ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

০১. শ্রীচৈতন্য প্রেমের অবতার। “ব্রাহ্মণে চণ্ডালে করে কোলাকুলি কবে বা ছিল এ রঙ্গ?” শ্রীচৈতন্য যে শুধু মানুষের মাঝে ভেদ-বিদ্বেষের দেয়াল ভেঙ্গে ছিলেন, তা নয়, তিনি শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব আদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘোষণা করেছিলেন একত্বের মহাবাণী। ঈশ্বরকে বা শ্রীভগবানকে নানারূপে ভজনা করা যায়। এ বিষয়ে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বললেন,“ আমি এ জগতের পিতা, মাতা, ধারক ও পিতামহ। বিশ্বের আমিই একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় ও পবিত্র বস্তু। আমি ব্রহ্মবাচক ওঙ্কার শব্দ। আমি ঋক্, সাম, যজু: এ সকল বেদ।” (গীতা/০৯/১৭) শ্রীভগবান নিজ মুখে শ্রীঅর্জুনকে জানিয়ে দিলেন তিনি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পিতা ও মাতা। এতে স্পষ্টভাবে জানা গেল শ্রীভগবানকে যেমন পিতারূপে ভজন করা যায় তেমনি মাতা রূপেও ভজনা করা যায়। শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও শুদ্ধ ভক্তিযোগে তাঁর অর্চনা করলে তাঁকে পাওয়া যাবে। এ হলো সাকার উপাসনা। এমনকি কেউ যদি প্রণব দ্বারা তাঁর আরাধনা করেন তবে তিনিও তাঁকে লাভ করবেন। শ্রীভগবান নিজেই স্বীকার করলেন, তিনি বেদসমূহের মধ্যে পবিত্র ব্রহ্মবাচক শব্দ। এ থেকে বুঝা গেল শ্রীভগবানকে যেমন পিতারূপে বা প্রভুরূপে ভজনা করা যায় আবার তাঁকে জগজ্জননী রূপেও ভজনা করা যায়। জগতের সর্বত্র তিনি বিরাজিত। এমন কোন বস্তু এ বিশ্বে নেই যার মধ্যে তাকে দেখা যায় না। আমার চোখ নাই তাই দেখিনা তবে আজো অনেক সাধক পরমপিতাকে বা পরম মাতাকে জগতের সর্বত্র দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে যান। কে কী উপায়ে ভজনা করছে তা সাধন জগতের মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো শুদ্ধভক্তি সহ শ্রীভগবানের ভজনা করা হচ্ছে কী না? জগতে বিভিন্ন ধর্মমত এমনিতেই হয়নি। এ সকল ধর্মমতের উদ্ভব হয়েছে একমাত্র তাঁরই ইচ্ছায়। বাইরে পার্থক্য দৃষ্ট হলেও সাধক ও প্রকৃত মননশীল মানুষ এর মধ্যে একত্বের সুর শুনতে পান। সুরটি হলো ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। গীতাতেও শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “যিনি আমাকে সর্বভূত অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্বভূত অবস্থিত দেখেন, আমি তার অদৃশ্য হইনা, তিনিও আমার অদৃশ্য হন না ॥ যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বন করে সর্বভূতে ভেদজগন পরিত্যাগ করে সর্বভূতস্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, আমাতেই অবস্থান করেন॥ (গীতা/০৬/৩০-৩১) এখানে একটি কথা সর্বদা মনে রাখা আবশ্যক যে কোন অবস্থায় মনে যেন কোন ভেদ বা বিদ্বেষ কারো প্রতি না থাকে। ভেদ ও বিদ্বেষ ভাব মনে থাকলে কোন দিন ভগবানকে কেউ লাভ করতে পারবে না। দ্বন্দ্বের ভূমিতে থেকে কোনদিন দ্বন্দ্বাতীততে পাওয়া যায় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করে ভক্তের লণ বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, “যিনি কারো প্রতি দ্বেষ করেন না; যিনি সকলের প্রতি মিত্র ভাবাপন্ন ও দয়াবান, যিনি সমত্ববুদ্ধি ও অহংকার বর্জিত, যিনি সুখে দুঃখে সমভাবাপন্ন, সদাসন্তুষ্ট, সমাহিত চিত্ত, সংযত, স্বভাব, দৃঢ় বিশ্বাসী, যাঁর মনবুদ্ধি আমাতে সমর্পিত, এমনি ভক্তগণ আমার প্রিয়॥” (গীতা/১২/১৩-১৪) কাজেই মায়ের পূজোতেও শ্রীভগবানের পূজাই হয়ে থাকে। কারণ একাধারে তিনি জগন্মাতা আবার জগৎপিতা। সন্তানের কর্তব্য হলো মায়ের পূজা এবং বাবার পূজা করা। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ নয়। মায়ের মাতৃত্ব এবং পিতার পিতৃত্ব এ উভয়েই শাস্ত্রের স্বীকৃত। মা হলেন শক্তির অধিষ্টাত্রী দেবী। চণ্ডী গ্রন্থে ঋষি বলছেন,
যা দেবী সর্ব্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তসৈ (৩২) নমস্তস্যৈ (৩৩) নমস্তসৈ নমো নমঃ ॥ (শ্রীশ্রীচণ্ডী/৫/৩৪)
অর্থাৎ যে দেবী সর্বভূতে শক্তিরূপে অবস্থান করেন, তাঁকে বার বার প্রণাম করি॥ শক্তি ছাড়া শক্তিমানের কথা চিন্তাও করা যায় না। কাজেই শক্তির পূজা পুর্বে ছিল, বর্তমানে আছে আর আগামীতেও থাকবে। জগতে কোন মানুষই শক্তিকে অস্বীকার করতে পারেন না। কোন দেহে যখন শক্তির অবস্থান শূন্যের কোঠায় নেমে আসে তখনই দেহটি মৃত বলে ঘোষিত হয়। শক্তিই প্রাণ আর শক্তিই জীবন। দৃষ্টিশক্তিতে আমরা দেখি, স্মৃতি শক্তি দিয়ে আমরা স্মরণে রাখি, পায়ে চলতে লাগে শক্তি, গান গাইতে লাগে শক্তি, ভগবানের আরাধনা করতেও লাগে শক্তি তাই শক্তিকে বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত স্বীকার করেন। সনাতন ধর্মেও শক্তিতত্ব স্বীকৃত। মা দুর্গা হলেন শক্তির দেবী। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজা করে থাকেন। এটি হলো পরম পুরুষকে মাতৃরূপে পূজা করা। এতে করে এক পরম পুরুষের পূজাই হয়ে থাকে।

০২. আমরা এবার শ্রীচৈতন্য চরণে আশ্রয় নিতে চাই এবং দেখতে চাই প্রভু শক্তি সম্বন্ধে তাঁর প্রকট লীলায় আমাদের জন্য কোন প্রসাদ রেখে গেলেন কিনা? শ্রীচৈতন্য ছিলেন প্রেমধর্মের মূর্ত বিগ্রহ। তিনি তাঁর লীলাজীবনে সকল মত ও পথকে সম্মান দেখিয়ে গেছেন। রাধাকৃষ্ণ মিলিত তনু শ্রীচৈতন্য। তাঁর মধ্যে ভেদ বা হিংসার স্থান কোনদিন ছিল না। তাঁর কাছে জগতের সবকিছু ছিল সুন্দর। তিনি কৃষ্ণময় জগৎ দেখতেন। প্রভু ঝাড়িখন্ডে বন ভ্রমণের সময় বাঘ ভল্লুকের মাঝেও কৃষ্ণ দেখেছেন। তাই ব্যাঘ্র আদি পশুও প্রভুর সঙ্গে একত্রে সংকীর্তন করেছে। তিনি পরিক্রমা কালে যে কোন মন্দিরে গেলেই প্রণাম করতেন। এটি ছিল চৈতন্য অবতারের শিা। আমরা যাকে ভগবান বলে জানি তিনিতো কোন সময়ে ভেদ দর্শনের শিা দিতে পারেন না। চৈতন্য অবতারে অনেক স্থানেই বলা আছে চণ্ডীর প্রসঙ্গ। হে সুধী পাঠক। আসুন আপনার সঙ্গে আমিও প্রবেশ করতে চাই শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবতে। মধ্যখণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়ে যেথায় চণ্ডীরূপা গৌরহরির স্তব করা হয়েছে। আমরা এবার শুনবো জগজ্জননীর স্তুতি শ্রীলবৃন্দাবন দাস ঠাকুর রচিত শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত থেকে।

“জয় জয় জগতজননী মহামায়া।
দুঃখিত জীবেরে দেহ রাঙ্গা পদচ্ছায়া ॥
জয় জয় অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড-কোটিশ্বরী।
তুমি যুগে যুগে ধর্ম্ম রাখ অবতরি ॥
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরে তোমার মহিমা।
বলিতে না পারে, অন্যে কেবা দিবে সীমা ॥
জগৎ স্বরূপা তুমি, তুমি সর্ব্ব-শক্তি।
তুমি শ্রদ্ধা, দয়া, লজ্জা, তুমি বিষ্ণুশক্তি ॥
যত বিদ্যা সকল তোমার মূর্তিভেদ।
‘সর্ব্ব-প্রকৃতির শক্তি’ কহে বেদ ॥
নিখিল-ব্রহ্মাণ্ডগণের তুমি মাতা।
কে তোমার স্বরূপ কহিতে পারে কথা?
ত্রিজগত হেতু তুমি গুণময়ী।
ব্রহ্মাদি তোমার নাহি জানে, এই কহি ॥
সর্ব্বাশ্রয়া তুমি, সর্ব্বজীবের বসতি।
তুমি আদ্যা, অবিকারা পরমা প্রকৃতি ॥
জগত জননী তুমি দ্বিতীয় রহিতা।
মহীরূপে তুমি সর্ব্ব জীবপাল মাতা ॥
——————————–
কমলা, পার্ব্বতী, দয়া, মহা-নারায়ণী
আপনে হইলা প্রভু জগত জননী ॥
সত্য করিলেন প্রভু আপনার গীতা।
‘আমি পিতা, পিতামহ, আমি ধাতা মাতা।
(মধ্য/১৮/১৬৭-২০৫)

প্রভু লৌকিক ও বৈদিক আচারকে তাঁর লীলায় সম্মান করে গেছেন। শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবতের বাণী।
লৌকিক বৈদিক যত কিছু কৃষ্ণশক্তি।
সবার সম্মানে হয় কৃষ্ণে দৃঢ় ভক্তি ॥
দেব দ্রোহ করিলে কৃষ্ণের বড় দুঃখ।
গণসহ কৃষ্ণপূজা করিলে সে সুখ।
যে শিখায় কৃষ্ণচন্দ্র, সেই সত্য হয়।
অভাগ্য পাপিষ্ট মতি তাহা নাহি লয়। (মধ্য/১৮/১৪৮/১৫০)

০৩. উপরে বর্ণিত শাস্ত্রাদির আলোচনায় এবং শ্রীচৈতন্য লীলার অনুধ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে শক্তিপূজা সনাতন ধর্মে সর্বস্বীকৃত। দেব দ্রোহ করলে শ্রীকৃষ্ণ অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। সুতরাং আমরা কেন অযৌক্তিকভাবে দেব-দেবীর দ্রোহ করে কৃষ্ণের অপ্রীতিভাজন হব। যার ভাল লাগে শক্তিপূজা করবেন যার ভাল লাগে না শক্তিপূজা করবেন না। এটি নিজ নিজ সাধন ভজনের বিষয়। কিন্তু অন্তরে কোন বিদ্বেষ ভাব পোষণ করা কোনক্রমেই সঙ্গত নয়। আসুন আমরা সকাতরে এ ভেদ বিদ্বেষের উর্ধ্বে আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার সংকল্প গ্রহণ করি। শারদ প্রভাতে জগজ্জননী শ্রীচণ্ডীর পদকমলেও প্রার্থনা সকাতরে নিবেদন করছি। জয় মা মহামায়া। জয় গৌরহরি।

হে মাত! জগজ্জননী দিও এক দান।
ভেদ বিদ্বেষ হতে কর মোদের ত্রাণ ॥
জয় জগদ্বন্ধু হরি ॥