ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আজ একটি অন্য রকম গল্প শোনাব।

 

“দুই হাজার ছয় সালের কথা। সদ্য বিয়ে করেছি, মেসের জীবন ছেড়ে, ছোট্ট একটা দেড় রুমের বাসা ভাড়া নেই। খিলগাঁও, গোরানে। বাড়ির মালিক ব্যাংকার। মালকিন বাড়ির যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। পাঁচ তলা বাড়ির এক বারান্দার দেড় রুম আর আড়াই রুমের দুটি ইউনিট প্রতি তলাতে, আমরা পাঁচ তলাতেই ভাড়া নিলাম। পানি-গ্যাস আর বিদ্যুতসহ একুনে মাসিক ভাড়া আটাশ’শ টাকা। আমাদের নতুন সংসার, চুলো দু-বেলা জ্বলবে ঠিকই, তবে তা খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। সারাদিন, আর সব ভাড়াটিয়ার মতো অত-অত রান্না-বাড়িও আমাদের হবে না! তবুও সরকারিভাবে গ্যাস বিল তো ফিক্সড! পানিও বাড়িওয়ালা সব ভাড়াটিয়ার জন্য দুইশো পঁচিশ টাকা করে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আমার ধারণা ছিলো, বিদ্যুত বিলটা আমাদের একশ টাকা মাসে আসবে কিনা সন্দেহ! স্বামী-স্ত্রী সকাল সাতটায় বেড় হবো, সন্ধ্যে সাতটা বা তারও পরে ফিরবো। তাছাড়া তখনো ফ্রিজ কেনা হয় নি। যা একটা টিভি আছে! তাও দেখার সুযোগ কই? ওই শুক্কুরবারে যা একটু দেখা! তাতে শ’টাকার বেশি বিল হবার কথা নয়। সব ফ্ল্যাটে তো ফ্রিজ ওভেন আয়রন চলবেই, কোনো কোনো ইউনিটে, বিশেষ করে যারা উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন, তারা কেউ কেউ এসি ও চালান। তাই আমাদের ঘাড়ে বিদ্যুত বিলটা টেনে ভাড়াটা যদি একটুও, অর্থাত দু-একশো টাকা কমানো যায়! বৌকে এক শুক্রবারে পাঠালাম মালকিনের সাথে কথা বলতে! বউ আলাপ সেরে ঘরে ফিরে ফ্রিজ আর ওভেন কেনার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলো দেখে ভাবলাম বোধ হয় ‘চিড়ে ভিজে নি’। একটু বিস্তারিত জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করতেই বউ বলে উঠলো, ‘হ্যা, আগামী মাস থেকে আমাদের জন্য ভাড়া একশো টাকা কম। তবে আন্টি বলেছেন- তোমরা এসি ডিসি ফ্যান ফ্রিজ হিটার-মিটার আয়রন-মায়রণ ওভেন-টোভেন যা কিছু চালাও-চালাও, না চালাও-না চালাও, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমাদের পুরো বাড়ির বিদ্যুত বিল ফিক্সড। কোনো কম দেবার সুযোগ নেই। তো তোমরা যা খুশি, যত্তো খুশি, সব কিছু চালাতে পারো। বলো! কেন ফ্রিজ কিনবোনা? কেন ওভেন কিনবোনা? ফ্রিজ আর ওভেন থাকলে তো প্রতিদিন আমার দু’বার করে চুলোয় পুড়তে হবে না!’ বৌয়ের কথা শুনে আমার তো চক্ষু কপালে!”

 

সংসার জীবন শুরুর কথাগুলো বন্ধু চিন্ময় যখন বলছিলো তখন আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। অবাক হয়েছিলাম ওর কথায়। তবে আকাশ থেকে পরছিলাম ও যখন বলল – ‘জানিস ওই মিটার রিডার তিনটে ফ্ল্যাটের মালিক! তিনি স্যার মানুষ! বসে বসে অফিস সামাল দেন আর মাসিক বেতনে একজন লোক রাখা আছে, যার কাজ হলো প্রতিমাসে তার এলাকার গ্রাহকদের বিলের টাকা কালেকশন করা।’

 

মনে মনে নিজেকে গালি দিচ্ছিলাম, কেন এত কষ্ট করে পড়ালেখা করলাম! তার চেয়ে বরং ঐ মিটার রিডারের মতো মামা-খালা-চাচা কাউকে ধরে-ক’য়ে ঐজাতীয় “উপরি” আয়ের একটা চাকরি মেট্রিক পাশ করার পরই জোটানোর জন্য কেন লেগে পরলাম না!

 

বন্ধুর কথা বাদ থাক, এবার নিজের অভিজ্ঞতার একটু প্রকাশ ঘটাই!

 

আমি বাসাবোতে দীর্ঘদিন আছি। গত দু’হাজার বারো’র জুলাইয়ে উঠেছি একটা নতুন বাসায়। আড়াই কাঠার প্লটটিতে সাতশো স্কয়ার ফিট, কী সামান্য কিছু বেশি হলেও হতে পারে! প্রতি ফ্লোরে দুটি করে ফ্ল্যাট । নতুন বাড়ি, ছ’তলা। এক ডেভলপার কোম্পানি বাড়িটি ফিফটি-ফিফটি শেয়ারে নির্মান করছে, কাজ তখনো শেষ হয় নি। আমরা প্রথম ভাড়াটিয়া। আমাদের হপ্তাখানেক আগে শুধু ল্যান্ডঅনার উঠেছেন। তিন তলায় ওনাদের মুখোমুখি আমাদের ফ্ল্যাট। বাড়িতে বিদ্যুতের লাইন, নির্মানকালীন কমার্সিয়াল লাইন ছিল। আর একটি ডাবল বার্ণার গ্যাসের লাইনের পারমিশন ছিলো। আমরা যেদিন উঠলাম, তড়িঘড়ি করে বাড়িওয়ালা অর্থাৎ ল্যান্ডওনার দোকান থেকে মোটা ধরনের বড় এক কয়েল প্লাস্টিক পাইপ নিয়ে আমাদের জন্য গ্যাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। মাস তিনেকের মধ্যে বাড়িতে মোট ন’টি পরিবার উঠলো, সবার গ্যাস লাইন আমাদের মতই, সরাসরি রাইজার থেকে প্লাস্টিক পাইপে পেলো। ল্যান্ডওনার গ্যাস বিল বাবদ এক পয়সাও বেশি নেন না, সবার কাছ থেকে সরকারী বিধিমোতাবেকই চারশো পঞ্চাশ টাকা করে উঠান! কিছু একটা বন্দোবস্ত করা আছে গ্যাস অথরিটির সাথে, বিল বাবদ সংগৃহিত অর্থ নিয়মিত ভাগ হয়। যার সুবাদেই অনুমোদনহীন ঝুলন্ত আর অতিরিক্ত লাইনগুলো আর কাটা পরে না।

 

এবারে গালগল্প থাক। এই সুযোগে একটু অন্য কথায় আসি। বর্তমানে কম আলোচিত, গৌণ একটা বিষয়ে একটু নজর দেই!

 

সারাবিশ্বে খনিজ জ্বালানিকে বলা হয় “লিকুইড গোল্ড” বা “তরল সোনা”। কারণ জ্বালানি ছাড়া সভ্যতা যেমন অচল, ঠিক তেমনি খনিজ তেল আর গ্যাস ছাড়া জ্বালানির যোগান অসম্পূর্ণ। পৃথিবীতে মোট ব্যবহৃত জ্বালানির সিংহভাগই জৈব জ্বালানি, যার যোগান আসে খনিজ তেল আর গ্যাস থেকে।সে কারণেই খনিজ তেল-গ্যাসই মূলত “লিকুইড গোল্ড” নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই লিকুইড গোল্ডের সারাবিশ্বে এখন দরপতন চলছে সলিড গোল্ডের মতই। অবস্থা এমন! গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিন্ম অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ জ্বালানি তেল আর গ্যাসের বর্তমান মূল্য। শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য আরও কমতে পারে। বৈশ্বিক ভূ -রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণে এমন সম্ভাবনার কথাই উঠে আসছে।
hhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhhh

 

কিন্তু আমাদের অবস্থা ভিন্নতর, গত বিষ্যুতবারের কথা। সরকার এক ঘোষণায়, হঠাত করে গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছেন। গ্যাস বিলই এক ধাক্কায় দুইশো টাকা! বাড়িয়েছেন তো বাড়িয়েছেন! আবারও হাঁক পাড়ছেন, আবার দুই-তিন মাসের মধ্যে আবারও বাড়ানো হবে গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম। এ যেন একেবারে মগের মুল্লুক! কথা বলবি, প্রতিবাদ করবি, তো মিটার বাড়তে থাকবে! আর কথাই বা বলবে কে? বিরোধিতা করারই বা কে আছে? সরকারী বেতনভুগিদের তো মুখে রা করার দরকার নেই! বেতন দ্বিগুন, তার উপর ‘উপরি ইনকাম’ তো আছেই! বেতনে হাত দেবার দরকার কী? আর বিরোধী দল! সে তো দূর্নীতির সাগরে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিজেই ডুবে মরার দশা! দু’এক টি কানা খোঁড়া দল যাও একটু চিতকার চেচামেচি করছে, তা সরকারের গা করার মত কিচ্ছুটি নয়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজারে এই অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি কেন?

 

বর্তমান সরকারের অগণিত ভালো কাজের মধ্যে এমন কিছু খারাপ কাজ আছে, যা সমস্ত ভালো কাজকে ছাপিয়ে যায়। সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক দূর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারী সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমলা-কর্মচারীদের দুর্নীতি মানুষের সহনশীলতাকে অতিক্রম করে ফেলেছে। সরকারী অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের অনেকেই দূর্নীতি আর লুট-পাটের অংশীদার হয়ে গাড়ি-বাড়িসহ বিলাসী জীবনযাপন করছে। পক্ষান্তরে মোট জনশক্তির নব্বইভাগেরও বেশি, যারা বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করে জিডিপিতে সব থেকে বেশি অবদান রাখছে, তারা দিনকে দিন শুধু বঞ্চিতই হচ্ছেনা, সামাজিকভাবে সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের তুলনায় পিছিয়েও পড়ছে।

 

তাহলে কী এটাই ঠিক যে, পঁচানব্বই শতাংশের বেশি বেসরকারী চাকুরে আর অগনিত সাধরণ মানুষকে বাড়তি বিলের বোঝা চাপিয়ে আদায়কৃত অর্থ দিয়ে শুধুমাত্র বিলোও পাঁচ শতাংশ সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের, মিটার রিডার লাইনম্যানসহ দূর্নীতিবাজদের তোষণ আর বেসিক সোনালী ব্যাংকের লুট হওয়া টাকার ঘাটতিতে ধুঁকতে ব্যাংকগুলো তাজা করনের জন্য?