ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 
বাজার করার সুযোগ খুব-একটা আমার হয়না। তবে দু-একদিন অফিস ছুটির পর ফিরতি পথে হাতের কাছে যা পাই, আর কিছু আকস্মিক প্রয়োজন – যা আমাদের ঘরে নেই, অথচ তখনই দরকার, এরূপ কোনো কেনাকাটার প্রয়োজন হলে কিনতে হয়। এর বাইরে কালে ভদ্রে, যদি ছেলেটি আমার বায়না ধরে, ‘বাবা চলোনা! আজ তোমার সাথে বাজারে যাব’। তাহলে কাছাকাছি ‘স্বপ্ন’। ব্যাস, এতখানিই আমার বাজার করার অভিজ্ঞতা!
 
আমি বেসরকারী চাকুরে। আমাকে অফিস করতে হয় ন’টা -পাঁচ’টা নয়, ন’টা-সাত’টা। কখনও কখনও নয়, প্রায়ই সেটা হয়ে যায় ন’টা – আট’টা কিংবা ন’টা-ন’টা। তার পর ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে কমসে-কম রাত দশ’টা কখনও কখনও এগারো’টাও হয়ে যায়। বাসায় ফিরে দেখি ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা ঘুমের আয়োজনে আছে। আর সকালবেলা ন’টার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হলে অতি-অবশ্যই সাত’টা- বড়জোড় সাত-টা পনেরো’র মধ্যে বাসা থেকে বের হতেই হবে, নতুবা নির্ঘাত “লেট মার্ক”। 
ছবিটা কে এঁকেছিলেন জানিনা, তবে এটা বাস্তবতা
এই যখন দিনপঞ্জি, তখন আর বাজার করি কখন? অনাচ-পাতি থেকে শুরু করে ছেলেদের, আমার জামা-প্যান্ট, গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া মোজা অবধি সব কেনাকাটা বিয়ের পর থেকেই ছেড়ে দিয়েছি। ছেড়ে দিয়েছি বলা ঠিক নয়, বরং বলা ভালো ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। নিজের পছন্দ অপছন্দ রুচিবোধ সব সেই কবেই জলাঞ্জলি দিয়েছি! বিসর্জন দিয়েছি সামাজিক আচারানুষ্টানও। ভাগ্যিস মার্ক জুকারবার্গ ব্যাটা ফেসবুকটা বানিয়েছিল! নতুবা এতদিনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হয়ে যেতাম আমি “আফ্রিকান জঙ্গলের অধিবাসী”!
 
বলার অপেক্ষা রাখে না- সরকারী চাকুরেদের সুইপার থেকে শুরু করে উপরে সব শ্রেনীর কর্মকতাদের নিরানব্বই শতাংশই যেমনটি করে থাকেনযারা বেসরকারী চাকুরে, তাদের আটানব্বই শতাংশেরই “বাম ড্রয়ারে” কোনো কাজ হয় না, টাকা ঢুকে না, ঢোকার সুযোগ-ও থাকেনা। মাস শেষে যা স্যালারি! তা থেকেই চালিয়ে নিতে হয় পুরো মাস। এর বাইরে কোনো জরুরি প্রয়োজন! তো ঋণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। আবার ঋণ করলে শোধ দিতে গিয়ে পড়তে হয় মহাবিপদে! মাসের পর মাস মাসিক খরচ থেকে দু’টাকা – পাঁচ’টাকা করে বাঁচিয়ে তবেই না সম্ভব হয় ঋণ শোধ। 
 
এই যখন অবস্থা! তখন সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন একলাফে দ্বিগুণ।

 

এদিকে বেতন বৃদ্ধির খবরে বাজারে রীতিমতো আগুনের ছোঁয়াচ; একেবারে যুদ্ধকালীন অবস্থা যাকে বলে! যে ডিম পনের দিন আগে ছিল আশি-পঁচাশি টাকা ডজন- তা একলাফে একশকুড়ি -একশত্রিশ টাকা। বাজারে কাঁচাঝাল এখন কেজি দু’শো কুড়ি টাকা, পেয়াজ- নব্বই টাকা। এক কেজি পটল ষাট থেকে সত্তর টাকা, কাঁকরোল আশি টাকা, পেঁপে চল্লিশ, বরবটি ষাট। কেজি প্রতি পঞ্চাশ টাকার কমে কোনো সবজি কিনতে চাইলে বাজারে পাওয়া যাবেনা, যেতে হবে ভাগাড়ে। তবেই মিলতে পারে।
 
দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ নয়, চারগুণ- পাঁচগুণ হলেও সরকারী চাকুরেদের গায়ে লাগবে না, কারণ বেতন তো দ্বিগুণ হলোই! তার উপরে “উপরি ইনকাম”! প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেনীর কর্মকর্তাদের কথা বাদই দিলাম, এই ঢাকা শহরে অনেক চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীরও বাড়ি রয়েছে! তাও অনেকের আবার একটা নয়, একাধিক! অথচ যারা বেসরকারী চাকুরে, তাদের অনেকেই বাসাভাড়া দিতে দিতে আর ফিবছর বর্ধিত বাসাভাড়ার চাপ সহ্য করতে না পেরে কম ভাড়ার বাড়ি খুঁজে নিন্মমানের জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। পিছিয়ে পড়ছে সামাজিক গতিময়তা থেকে। দূরে সরে যাচ্ছে আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে আর ছোট হতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের কাছে। 
 
শুধু আমার কথাই বলছিনা, অধিকাংশ বেসরকারী চাকুরেদের এই বাজারে দুরাবস্থার কথা ভেবে সরকার কিছু একটা পদক্ষেপে নেবে, সেই ভাবনা নিঃসন্দেহে দিবাস্বপ্ন। অথচ দ্রব্যমূল্য, বর্ধিত বাসাভাড়া, প্রতিবেশী সরকারী চাকুরেদের অবৈধ আয়ে বিলাসী জীবন যাপন, সব মিলিয়ে বেসরকারী চাকুরেদের প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। জীবন এখন বিপন্ন। এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সমাজে নির্দিষ্ট আর সীমিত আয়ের বেসরকারী চাকুরেদের জীবন ধরণের ন্যুনতম উপায়ই যখন অবশিষ্ট নেই- তখন আমার মতো অনেকের নিজের কাছে একটাই জিজ্ঞাস্য-এখন আমি কী করব?