ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

শ্রী শ্রীগীতায় “মোক্ষলাভ” । মোক্ষ শব্দেটি মুক্তি বোযাচ্ছে। মুক্তি অর্জন করা মানে বন্ধন থেকে উত্তরণ। তাহলে আমরা কি কোন না কোন ব্ন্ধন হতে মুক্তি কামনা করি। এ বন্ধনটি কি? দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বন্ধন হচ্ছে কর্মের বন্ধন। কর্ম হচ্ছে মায়াময় পৃথিবীতে বৈচিত্রতার এক মহাযজ্ঞ। সেখানে দিনের সুচনা থেকে রাতের খাওয়া এবং শয়ন পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কাজ করার যে ধারাবাহিকতা তা যদি কেও অনুস্মরণ করে না সেও মূলত কোন কোন কর্ম করে। হয়তো সকল কর্ম ফলদায়ক হয় না। এই কর্ম থেকে মুক্তিই কি মোক্ষ লাভ?

শ্রী শ্রী গীতায় যে মুক্তির কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আত্ত্ব নিবেদন। নববিধা ভক্তির শেষ স্থর হচ্চে আত্ত্ব নিবেদন। শ্রীশ্রীগীতায় ভগবান জ্ঞানী ও স্মরণাগত ভক্ত অর্জুনকে সংখ্য যোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, সকল স্থরে ব্যাখ্যা দিয়ে সন্ন্যাস, সন্ন্যাস কর্ম সন্ন্যাস, আত্ত্বতত্ত্ব , আত্ত্বদর্শন, আত্ত্বসংযম, আত্ত্বসিদ্ধি, জীবন দর্শন মৃত্যু, দর্শন, ব্রহ্মজ্ঞান, ভগবদ্ভক্তি ঈশ্বরতত্ত্ব, সাধন তত্ত্ব্, ধ্যানতত্ত্ব, জ্ঞান বিজ্ঞান সকল বিষয়ে নির্দেশানা দিয়েছেন। অর্জুন অত্যন্ত ধীর স্থির ও শ্রদ্ধানুসারে শ্রীকৃষ্ণের নিকট হতে সকল তত্ত্ব শ্রবণ করে নিজের আত্ত্বাতে উপলব্ধি করেছেন। সবচেয়ে বড়কথা হলো শ্রীকৃষ্ণ মুখ নিসৃত একটি অনবদ্য বাক্য হচ্ছে,

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহামায়ম। …….শ্রীশ্রীগীতা ৯/২২।

অর্থাৎ যে সকল ব্যক্তি অনন্যমনে চিন্তা করে আমার উপাসনা করে, সেই নিত্য যোগযুক্ত ব্যক্তিগণের যোগ ও ক্ষেম আমি বহন করি। সুতরাং অনন্যমনে ভগবানের চিন্তা করলে ভগবান সেই ভক্তের যোগ ও ক্ষেম আমি বহন করেন। এ বিষয়ে সকলেল জানা হলো ভক্ত অর্জুন মিশ্র শ্রীগীতার ৯ম অধ্যায়ের ২২ তম শ্লোকের বহাম্যহম” শব্দটি কেটেদেন কারণ ভগবান কারো যোগ ও ক্ষেম বহন করতে পারেন না বরং দান করতে পারেন। এজন্য অর্জুন মিশ্র বহাম্যহম শব্দটি কেটে দদাম্যহম করেন। শ্রীকৃষ্ণ তখন অর্জুন মিশ্রকে ভুলটি ধরিয়ে দেন।

শ্রীগীতায় ভগবানকে তুষ্ট করার কথাও বলেছেন গীতার নবম অধ্যায়ের ২৬ তম শ্লোকে। পত্র, পুস্প, ফল বা জল যে ভক্তির সাথে আমাকে অর্পন করে সেই শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তির ভক্তিপূর্বক অর্পিত অর্ঘ্য আমি প্রীতিপূর্বক আস্বাদন করি। কিভাবে ভগবানকে পাওয়া যাবে তাও শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতায় অনেক স্থানেই বলেছেন। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করাই হচ্ছে মোক্ষ লাভ। শ্রীশ্রীগীতার নবম অধ্যায়ের ৩৪ তম শ্লোকে বলা হয়েছে-

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুক্তৈবমানাং মৎপরায়ণঃ গীতা- ৯/৩৪।

অর্থাৎ তুমি সর্বদা মনকে আমার চিন্তায় নিযুক্ত কর, আমাতে ভক্তিমান হও, আমাকে পূজা কর , আমাকে প্রণাম কর। এভাবে মৎপরায়ণ হয়ে আমাতে আত্ত্বযুক্ত করলে আমাকেই প্রাপ্ত হবে।

১॥ কর্মযোগ–কর্মযোগের দ্বারা বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় ই যে, মানুষ স্থুল, সুক্ষè এবং কারন শরীর দিয়ে যা কিছু করে, তা যেন কেবল লোক সংগ্রহের জন্য, কর্তব্য পরসবপরা সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে, মানুষকে কু পথ থেকে সৎপথে ধরে রাখার জন্য এবং প্রাণী মাত্রেরই হিত করার জন্য করে, নিজের জন্য নয়, (৩/৯,২০) এরুপ করলে তার অসঙ্গতা এবং নিজ স্বরূপবোধ জাগ্রত হয়।

২॥ জ্ঞানযোগ— জ্ঞানযোগ দ্বারা মুক্তি পাবার উপায় হলো এই যে , মানুষ সৎ- অসৎ নিত্য- অনিত্যকে বিবেক দ্বারা অসৎ (শরীর ইত্যাদি) থেকে নিজেকে পৃথক বলে যেন অনুভব করে। এইরুপ করলে সে মোক্ত লাভ করে এবং বন্ধনমুক্ত হতে সক্ষম হয়।(১৩/২৩/৩৪)

৩॥ ভক্তিযোগ- ভক্তিযোগ দ্বারা বন্ধন থেকে মুক্ত হবার উপায় এই যে, মানুষ নিজেকে এবং সংসারকে ও যেন ভগবানের মনে করে, তার প্রসন্নতার জন্যই যেন সমস্ত কার্য নিস্পন্ন করে, সমস্ত কর্ম ভগবানেই অর্পন করে। এইরুপ করার ফলে সে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়।(৯/২৬/২৮) বাস্তবে বন্ধন নেই। প্রকৃত পক্ষে এই বন্ধন নিজেরই সৃষ্টি, বন্ধনকে ধরে রাখা হয়েছে। সুতরাং সে ইচ্ছা করলেই, বন্ধন মুক্ত হতে পারে। একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শরণ দ্বারা অর্থাৎ নববিধা ভক্তির সাহায্যে সকল প্রকার বন্ধন মুক্তি হতে পারে।

মহাপ্রভু নির্দেশিত হরিনামই পারে মানুষকে ভব বন্ধন হতে মুক্ত করতে।

লেখক পরিচিতিঃ নির্বাহী সম্পাদক- শ্রীগৌরবাণী পত্রিকা । gowtompaul@gmail.com