ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গণমাধ্যমসহ সামাজিক সবগুলো যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচিত হচ্ছে সাম্প্রতিক কালে পুলিশের বেশ কিছু কর্মকান্ড। পুলিশ আর পুলিশের আচরণ এখন সমালোচনার মস্তবড় বিষয়। কেউ ছাড়ছেন না পুলিশকে, এমনকি কাল যারা পুলিশকে মাথায় তুলে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, এমনকি যারা নিজেকে কিংবা নিজের প্রিয় সন্তানটিকে পুলিশ হিসেবে পরিচিত করাতে ঘুষ বাবদ আজ সকালেও টাকা জমিয়েছেন, যারা মেয়েকে ‘টাকার ক্ষনি’ পুলিশ জামাইয়ের শশুর ভাবতে গর্ব অনুভব করেন, তারাও আজ সমালোচনায় মুখর। সবাই মিলে তুলোধোনা করছে পুলিশকে, পুলিশ বাহিনীকে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে  আর রক্ষে নেই, এইবারে পুলিশের একদম দফারফা !

 

pulish 1

 

একটা গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। গল্পটা আসলে গল্প নয়, এটি একটি “সত্য গল্প” গত শতাব্দীর শেষ ভাগের কথা, সাতাশি আটাশি হবে। 

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে শিল্পী আর ছেলে শুভ’র বাবা কৃষি বিভাগের “মাঠ কর্মী”, মা প্রাইমারি “স্কুল শিক্ষিকা”। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী শিল্পী পড়াশুনায় বেশ ভালো, মা-বাবা, মামা-মাসিসহ স্বজনদের সবার কাছেই বড় অদূরে মেয়ে। শুভ ক্লাস সেভেনের ছাত্র। শিক্ষিত পরিবার। আত্মীয় স্বজনও সবাই মোটামুটি শিক্ষিত আর আধুনিক মননের। দুই কাকার একজন গ্রাম্য ডাক্তার, বেশ হাত যশ আছে, অন্যজন ব্যাঙ্কে কর্মরত। একটি মাত্র মামা, সে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, ডিভি বিজয়ী। প্রবাসী মামাটি সময়ে সময়ে যখন দেশে আসেন, স্নেহ ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে সবার জন্যই কিছু না কিছু কিনে কেটে আনেন, তবে ভাগ্নিটা আলাদা গুরুত্ব পায় মামার স্নেহের কাছে। তার জন্য একটু বেশিই থাকে সব সময়ে। ভাগ্নির পরিবারে মামা-মাসিদের অবস্থান বেশ শক্ত, তা সে নিকটবর্তী হওয়ার কারণেই হোক কিম্বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক। কোনো বিশেষ কিছু আয়োজন হলেই মামাবাড়ির সবার কাছে সবার পায় ভাগ্নির পরিবার। আর ভাগ্নি বাড়ির সবার কাছেও ঠিক তেমনই, একেবারে মামাবাড়ি অন্তপ্রাণ।

 

শিল্পী বড় হয়েছে। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে তুমুল আলোচনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে ‘মেয়ে বিয়ে দিতে হবে, ভালো পাত্র চাই’। যথারীতি আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলেমিশে পাত্র খুঁজে বার করা! সেই মাধ্যমিক থেকেই শুরু হয়েছে। মানানসই পাত্র কী আর অহরহ মিলে? সর্বাঙ্গসুন্দর বলতে যা বোঝায়, তা তো হয়ই না, উল্টো এদিক ভালো তো ওদিক মিলে না, আবার ওদিক ঠিক হলে আরেক দিক বেমানান !

 

বিভিন্ন মতামত থাকা সত্ত্বেও যে পাত্র শিল্পীর বাবা-কাকা আর পিসি মিলে নির্বাচন করেছেন, সে সুঠামদেহী বলতেই হবে, তবে বৃদ্ধ দিদা-দাদু আর ঠাম্মার ঘোর আপত্তি। পাত্র তাদের কাছে পছন্দের নয়। শিল্পীর পছন্দাপছন্দ বিশেষ বিবেচ্য নয়, তাছাড়া ‘ছেলেমানুষ’ শিল্পী নিশ্চয়ই বাবা-কাকাদের থেকে বাস্তবতা বোধে কোনভাবেই বেশি ‘পরিপক্ক’ নয়, মৃদু আপত্তি আছে শিল্পীর মা’রও। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে, গোটা চারেক সম্বন্ধের মধ্য থেকে ঠিকুজি-কুষ্ঠি যাচাই করে, যে পাত্রটি নির্বাচন করা হলো সে পাত্র অন্য সবার থেকে ভালো। পুলিশে চাকরি করে, সংসারের জোয়ালটা তার কাঁধে নিতে কোনো দুর্বলতা থাকবে না। লম্বা গড়নের ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের ফর্সা চেহারার পাত্র। বিয়ের জন্য দিনও ঠিক করা হয়ে গেছে মনে মনে। তখন ফাল্গুন মাস, আসছে বৈশাখে শিল্পীর মামা দেশে এলেই তাকে নিয়ে পাত্রকে আশির্বাদ করতে যাওয়া হবে। তারপরের প্রথম শুভক্ষনেই বিয়ের দিন ধার্য্য করা হবে। এর মধ্যে শিল্পীর পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে। বিয়ের আয়োজন চলছে, বাড়িময় একটা সাজসাজ সারা পরে গেছে। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা! দাদা -দিদাও যাকে যেভাবে পারছে কাজে লাগাচ্ছে। কেউ রাস্তায় মাটি ফেলছে, কেউ কাঠ চেরাই করছে, কেউবা ঝোপ-ঝাড় গুলো পরিচ্ছন্ন করছে! একবারে হুলস্থুল কান্ড যাকে বলে!

 

সে সময়ের বাংলাদেশ এভাবে “ডিজিটাল” ছিলনা। হোয়াটস আপ, ভাইবার, উইচ্যাট তো দুরের কথা, গ্রামীন এই পরিবারের কেউ স্কাইপে ইন্টারনেটেরও নাম শুনেনি। মোবাইল আরও পরের কথা। মুহুর্তের মধ্যে আমেরিকাতে  “হ্যালো” করে আদ্যপান্ত জানানো! সে সময়ে সম্ভব ছিলনা। যোগাযোগের একমাত্র সহজ মাধ্যম ছিল চিঠি। আর এর উপরে জরুরি ক্ষেত্রে টেলিগ্রাম করা যেত, যা বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেউ করতেন না। ছেলের সব নাড়ি নক্ষত্র মামাকে পই পই করে জানানো বিলকুল অসম্ভব।

 

ওদিকে ছেলে জ্যেষ্ঠ, তাই ‘জৈষ্ঠ্য মাসে বিয়ে হবেনা’ বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছে পাত্রপক্ষ।  আর বৈশাখে বিয়ে না হলে আষাঢ় অবধি অপেক্ষা করতে হবে, পাত্রীপক্ষের তারাহুরা একটু বেশিই। মামা কিংশুক কর্মকার’কে চিঠি যথাসময়ে পাঠানো হয়েছে বটে, তবে মামা আসতে আসতে সেই মধ্য পেরিয়ে বৈশাখের এখন অন্তিম সময়। তার উপর এখনও ছেলেকে আশীর্বাদ করাই বাকি, মামা ছাড়া আশির্বাদ হবেনা, তাই মামার অপেক্ষা। অপেক্ষা তো অপেক্ষা, দিন ফুড়িয়ে যায় পথ চেয়ে চেয়ে, মামার কোনো দেখা নেই। বৈশাখের এক একটা দিন যায় আর পাত্রীর পরিবারে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ আপনি দ্বিগুণ হয়।  

 

অবশেষে মামা এলেন। ঢাকা থেকে লঞ্চে করে গিয়ে নেমেই সোজা বোনের বাড়িতে, পাত্রকে আশির্বাদে যাবেন। শুক্রবার দিন, দুপুর বেলা। খাওয়া-দাওয়া যাদের শেষ, তারা সবাই আলোচনায় বসলেন। কে কে যাবেন। কোথা থেকে কিভাবে একত্রিত হবেন, এসব বিষয়ে আলোচনা। এর এটা ওর ওটা, মামা সবার কথা শুনছেন আর হাঁক দিয়ে দিয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন, ‘তোমাকে এটা করতে হবে, তোমাকে ওটা’। মামা শুনছেন পাত্রের গুণগান, দেখতে সুন্দর, শিল্পীর সাথে মানাবে ভালো, বাবা থানার বড় দারোগা, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, হীরের টুকরা, সামনে সুন্দর ভবিষ্যত, পুলিশে চাকরি করে, ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাত মামা গম্ভীর মুখে ডাকলেন, “রাজন”

শিল্পীর বাবা রাজনের তখনও খাওয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। তারাহুরা করে হাত ধুঁয়ে এসে হাজির, ‘হ্যা দাদা, বলেন’ 

– এ সম্বন্ধ হবে না, তুমি ঘটককে ডাক। শিল্পীর জন্য তুমি অন্য পাত্র খোঁজো। আমি বরং সারাজীবন আমার ভাগ্নির খরচ বহন করবো, তবু এ সম্বন্ধ হবে না, আমি বলচি। 

এই পরিবারের কোনো সদস্যই শিল্পীর মামাকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বার বিবেচনা করার অনুরোধ করতে সাহস পান নি। উপরন্তু পাত্র নির্বাচনে  চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যারা দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলেন, তারাও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন শেষ সময়ে। শুরু হয়ে গিয়েছিল বাড়িময় পিন পতনের নিরবতা। তাতক্ষনিকভাবে ঘটককে ডেকে পাঠিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো পাত্র সম্পর্কে পাত্রীর মামার অবস্থান। সম্বন্ধ আর এগুলো না। 

 

pulish 2
সে সময়কার প্রেক্ষাপটে সম্বন্ধ ভাঙ্গার পিছনে শিল্পীর মামার যে যুক্তি ছিল, আজ তা হাস্যকর আর গল্পই বটে। তবে সে যুক্তি তখন একেবারেই অকাট্য ছিল।

 

সে আমলে পুলিশ পরিচিত ছিল মানবতা-মানবিকতা বিহীন, মায়ামমতাহীন, হুকুমের দাস, বদমেজাজি-চরিত্রহীন আর প্রায় অশিক্ষিত ‘একশ্রেনীর সরকারী কর্মচারী’। সময়ের পরিবর্তনে আজ সমাজে পুলিশ অনেক সম্মান আর ক্ষমতাশালী একটা চাকরি।হা তা তো হবেই! যার হাতে সবসময়ে একে-৪৭ রাইফেল থাকে সে ক্ষমতাশালী হবে না তো দেড় টাকা দামের কলমওয়ালা বেশি ক্ষমতাবান হবে ! তার উপর পুলিশী চাকরি বেশ উপার্জনের চাকরিও বটে, সন্দেহ নেই। আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে লতায় পাতায় জড়ানো কেউ পুলিশে চাকুরী করলে তার পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করি, কিন্তু আমরা একবারও ভাবিনা, পুলিশের বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন কী করে হবে । ভাবতে চেষ্টাও করিনা, একসময়ের ‘হাফ পায়জামাওয়ালা পুলিশ’ আজ ‘ফুল পায়জামাওয়ালা পুলিশ’ হয়েছে ঠিকই, তবে তাদের মনের জানালার খিলটাতে ঔপনিবেশিক আমলের পর আর হাতুড়ির পিটুনি কেউই দিতে পারেনি।

গৌতম হালদার