়ারেরা হয়েছে নীতিহীন, বিবেকহীন। ধোকা দিয়েছে ক্রিকেটের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে। নিসন্দেহে এটা চরম নিন্দনীয়।
ক্রিকেট এখানে বিকশিত হয়েছে আপন চেষ্টায়। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা যা ক্রিকেটে এসেছে, তা নেহাতই সামান্য। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা থেকে যা পাওয়া গেছে, তাকে সাহায্য বললে নিশ্চয়ই “সাহায্য” শব্দটা তার অর্থ হারাবে। বরং বলা ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার দাদাগিরিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেকটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আজ এই বাহানা তো কাল সেই বাহানা! এই-সেই করে করে কিভাবে বাংলাদেশকে আর বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অবদমন করে রাখা যায়, সেই চেষ্টায় তাদের অন্ত নেই।
এতসব ষরযন্ত্র, প্রতিকুলতা পিছনে ফেলে নিজ নিজ চেষ্টায় বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যখন বিশ্বক্রিকেটের আত্মস্বীকৃত দাদাদের একের পর এক ঘায়েল করে বীর দর্পে এগিয়ে চলে আপন গতিতে, আপন লক্ষ্যে, ইংল্যান্ড আর পাকিস্তানের মতো বিশ্বসেরা দলগুলোর ভয়ঙ্কর সব বোলারদের বলে অসাধারণ সব স্ট্রোক খেলে চার ছয় মেরে রানের মাইলফলক স্পর্স করে রেকর্ড গড়ে আমাদের ব্যাটসম্যানরা আর তাবর তাবর ব্যাটসম্যানদের কাছে আমাদের বোলাররা হয়ে উঠে ত্রাসের কারণ, তখন চোখে আনন্দাশ্রুর বান আসে আর সত্যিই ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়; এমন এক অনুপম আনন্দে বুকের ছাতিটা বড় হয়ে যায় !
bangladesh c team