ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

দেবী দুর্গাদেবী আদ্যাশক্তি। বিশ্বজননী। অনেকের ধারণা মা দুর্গার পূজা শুধুমাত্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ভাল করে তথ্য জানলে দেখা যায় ভারত বর্ষের বহু স্থানে অবাঙ্গালীরাও দুর্গাপূজা করে। সনাতন বাঙ্গালী সম্প্রদায় বিশ্বের যেখানে আছেন সেখানেই দুর্গাপূজা পালন করেন। দেশে দেশে শক্তি দেবতার পূজা বা দেবী পূজার প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কেহ কেহ মনে করেন শুধুমাত্র পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশে দেবী পূজা হয়ে থাকে। কিন্তু দেবী পূজা সারা ভারতের অন্যতম পূজা। এমনকি আসাম, মেঘালয় রাজ্যেও সর্বত্র শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

তামিলদেশে পালৈ অঞ্চলে কোররবৈ নামে দেবীর পূজা হয়ে থাকে। কোররবৈ দেবী জটাধারিণী, সর্পবল্কব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, হরিণবাহনা,মূকরদন্ত নির্মিত কলাচন্দ্র। পালৈ অঞ্চলের মানুষের ধারণা যে এ ভয়ংকর দেবীর পূজা করলে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায়। কোররবৈ দেবীকে দেবী দুর্গার অনুরূপ দেবী বলে মনে করা হয়। দেবী ত্রিনয়নী, ত্রিশূলধারিনী, মহিষাসুরের ছিন্ন মুণ্ডের উপর দণ্ডায়মান কৃষ্ণবর্ণা ।

তামিলদেশের কানমরশেল্বি, কাড়–রৈকডবুল, কাডমরশ্বেল্বি প্রভৃতি দেবী অরন্যবাসিনী দেবী বনদুর্গার সমতুল্যা। বাংলার মঙ্গলচণ্ডী ও ঋকবেদের অরন্যানীর সগ্রোত্রা। তামিলনাড়–র শিলপ্পদিকারম্ গ্রন্থে দারুকাসুর ও মহিষাসুর ঘাতিনী দুর্গার বিবরণ পাওয়া যায়। এ দেবীর নাম বেট্টুররবি। দেবীর বর্ণ কেয়া ফুলের মত নীল। প্রবালের মত রক্তবর্ণ ওষ্ঠাধর। তিনি সিংহধ্বজ হস্তে ধারণ করেন। দেবীর পড়নে বাঘের চমড়া। হাতীর চর্ম দ্বারা দেবীর উত্তরীয়। দেবীকে শিবের অর্ধাঙ্গরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে মহিষের ছিন্ন মুণ্ডের উপর দণ্ডায়মান দেবী দুর্গার প্রচুর মূর্তি পাওয়া যায়। মহাবলিপুরমে আদি বরাহ গুহামন্দিরে এবং সিঙ্গবরমে রঙ্গনাথ গুহায় অষ্টভূজা দুর্গা ত্রিভঙ্গমূর্তিতে বিরাজমান। আদি বরাহ মন্দিরে যে মূর্তি পূজিতা হচ্ছেন সে মূর্তির ডানহাতে একটি পানপাত্র এবং বামহাতে একটি শুকপাখী।

খ্রীষ্টিয় ৬ষ্ঠ হতে ৮ম শতাব্দীতে কাঞ্চির পল্লবরাজগণ দেবী দুর্গার মূর্তি ক্ষোধিত বা নির্মাণ করেছিলেন । দেবী ছিন্ন মহিষাসুরের মুণ্ডের উপর বা পদ্মের উপর দণ্ডায়মান থাকতেন। পল্লবরাজগনের দেবী নির্মিত দুর্গার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল যে দেবী দুর্গার সাথে বিষ্ণুমূর্তি আছেন। সনাতন ধর্ম মতে যে কোন পূজায় শ্রীবিষ্ণু পূজা করতে হয়। ৮৫০ খ্রীষ্টাব্দের পরে অনুমান ৮৭০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে তাঞ্জোরে চোলরাজ বিজয়ালয় নিশুম্ভসুদনী দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন। চোলরাজাদের নির্মিত দেবী দুর্গা ছিলেন অষ্টভূজা এবং ত্রিভঙ্গ মূর্তিতে দণ্ডায়মান। কুম্ভকোনয়ে নাগেশ্বরস্বামী মন্দিরে দেবী চতুর্ভুজা। তবে সকল প্রতিমাই মহিষের ছিন্ন মুণ্ডের উপর দণ্ডায়মান।দেবীর হাতে শঙ্খ, চক্র, খড়গ,ধনু ও খেটক। তামিল দেশে দুর্গার সাখে হরিণ থাকে আবার কোথাও হরিণ ও সিংহ থাকে।

যতদূর জানা যায় যে চালুক্য রাজাদের আমলে ব্রহ্মাণী কৌমারী প্রভুতি সপ্তমাতৃকা পূজা জনপ্রিয় ছিল। পল্লবরাজাদের আমলে মন্দিরে শিব এবং স্কন্দের সঙ্গে পার্বতীর পূজা প্রচলিত ছিল। বর্তমানকালে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামে গ্রামে কালী, ভদ্রকালী, মহাকালী, শেলাণ্ডি অষ্মন, দ্রোপদী অশ্বন, মারি আশ্বন, পেশিয়াশ্বন, মাতঙ্গী ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পূজিতা হন। আসলে সারা ভারতে শক্তিদেবীর পূজা হয়ে থাকে।

রাজস্থানে মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গার পূজা প্রথম খ্রীষ্ট পূর্ব প্রথম হতে বা খ্রীষ্টপর হতে প্রচলিত ছিল। রাজস্থানে কালী, কালিকা, দুর্গা, চামুণ্ডা, অষ্টভূজা ও অম্বা এই ছয় প্রকার দেবীর পূজার প্রচলন আছে। রাজস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা আঞ্চলিক দেবীর পূজা প্রচলিত আছে। করণিমাতা, মোকলমাতা, পিপলাদমাতা, শচিয়ামাতা, খোরিমাতা, শাকম্বরী, আশাপূরী দেবী,কিনসরিয়া দেবী, কৈরসমাত, থিমলমাতা, কৈলাদেবী, সক্রাইমাতা, জিনমাতা, সুসানিমাতা, দধিমাতা, সীলমাতা, চৌথমাতা, প্রভুতি বিভিন্ন নামে দেবী পূজা হয়। নগরে প্রাপ্ত এবং অম্বর যাদুঘরে রক্ষিত পোড়ামাটির ফলকে অঙ্কিত কয়েকটি দুর্গামূর্তির মধ্যে অন্ততঃ একটি খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর বলে মনে করা হয়। রাজস্থানে প্রস্তর নির্মিত প্রচুর মহিষমর্দিনী দুর্গার মূর্তি পাওয়া যায়্।

কুষাণরাজাদের আমলের বা গুপ্তরাজাদের আমলের নির্মিত গঙ্গানগর জেলার ভদ্রকালী মন্দিরে প্রপ্ত পোড়ামাটির ফলকে মহিষমর্দিনী দুর্গার মূর্তি হতে জানা যায় যে খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীতে রাজস্থানে শক্তিদেবীর পূজার ব্যাপকতা ছিল। মহিষমর্দিনী দুর্গা ছাড়াও কালী এবং অষ্মার্তিকা পূজার প্রচলনও রাজস্থানে ছিল। অজমির যাদুঘরে দেবী চামুণ্ডার মূর্তি দেখে মনে হয় রাজস্থানে দেবী চামুণ্ডার পূজাও হত।

উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর বা একাম্রকাননে শক্তি পূজার ব্যাপকতা ছিল। ৯ম শতাব্দীতে পরশুরামের মন্দিরে ছিলেন দণ্ডমাতৃকার মূর্তি। বৈতালে ছিলেন ভয়ংকর চামুণ্ডা মূর্তি। যাজপুরে আছেন চামুণ্ডা মূর্তি। বিরজা যাজপুরের অধিষ্টাত্রী দেবী। বিরজা দেবী দ্বিভূজা , সিংহবাহিনী। এ দেবী শূলের দ্বারা মহিষাসুর বধ করেছেন। ভুবনেশ্বরে গৌরী মন্দিরে শক্তিমূর্তি অধিষ্ঠিত। অনন্তবাসুদেব মন্দিরে কৃষ্ণবলরামের সঙ্গে আছেন একানংশা , বিন্দুসরোবরের নিকটবর্তী ও বৈতাল সহ বিভিন্ন মন্দিরে মহিষমর্দিনী দেবীর মূর্তি দেখা যায়। উড়িষ্যার একাম্রক্ষেত্রের চারমাইল পূর্বে হীরাপুর গ্রামে চৌষুট্ট যোগিনীর মন্দির আছে। এই মন্দিরের বাহিরের প্রাচীরে ছিন্নমুণ্ডের উপরে দণ্ডায়মান নয়টি কাত্যায়নীর মূর্তি আছে।

06_Durga+Puja_Khamarbari_AP_260917_0025

পুরীতে জগন্নাথ ভৈরবী বলে খ্যাত বিমলা আছেন। কোনারক সূর্য মন্দিরে শিব ও দুর্গা পূজিত হচ্ছেন। উত্তর ভারতে দেবী দুর্গা পূজার প্রচলন আছে। হরিদ্বারে একটি পাহাড়ের নাম চণ্ডী পাহাড়। যেখানে চণ্ডী দেবীর মূর্তি একটি মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন। এ দেবী প্রস্তরনির্মিত। সিঁন্দুর লিপ্ত । পাঞ্জাবের অমৃতসরে দুর্গামাতার মন্দির খুব প্রসিদ্ধ। হরিদ্বারের পরমার্থ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছেন দুর্গাদেবী।

বাংলার সর্বত্র দেবী পূজার প্রচলন আছে। পশ্চিম বাংলা বা পূর্ব বাংলায় দেবী দুর্গা মহিষ মর্দিনীরূপে কিংবা দশভুজা রুপে পজিতা হচ্ছেন। পশ্চিমবাংলার দুর্গাপূজা এখন শুধু পূজা নয় তা এখন ইতিহাস . ঐতিহ্য, সাহিত্য , কৃষ্টি ও সংস্কৃতি কে তুলে ধরা হয়। পূজার মধ্যে যে কারুকার্য তা থেকে ডিসপ্লে আরো বহুগুন সুন্দর ও বাস্তবসম্মত করে প্রদর্শিত হয়। শারদীয় পূজা যেমন রয়েছে শাস্ত্রীয় বিধি বিধানের নিয়ম তেমনি রয়েছে শিক্ষামূলক নানা বৈচিত্রময় চিত্রকথা।

বাংলাদেশে দেবী দুর্গার বিশাল মূর্তি তৈরী হয়। কক্সবাজারে খুব উচ্চতা বিশিষ্ট দুর্গা পূজা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মৌলভীবাজার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও শান্তি বাবুর বাড়ির দুর্গাপূজা খুবই প্রসিদ্ধ। এ পূজায় প্রতিবৎসর হাজার হাজার লোকসমাগম হয়। যাই হোক শারদীয় দুর্গাপূজায় এসেছে ভিন্ন মাত্রা – যা এখন ভারত বর্ষ পেরিয়ে আন্তজার্তিক পরিমণ্ডলে প্রসারিত হচ্ছে। লণ্ডনের বৃটিশ লাইব্রেরীতে যেখানে বাঙ্গালীরা শারদীয় দুর্গাপূজা করে তখন ভাবতেও অবাক মনে হয়। উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশে শারদীয় দুর্গাপূজা নিয়মিত হয়। ঢাক ঢোল বাজিয়ে শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর বাজে আর মহিলাদের ধামাইলের তালে বিদেশীদের আনদ আরো বৃদ্ধি পায়। পাশ্চাত্য দেশের নাগরিকগন শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দ অনুষ্ঠানকে ভাগ করে নেয়। বিশ্বে শারদীয় দুর্গাপূজা একটি উৎসব সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

লেখক পরিচিতিঃ ব্লগার, নির্বাহী সম্পাদক- শ্রীগৌরবাণী পত্রিকা