ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

দুর্গাপূজার আরেকটি বৈশিষ্ট কুমারী পূজা। সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী–এই তিনদিনই দেবী পূজার অন্তে কোন কুমারী বালিকাকে নূতন বস্ত্র পরিধান করিয়ে দেবীজ্ঞানে পূজা করার রীতি।
দেবী দুর্গা কুমারী নামে প্রসিদ্ধা। বৃহদ্ধর্মপূরাণে দেবতাদের স্তবে প্রীত হয়ে চণ্ডিকা কুমারী কন্যা রূপে দেবতাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে বিল্ববৃক্ষে দেবীর বোধন করতে বলেছিলেন।
কন্যারূপে দেবানামগ্রতো দর্শনং দদৌ।

দেবীপূরাণ মতে দেবীর পূজার পর উপযুক্ত উপচারে কুমারীদের ভোজনে তৃপ্ত করতে হবে–‘নৈবেদ্যং শালিজং ভক্তং শর্করা কন্যাস্বপি।’ শালিচালের ভাত, শর্করা (মিষ্টান্ন) প্রভৃতি নৈবেদ্য দ্বারা কুমারীদের ভোজন করাবে। দুর্গপূজায় কুমারীপূজা সংযুক্ত হয়েছে নিঃসন্দেহে তান্ত্রিক সাধনা থেকে। তান্ত্রিক মতে কুমারী দেবীর প্রতীক। যে কোন প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠে কুমারীপূজার রীতি। কামরূপ কামাখ্যার মন্দিরে কুমারীপূজা করা হয়ে থাকে। কুমারীপূজার প্রাধান্য থেকেই বাঙ্গলা দেশে ‘গৌরীদান প্রথা প্রচলিত হয়েছিল।

কুমারী পূজা ছাড়া হোম প্রভৃতি সকল কর্ম পরিপূর্ণ ফললাভ করে না। কুমারীপূজায় সেই ফল অবশ্যই লাভ হয়। কুমারীকে পুষ্প দিলে কার ফল হয় মেরুপর্বত সমান, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোককে ভোজন করানো হয়। দেবী শিবকে বলেছেন, ‘‘কুমারিকা হুহং নাথ সদা ত্বং কুমারিকা।”

–হে নাথ, আমিও কুমারী তুমিও কুমারী, অর্থাৎ সকল কুমারীই শিব- পার্বতীর অংশ।

কুমারী সাক্ষাৎ যোগিনী, কুমারী পরদেবতা–‘‘কুমারী যোগিনী সাক্ষাৎকুমারী পরদেবতা।” মহানবমীতে কুমারী পূজার বিধান তন্ত্রসারেই আছে–মাহানবম্যাং দেবেশি কুমারীং চ প্রপূজয়েৎ। এক বৎসর থেকে ষোল বৎসর পর্যন্ত বালিকারা ঋতুমতী না হওয়া পর্যন্ত কুমারীরূপে পূজিত হওয়ার যোগ্য। এক এক বর্ষীয়া কুমারীদের এক এক নাম আছে। একবৎসরের কন্যার নাম সন্ধ্যা, দ্বিবর্ষা কন্যা সরস্বতী, তিন বৎসরের ত্রিধামূর্তি, চতুবর্ষা কালিকা, পঞ্চবর্ষা সুভগা, ষড়বর্ষা উমা, সপ্তবর্ষা মালিনী, অষ্টবর্ষা কুজিকা, নববর্ষীয়া কন্যার নাম কালসন্দর্তা, দশমবর্ষীয়া অপরাজিতা, একাদশবর্ষীয়া কন্যাণী, দ্বাদশবর্ষা ভৈরবী, ত্রয়োদশবর্ষীয়া মহালক্ষ্মী, চতুর্দশবর্ষীয়া পীঠনায়িকা, পঞ্চদশবৎসরের কন্যার নাম ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোড়শ বর্ষীয়া কুমারী অম্বিকা।

দেবী কুমরীর নাম বহু প্রাচীন। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীকে কন্যা কুমারী বলা হয়েছে–‘‘ক্যাত্যায়নাম বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমাহি।

তুো দুর্গি প্রচোদয়াং ॥”

–হে দুর্গে, তুমি কন্যা ও কুমারী, কত্যায়নকে জানি, তোমাকে ধ্যান করি, তুমি আমাদের প্রেরণ কর।

দেবী পূরাণ দেবীর কৌমারী নামের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেছেন–
কুমার-রূপধারী চ কুমার-জননী তথা।
কুমার-রিপুহন্ত্রী চ কৌমারী তেন সা স্মৃতা ॥
কুমার রূপ ধারণ করেন, কুমারের জননী, কুমার রিপুনাশিনী বলেই তিনি কৌমারী নামে স্মৃতা।
উপনিষদে ব্রহ্মকে কুমার এবং কুমারী দুইই বলা হয়েছে–
ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি ত্ব কুমার উত বা কুমারী।
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে কন্যাকুমারী নামক বিখ্যাত পীঠে দেবীর কন্যা কুমারী বিগ্রহ দেবীর কুমারী নামের সার্থকতা প্রতিপাদন করে।

লেখক পরিচিতিঃ সাংবাদিক, তরুণ লেখক, ব্লগার, অনলাইন এক্টিভিস্ট, শ্রীগৌরবাণী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, আহব্বায়ক- বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোট, মৌলভীবাজার জেলা শাখা ।