ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

রাজিনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, রাজনীতিবিদরা কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো যা কিছুই করেন, সবই দেশ আর জনগনের সুবিধার কথা মাথায় নিয়েই করেন, আমরা জানি। আমরা আরো জানি, রাজনীতিবিদরা যুগের বিশ্বস্ত ঘর করা নিজের বিবি মুহুর্তে পর করে দেন দেশের প্রয়োজনে। আবার ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’ আনেন, তাও জনগনের কল্যানে। মোট কথা জনগণঅন্তপ্রাণ হলেন রাজনীতিবিদরা। আর দেশ আর জনগণের হিতার্থে যা যা করা দরকার তারা সব কিছুই করেন। করতে চেষ্টা করেন। করতে পারেন।

medam
তবে একটু ভিন্নভাবে আর বাস্তবতার নিরিখে বললে বলতে হয়, এই বঙ্গদেশের রাজনীতিবিদরা প্রকৃতিগত দিক দিয়ে অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদদের অনেক বেশি ভিন্ন। এখানকার নেতারা “জনগনের কল্যানে’ তারা শুধু নিজের জীবন উত্স্বর্গ করা ছাড়া বাকি ‘সব জনতার’ জীবন কেড়ে নিতেও কুন্ঠা বোধ করেন না। আর এখানে রাজনীতিবিদদের পদ-পদবি নির্ধারিত হয়, রাজনৈতিক কৌশলের মূল্যায়নে নয়, বরং ধামাধরা মনোবৃত্তি, বাচালতা, হিংস্রতা আর পৈত্রিক পরিচয়- তা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক- যেভাবেই হোক না কেন, তার বিবেচনায়। যারা এগুলো করতে সর্বাধিক দক্ষতার পরিচয় দিবেন, আমাদের দেশে তারাই হবেন ত্যাগী, দেশ দরদী রাজনীতিবিদ, তরতর করে উঠতে থাকবেন উপরের দিকে, সন্দেহ নেই।
এবারে এই প্যাঁচাল থাক, একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক । দেশে এখন একজন মান্যবর অতিথি এসেছেন। তিনি শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। সংক্ষেপে ‘নমো’ নামেও সুপরিচিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ব্যক্তি হিসেবে নমোজি নিজেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক ভিন্নতর উচ্চতা। ভাবনার সুযোগ নেই, তিনি একজন অনুসরণীয় আর অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাইতো তার অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় সফর হয় ‘প্রটোকল ভাঙ্গার সফর’ আর বিশ্বময় তিনি হয়ে উঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বহুল প্রত্যাশিত নমোজি’র এই সফর হাজারো কারণে অনেক বেশি তাত্পর্য বহন করে। তাত্পর্য্য এই কারণে নয়, যে, ভারত সর্ববৃহত গণতান্ত্রিক দেশ, তিনি আমাদের সর্ববৃহত প্রতিবেশী দেশের প্রধামন্ত্রী, তাই। বরং তাত্পর্য্য এই কারণে যে, তার সফরের পূর্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ও তার দলের অবস্থান-পরিবর্তিত অবস্থান। দীর্ঘ দিনের ছিটমহল আর ছিমহল অধিবাসীদের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান সম্ভাবনা, নানান রকম দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তির সম্ভাবনার কারণে। আরো অনেক কারণে।

নমোজি’র সফর তাত্পর্য্যপূর্ণ আরও একটি কারণে, সেটি হলো এই সফরে মোদিজি’র কাছে উপর্যুপরি অনুরোধ করার পরও বিএনপি নেত্রীকে সাক্ষাত করার সুযোগ দেবেন কিনা, সেটি নিয়ে চলছে দুদেশেরই অভ্যন্তরে বিশেষ চাপান-উতোর, তাই ।

সর্বশেষ বিএনপি শাসন আমলে, অবশ্য শাসন আমল না বলে সেটাকে “শোষণ আমল” বলাই ভালো, সে সময়ের সরকার ভারত বিরোধী অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে, আর উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ভুইফোঁড় সংগঠনগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে গিয়ে নিজের পায়ে কুড়াল মারতেও দ্বিধা করেনি। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ সেই নীতি অবলম্বন করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ হয়ে পড়েছিল চরমভাবে উপেক্ষিত। ব্যক্তি দাউদ ইব্রাহিম থেকে শুরু করে তামাম বিশ্বের ভারত বিরোধী রাষ্ট্র আর সংগঠন গুলোর অভয়ারন্যে পরিনত হয়েছিল দেশ। বাংলাদেশ হয়ে পরেছিল জঙ্গিবাদ আর বিচ্ছিন্নতাবাদের আস্তানা আর অস্ত্র পরিবহনের করিডোর হিসেবে।। সরকারী প্রচ্ছন্ন মদতের সুযোগ নিয়ে সারাদেশে মৌলবাদী শক্তিগুলো জেঁকে বসেছিল। প্রকাশ্যে, দিনে দুপুরে বোমা ফুটতো খই ফোটার মতো।

সময়ের পরিক্রমায় বিএনপি আজ শুধু মাঠের বাইরেই নয়, একগুয়েমি, লোভ আর অতিআত্মবিশ্বাস দলটিকে মাঠের দর্শক গ্যালারির আসনটিও কেড়ে নিয়েছে। তাই যতই মরিয়া চেষ্টা করুক না কেন, দেশের মানুষ আজ আগের থেকে অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন হয়েছে, মানুষ এখন আর শুধু কথার গালগল্প শুনতে পছন্দ করেন না। মানুষ চায় কাজ, চায় উন্নয়ন। দেশ ছোট হলেও নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের সুনাম ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব, যেটা বর্তমান সরকার বেশ দক্ষতার সাথে করে চলেছেন, সেটাও দেশবাসী বুঝতে পেরেছেন ।
বিএনপি এখন অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত। শেষ মরিয়া চেষ্টা জঙ্গিবাদ উদ্ভুত পেট্রোল বোমা প্রয়োগ করে শত শত নাগরিক আর অসংখ্য পরিবারকে শুধু নিঃস্ব করা গেছে, তবে আসল কাজটি কেবল অধরাই থাকেনি, বরং সরে গিয়েছে আরো দূরে । কারণ এই জঙ্গি তত্পরতা গণতান্ত্রিক কোনো আন্দোলনের কৌশল হতে পারেনা, সেটা জনগণ বুঝে গেছে, এ আন্দোলনে সাড়া মেলেনি। বিএনপি নেতৃত্ব এখন দলের ভিতরেও কোনঠাসা। প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে কারো না কারো মুখে নেতৃত্বের ব্যর্থতার কথা। এ নিঃসন্দেহে অস্তিত্বের প্রতি চরমতম হুমকি।

বুঝতে পেরেছে, রাজনীতিতে চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না, আর আসবে না। বিএনপিকে ভোট না দিলে “দেশ ভারত-এর অঙ্গরাজ্যে পরিনত হবে”, এই স্লোগান আর দেশবাসীকে গেলানো যাবে না। তাই অস্তিত্বের স্বার্থে, ভিন্ন পথ অবলম্বন ছাড়া উপায় নেই। কিছু একটা উপায়ে তাদের যে কিছুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা দেশে-বিদেশে আছে, সেই ম্যাসেজটা দিতেই হবে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু তৃণমূল শক্তির কাছে, এ ছাড়া বিএনপির এইমুহুর্তে করনীয় খুব সীমিত।

দেরিতে হলেও বিএনপি নেতৃত্বের বোধোদয় হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে প্রতিবেশীর সাথে রক্তচক্ষু দেখিয়ে আর শত্রুতা দিয়ে শুধু শক্তিক্ষয় ছাড়া আর কিছু অর্জন সম্ভব নয়, তবে সৌভ্রাতৃত্ব দিয়ে, বন্ধুত্ব দিয়ে সবকিছুই অর্জন করা যায়। তাই হাজার বছরের বাঙালি আতিথেয়তার ঐতিহ্য জলাঞ্জলি দিয়ে, খোঁড়া অজুহাতে ভারতের প্রথম বাঙালী প্রেসেডেন্ট, বাংলাদেশের জামাই, শ্রী প্রণব মুখার্জির সাথে দেখা না করে যে ভুলটি তারা করেছে, এবারে উঠে পরে লেগেছে নমোজি’র সঙ্গে সাক্ষাত লাভের আশায়, সেই ভুলটির প্রায়শ্চিত্য করার প্রয়াসে। এ কারণেই বিএনপির প্রবল ভারত বিরোধিতার জিগিরটি আজ শিকেয় তুলে উল্টো ভারত বন্দনায়, মোদিজি বন্দনায় মাতোয়ারা।

অবস্থা এমন, যে কোনভাবেই হোক না কেন, দেখা একটু চাই-ই চাই। যদি দেখা সাক্ষাত করে কিছুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা প্রমান করা যায় দলীয় কর্মী-নেতাদের মাঝে! যদি কোনো সুবাতাসের স্পর্শে ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশীদারিত্বের ন্যুনতম ছোয়াঁচটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়! কিংবা মোদিজি অথবা ভারত শেখ হাসিনা সরকারকে যে বিশ্বাস আর নির্ভরতার উচ্চকিত আসনে স্থান দিয়েছে, সেখান থেকে যদি টলানো সম্ভব হয়!  এই আশায় মোদিজি’র প্রতি বিএনপি নেত্রীর বারংবার বিনীত প্রার্থনা “তোমার নয়নে নয়ন রাখিয়া কী বলিতে চাই হে পরান ….” শুনে যেও কিন্তু! পোঁড় খাওয়া নেতা মোদিজি বিএনপি নেত্রীর এই মিনতিভরা আকুল আবেদনে, তাকে বিমুখ করেন কীভাবে?

মোদিজি নিশ্চিয়ই অবগত বিএনপি সৃষ্টির ইতিহাস। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যে ধারাটি প্রচলিত ছিল, তা মূলত ছিল ‘কারো সাথে বিরোধ নয় বরং সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহাবস্থান’-এর নীতি। আর এই ‘সবার সাথে সৌভ্রাতৃত্ব’ প্রদর্শনের জায়গাটিতেই যাদের বিরোধিতা, কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় – মূলত ‘ভারতের সাথে সৌভ্রাতৃত্ব প্রদর্শনে যাদের বিরোধিতা’,  স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের সেই পরাজিত আর ঘাতক শক্তির সম্মিলিত জোট-ই  যে বিএনপি প্রতিষ্ঠার নিয়ামিক শক্তি, সেটা যে মোদিজি’র অজানা, এমনটি বিশ্বাস করার কোন কারণ থাকতে পারে না ।

 

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এত দীর্ঘদিনে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের সেই মৃতপ্রায় ‘অখন্ড পাকিস্তান’ কিংবা ‘ পাকিস্তান বাঁচাও ধর্ম বাঁচাও’ স্লোগানধারীরা যে আকার আকৃতিতে বেশ বড় হয়ে গেছে! বিএনপি নেত্রী পারবেন তো স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত আলো-বাতাস আর তেলে-জলে হৃষ্ট-পুষ্ট হওয়া ভারত বিরোধী সেই অপশক্তিকে রুদ্ধ করে ভারতের সাথে বন্ধুত্বের এই ‘হঠাত প্রেমিকা” সাজার সিদ্ধান্তকে এগিয়ে নিয়ে বিশ্বস্ততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে! কিংবা সেই “জনগনের আর দেশের স্বার্থে” বিবেচনা করার ধুঁয়া তুলে আবার ফিরে আসবেন না তো ভারত বিরোধিতার স্বরূপে? শেষ বেলায় না আবার নিজের চেয়ারটি-ই  খুঁইয়ে বসেন দলের অভ্যন্তরে থাকা ভারত বিরোধী শক্তির কাছে! এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।