ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ফোনটা রেখে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে পড়ে রইলাম । কোন কিছু বলেই কামরুলকে শান্তনা দিতে না পারার অক্ষমতা আর অসহায়ত্ব আমাকে তীব্র ভ্রুকুটি করছে । কানে এখনো বাজছে ওর উচ্চারিত কথা গুলো । বোধহয় বাজতেই থাকবে, বাজতেই থাকবে ।

“ভাইয়া এখন আমার কী হবে ? আমার তো যাওয়ার কোন যায়গা রইলো না ! আমার সপ্নটা এভাবে মাটিতে মিশে গেলো ? আমি কী অপরাধ করেছিলাম?”

কথাগুলো বলছে আর গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে ছেলেটা ।অসুস্থতার জন্য উচ্চমাধ্যমিকে ও গোল্ডেন এ প্লাস পায়নি ও অথচ মেধার দিক থেকে তার জুড়ি মেলা ভার । আমি তো ভেবেই ছিলাম আগামী বছর এই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসেই ওকে র্যাগ দিবো ফাজলামো করে ! একই স্কুলের ছোটভাই বলেই ওর সাথে আমার হৃদ্যতা অনেকদিনের । অন্য কোনদিন যদি ও এভাবে কাঁদতো তাহলে আমি হয়তো বলতাম, “আরে বোকা ছেলে কাদছ কেনো ? তুমি অনেক বড় হয়ে গেছো, এ বয়সে ছেলেদের চোখের পানি মানায় না !” কিংবা অন্য কোন শান্তনার কথা । কিন্তু আজ কিছু বলতে পারছি না ওকে । নিজেরই কেমন গলাটাতে কেমন জমাট বেঁধে আছে । কথা বলতেই কষ্ট হচ্ছে খুব । ভাগ্যিস কথা হচ্ছে ফোনে । তা না হলে চোখের কোণে জল নিয়ে যে কী লজ্জায়ই না পড়তাম ওর কাছে !

এমন আরো দুটি ফোন এসেছিলো আজ । রাহাতের আর তানিয়ার আব্বুর । একই রকম হতাশা আর জমাট বাধা দুঃখ ওঁদের কণ্ঠেও। মফস্বলের কলেজ থেকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর তোলা যে কত কষ্ট এটা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে ।

কয়েক বছর আগের কথা । সবেমাত্র উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছি । একেকটা পরীক্ষা শেষ হচ্ছে আর ।

বেড়ে যাচ্ছে উত্কণ্ঠা । আমি কি পারবো, এতো মেধাবীদের ভীড়ে ? সেই ছোট্টবেলাতেই গলায় স্টেথো আর গায়ে এপ্রোন চড়ানোর যে সপ্ন দেখেছিলাম পরিবারের আক্ষাঙ্খার প্রতিফলনে; তা ধীরে ধীরে চলে আসছিলো অনেক কাছে । কিন্তু একই সাথে হৃদয়ের গহীনে ঠিকই আশংকার সুর । আমি কী আদৌ পারবো ?

বড় হয়েছি মধ্যবিত্ত পরিবারে। অনেক সীমাবদ্ধতা ছিলো । সারাদিন টিউটরের কাছে বসে ঘ্যানঘ্যান করে পড়া কিংবা প্রাকটিক্যালের নাম্বার বাড়াতে পরীক্ষার সেন্টারের কলেজের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার নাম করে এতগুলো টাকার শ্রাদ্ধ করার সাধ কিংবা সাধ্য কোনটাই আমার ছিলো না । ভেবেছি যতটুকুই পারি আমি যদি ঠিক ঠিক নিজেকে তুলে ধরতে পারি তাহলে অন্তত এ+ পেতে কোন সমস্যা আমার হবে না প্রাকটিক্যালের ২/৫ নম্বরের জন্য !

অবশেষে ভর্তি পরীক্ষায় অনেক শহুরে ছেলেকে অনেক গোল্ডেন এ প্লাসকে টপকে এ ক্যাম্পাসে পৌছেছি ।এখন ভেবেও শিউরে উঠছি যদি এই সিদ্ধান্তটাই তখন হত তবে কী আমিই কামরুলের সারিতে চলে যেতাম না ?

খুব কষ্ট লাগে একটা ছোট গিনিপিগের ওপর পরীক্ষা চালাতেও অনেক জ্ঞানার্জন করতে হয়, সেই যাতে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটার কোন অমর্যাদা না হয়, সে যাতে অকারণে ধ্বংস না হয়ে যায় সেক্ষেত্রেও অনেক যত্ন করে পরীক্ষা করা হয় । অথচ আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকেরা আমাদের ওর রাজ্যের পরীক্ষা চালান । যা মন চায় তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছেন তারা । আমাদের মতামতটুকু নেয়ার ফুরসত ও তাদের নাই ! তারা মানুষ গুলোকে রাস্তার নেড়ী কুকুরের মর্যাদা দেন বলেও তো মনে হয় না । একটা সিদ্ধান্ত হলো দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত প্রায় সব সদস্য এই সিদ্ধান্তের ভ্রান্তি নিশ্চিত করলেন অথচ মহামান্য রাজন্যবর্গ্যেরা পরামর্শের জন্য ছোটেন অন্যদের কাছে ।এই লেখাপড়ার পাহাড় ডিঙানো একজন অভিযাত্রীকের কী যোগ্যতা থাকা উচিত কিংবা কিভাবে নির্বাচন করলে ভালো হয় তাও তো তো পরামর্শ চাইলেন না কখনো । হায় কপাল আমাদের !

কিছুদিন আগে কিছু মুরুব্বিদের সাথে কথা বলার সময় ‘ব্যক্তিগত অপ্রয়োজনীয় মনস্তাত্বিক অনমনীয়তা’ বোঝাতে গিয়ে ‘ইগো’ শব্দটা ব্যবহার করে চরম একটা ঝাড়ি খেয়েছিলাম । তাই এসব শব্দের ব্যবহারে এখন আমি অনেক সচেতন । তবে আমার কাছে এটি খুবই কষ্টের যে কিছু মানুষ তাদের অতি বায়বীয় কিছু সিদ্ধান্ত কোন এক পথে উদগীরণ করে দিলো আর হাজার হাজার মেধাবীদের উজ্জল ভবিষ্যত মুহূর্তেই দপ করে নিভে গেলো । অথচ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ জানানো হলো কিন্তু আপনারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েই বসে রইলেন ।

যে মেয়েটাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলে সে লজ্জায় সংকোচে লাল হয়ে যায় কোনমতে নামটা বলেই দৌড়ে পালায়, সেই মেয়েটাই কতটা আহত হলে, কতটা আশাভঙ্গ হলে প্রেসক্লাবের সামনে রাজপথ অবরোধ করে, হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে পুনরায় পরীক্ষা চালু করার স্লোগান দেয়; মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আপনি কী ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারছেন ? তার বাবার হয়তো অতটা টাকা নেই যতটা টাকা থাকলে কয়েক লাখ টাকা দিয়ে একটা বেসরকারী মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়বে । কিন্তু তাই বলে কী তার মেধার কোন মূল্যই নেই ? তার সপ্নের দাম কানা কড়িও নেই ? আপনি বললেন তোমাদের পরীক্ষা নেই, এখন যাও ঘোরাঘুরি করো সিনেমা দেখো কক্সবাজার যাও ফূর্তি করো ! হা হতোম্মি !! সারাটা জীবন তো পরীক্ষার ভয় থেকে বাঁচতে স্রষ্টার কাছে কতো মিনতি করেছি ! অথচ দেখুন কেবলমাত্র নিজেকে সবচেয়ে সেরা মেধাবী ও সবচেয়ে যোগ্য প্রমাণ করে এই সীমাবদ্ধতার দেশে অল্প কয়েকটি আসন থেকে একটাকে নিজের করে নিতে ওরাই পরীক্ষা দিতে চাইছে ! ফাঁকিবাজি কোন পদ্ধতিতে আপনার কাছে আসন ভিক্ষা চাইছে না ? দিন না তাদেরকে তাদের সুযোগটা ফিরিয়ে, ওরা কষ্ট করে হলেও নিজের ভবিষ্যতটা নিজের হাতেই গড়ুক ! প্রদীপ্ত হোক দেশ গড়ার শপথে ।

আপনি ওদের সিনেমা দেখতে বলেছেন ঘুরতে যেতে বলেছেন নির্দ্বিধায় বলতে পারি এই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশেরই এই হাওয়ায় পয়সা উড়ানোর সার্মথ্য নেই । মেডিকেলে হলো না ! ঠিক আছে, তাহলে দেশের বাইরে চলে যাবে কিংবা গাটের পয়সা খরচ করে ভর্তি হয় যাবে কোন একটা প্রাইভেট বিশ্ব বিদ্যালয়ে ! এতটা সহজ নয় ।নিরীহ ভারবাহীর মতো আবার ছুটবে ওরা পাবলিক বিশ্ব বিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে, বুয়েটের ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষা দিতে ।ওখানকার প্রশাসন তো আর আপনাদের মতো উদারতা দেখায়নি ! ওখানে তো ভর্তি পরীক্ষা ঠিকই দিটে হবে । কিন্তু সেই পরীক্ষা গুলোর জন্য যে প্রস্তুতি নিতে যে সময় প্রয়োজন তা কী এখন আর আছে ওদের হাতে ?

তার চেয়ে বরং আপনি যদি বলেন অনেককে আপনার ঐ প্রটোকল যুক্ত গাড়ির বহরের নিচে বুক পেতে দিতে তাহলেও হয়তো এটা তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ। যদি হতাশায় দুঃখে আপনার সামনেই ওরা শুরু হয় আত্মহত্যার মিছিল তাতেও আপনার কী ! ওতো আপনার মেয়ে নয়, আপনার বোন নয় ভাই নয় ! কিন্তু আমি আমার ভাইবোনকে হারানোর কষ্ট কিভাবে ভুলবো?

বলতে পারেন মাননীয় মন্ত্রী ??