ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

কালেঙ্গা রেঞ্জে বন মূলত ঝোপ প্রধান। হরগাজা, চাপালিশ, কড়ই, শিমুল, তেলসুর, শাল, সেগুন, অর্জুন, জাম, গর্জন, শুকরী চাপা, বাঁশ-বেতের ঝোপ আর প্রায় আঠার প্রজাতির বট। স্থানে স্থানে পথ আটসাটো হয়ে যায় ঝোপ-জঙ্গলের প্রচুর্যে। জঙ্গর জুড়ে লতা-গুল্মের অভাব নেই। নানা বড় গাছকে আশ্রয় করে ওঠে যাওয়া পরগাছা লতা মোটা হতে হতে যেমন গাছের রুপ নিয়েছে, তেমনি সমস্ত বনকে যেন বেঁধেছে এক প্রাকৃতিক ডোরে। নীম, আমের মত কতক গুহস্থ গাছও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বন জুড়ে, তবে কেমন যেন জংলী রুপ।
শুকনো বনে স্থানে স্থানে মাটি তেকে তিন-চার ফুট আবদি সমস্ত গাছ মরে গেলেও বন জুড়ে ফুল আর রংএর অভাব নেই। শুকনো মাটিতেই ফুটে রয়েছে বাহারি শটি ফুল।জংলা বেলী, স্থানে স্থানে সালবলের গ্রাম, তীব্র গন্ধের হলুদ শুকরি চাপা, নাম না জানা আরো কত কত।

কালেঙ্গা রেঞ্জ বিখ্যাতই হচ্ছে চশমা পরা হনুমানের জন্য। বনের মধ্যে একটুঘোরা ঘুরি করলেই দেখা মিলবে এই বিরল প্রজাতি হতে চলা এই প্রাণীর। বানর আর হনুমানের দেখা যাবে প্রায় সমান সংখ্যায়। বনের গভীরে মগডাল জুড়ে যেন এদের এক আলাদা রাজত্ব। সপরিবারে মগ ডাল গুড়ে এদের লাফালাফি যেন সেই রাজ্যের সাবভৌমত্ব ঘোষনা করে।গাছে গাছে প্রচুর্য যেন কাঠবিড়ালীর। ছোট, মাঝারির চেয়ে প্রমান সাইজের সংখ্যাই বেশী। পরিচিত ধুসর রং এর কাটবিড়ালী ছাড়াও দেখা মিলবে কালো কাঠবিড়ালীর। হরিন, বনরুই এই বনের অনেক সন্ত্রস্ত বাসিন্দা। একমাত্র ছোট দলে নিশব্দে গেলে দেখা মিলতে পারে এদের।

এবার আসি এই বনের প্রধান বাসিন্দাদের কথায়। বন জুড়ে লালবুক টিয়া আর সবুজ পায়রাদের ঝাঁক। নিসঙ্গ পাহাড়ি ময়নার ডাক শোনা যাবে একটু পরপরই। বনের প্রান্ত সীমায় ঘুরে বেড়ানো এসব ময়নার দেখাও মিলবে সহজে। এছাড়া ডাহুক, সাতভেয়ালা, রঙ্গীন কাঠঠোকরা, রাজঘুঘু, তিলা ঘুঘু, হলুদ পাখি, ইগল, শ্যামা, ফিঙ্গে, বসন্ত বৌরী, বিশার লেজের ভীমরাজ, দেড়-দুই সেন্টিমিটারের গাঢ় সবুজ-লাল রং এর ফুরঝরি, হলুদ বুলবুলি আরো আরো নাম না জানা বা ভুলে যাওয়া আমাদের নিজস্ব অসংখ্য আবাসিক পাখি।কালেঙ্গা রেঞ্জের বেশ খানিকটা জুড়েই মাঝে মাঝে ধান ক্ষেতের দেখা পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত উচু এসব ক্ষেতে বোরো করা হয় না। চৈত্রের শেষে আমন কেটে নেয়া নারাবাড়িতে ঝাক বেঁধে নেমে আসে বনমোরগের দল। তবে সাবধানী মোরগের দল কাছাকাছি মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই চম্পট দেয়। তবে বনের ভেতর থেকে তাদের সতর্কতার ডাক শোনা যাবে সহজেই। বনের সীমানায় সন্ধ্যায় বকের দল আকাশের সীমানায় উড়ে যাবার পরপরই দেখা মিলবে আরো কতক রাতের পাখির। পেঁচা-বাদুরের সাথে নিকটেই কোথাও ডেকে উঠবে রাতচরা।
কালেঙ্গা থেকে রেমা:
কালেঙ্গা রেঞ্জ থেকে রেমা রেঞ্জে বন পথে এক দিনের(দুই প্রহর) পথ। এই দুই রেঞ্জের মাঝে রয়েছে আর একটি রেঞ্জ। কালেঙ্গার ঝোপ প্রধান বৈশিষ্ট আর রেমার সুউচ্চ (গর্জন টাইপ) গাছ; এই দুই বেশিষ্টের সংমিম্রনে ……রেঞ্জ্। চৈত্রের শুষ্ক বনের মাঝেও এই রেঞ্জ আগমন শুভেচ্ছা জানাবে সুউচ্চু সবুজ শাল বন দিয়ে। কাঠঠোকরার গাযের রং বৈচিত্র আর ঔজ্বল্ল দুটোই যেন বেড়ে যাবে কযেকগুন। সাধারন ফিঙ্গে প্রায় এক হাত লম্বা লেজ লাগিয়ে এখানে ঘুরে বেড়ায় ভীমরাজ সেজে। শ্যামা, বুলবুলী আর জাম বনে বসন্ত বৌরী। এখানে বন মোরগের ঝাঁক টিলা ছেড়ে নেমে আসে বন পথের মাজে। আর এই রেঞ্জ থেকে বিদায় জানাবে এক-দেড় সেন্টিমিটারের গাঢ় সবুজ-লাল রং এর ছোট পাখি ফুলঝুরি।
এর পরই চা বাগান পেরিয়ে রেমা রেঞ্জে প্রবেশ। বিশাল বিশাল গর্জন, শিমুল মুহুর্তে পাল্টে দেবে বনের রুপ। গর্জনের মগ ডালে দেখা মিলবে হুট করে বিলুপ্তির দ্বার প্রান্তে পৌছানো এশিয় শকুনের বাসা। গর্জনের সাথে পাল্লা দিয়ে শিমুল আকাশের কাছাকাছি।আর তাদের দেখাদেখি চাপালিশ, হারগাজাও যেন তাদের বুক সমানে পৌচেছে। হলুদ বুলবুলির আধিক্যের সাথে এখানে দেখা মিললো গাঢ় লাল রং এর রেডটিটির।বন পথে বেশ কয়েকবার দেখা মাললো ……………..।এই বনের লটকন, হারগাজা, ডুমুর গাছ প্রমান দেয় হরিনের পালের অস্তিত্ত্ব।

পুনশ্চ:
সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলেও তিন রেঞ্জ জুড়েই কম বেশী চলছে বন ধ্বংশের কার্যকলাপ। কালেঙ্গায় বড় গাছের সাথে গাছের ঘনত্ব দুটোই কমছে আশঙ্কা জনক হারে।গত শতকের নব্বইয়ের দশকেও এখানে দেখা মালেছিল ভাল্লুকের। মাঝের ……. রেঞ্জে বড় তেমন গাছ চোখেই পড়বে না। বন পথে চলতে চলতে মাঝে মাঝেই পাওয়া যাবে গাছ কাটার শব্দ।বনবাসি সাওতাল,মুন্ডারাও অধিক নির্ভরশীর হয়ে আছে বাঁশ-বেত আহরনের ওপর। বনের মাঝে মাঝে থাকা ধান ক্ষেতের আয়তন প্রতি বছর বাড়ছে বনে ঘুরে বেড়ানো গাইড-প্রকৃতি সচেতনদের মতে। বনবাসি মঙ্গর মুন্ডা সর্বশেষ পাঁচ-ছ বছর আগেও যেখানে হাতির দেখা পেয়েছেন, সেখানে একটা মেছোবাঘও আর চোখে পড়ে না।

যাত্রা পথ:
রাজধানী থেকে কাছের বন গুলোর মধ্যে অন্যতম এই রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। যেকোন সিলেটগামী ট্রেনে চার ঘন্টা গেলেই শায়েস্তা গঞ্জ জংশন। এখানে নেমে মেক্সি-সিএনজিতে চুনারু ঘাট। ভাড়া জন প্রতি বিশ/ত্রিশ টাকা।এখান থেকে আরো আধা ঘন্টার মধ্যে সিএনজিতে পৌছে যাওয়া যাবে কালেঙ্গা রেঞ্জে। রেঞ্জের গেটেই বনের আয়তন, বৈশিষ্ট বিস্তারিত সাইন বোর্ড রযেছে। বনে ঘোরার ছয় জন গাইডের নাম মোবাইল ফোন নাম্বারও রয়েছে সাইন বোর্ডে।থাকার জন্য বনের গেটে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ডাক বাংলোও রযেছে। সোলারের বৈদ্যুতিক আলোসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই রযেছে ডাক বাংলোতে। খরচও তুলনামূলক কম। বনের গেটে থাকা ছোট্ট বাজারে মানুষ জন অনেক কম হলেও সারা দিনই অনেক ভাল চা পাওয়া যায়। আর গরমের মধ্যে বন পথে দু’দিন ধরে হাটে বেড়ানো সম্ভব হযেছিল এই বন-পাহাড়ের সুশীতল পানির কারনে।অবশ্য ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে না চাইলে বাসেও যাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও সিলেটগামী যেকোন বাসে শায়েস্তা গঞ্জ। তারপর শাযেস্তা গঞ্জ থেকে একই পথ।