ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

‘এই ডিজিটাল যুগে আপনি সাইকেলে করে অফিসে আসেন !!!’

‘আমার সাইকেলে চড়ে অফিস করার খুব ইচ্ছা। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে সাহস করতে পারছি না।’

‘ভাই, আপনি কোম্পানির একজন সিনিয়র ম্যানেজার, সাইকেলে করে অফিস করার কথা চিন্তা করেন কিভাবে ? লোকে কি বলবে ? আর আপনি থ্রী-কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে অফিসে এসেছেন!!! আপনার চাকরি যাবে মোটামুটি নিশ্চিত।’

‘পাগল !!! এই গরমের দিনে ঘেমে নেয়ে, শরীর ময়লা করে অফিসে যাব সাইকেলে ? ঢাকা শহরের গরম, ধুলা আপনার চোখে পড়ে না ?’

‘ঢাকার রাস্তা সাইকেল চালানোর জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে।’

‘যতই চেষ্টা করুন, বাঙালী জাতীর স্বভাব হচ্ছে কুত্তার ল্যাজের মতো, কখনোই সোজা হবে না।’

আরও কত শত প্রশ্নবাণে যে আমাকে জর্জরিত হতে হয়, তার কোন ইয়ত্তা নেই। কেন ? কারন আমি প্রতিদিন অফিস করি আমার প্রিয় সাইকেলে চড়ে। সত্যি বলতে কি, সাইকেলকে নিত্য দিনের যানবাহন হিসাবে আমরা এখনো গ্রহন করতে পারিনি। আমাদের অহং বোধ খুবই প্রবল। আমরা বাসে চড়ে পায়ে পা মাড়িয়ে, গায়ে-গায়ে লেগে ফার্মের মুরগির মতো গন্তব্যে যেতে পারি। তাতে আমাদের ডিজিটাল যুগের কোন সমস্যা হয় না। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিএনজি কিংবা ট্যাক্সি ক্যাবের জন্য অপেক্ষা করে বাবা সোনা বলে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার আকুল আকুতি করতে গিয়েও আমাদের লোকলজ্জা বোধ তীব্র হয় না। গুন তিনেক বেশি ভাড়া দিয়ে যাওয়ার কথা না হয় নাই বললাম।

ঢাকার রাস্তা নিরাপদ নয়, শুধু সাইকেল কেন, অন্য যে কোন যানবাহনের জন্যই। প্রথমত আমাদের ট্রাফিক সিস্টেম উন্নতমানের না, দ্বিতীয়ত আমরা নিয়ম কানুন মানার চেষ্টাটাও করি না। বিশেষ করে রাস্তায় নামলেই মোটর সাইকেলের উপর সবাই কম বেশি ক্ষিপ্ত থাকে। যদিও সবাইকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা ঠিক না, কিন্তু মোটর সাইকেল আরোহীদের ট্রাফিক সিগনাল না মানার একটা প্রবনতা সব সময়ই লক্ষ্য করা যায়। প্রায় প্রতিটা সিগনালেই তারা সবার সামনে কাটিয়ে কুটিয়ে চলে আসে, আর তক্কে তক্কে থাকে একটু ফাক পাবার আশায়। আর ফাক পেলেই দিলাম টান। শুধু মোটর সাইকেল না, ট্রাফিক নিয়ম কানুন ভাঙ্গার মধ্যে আমরা সবাই মনে হয় কম-বেশি আনন্দ পাই! কিন্তু তার দোষ কেন বেচারা সাইকেলকে সইতে হবে ? আর তাছাড়া সাইকেল দুর্ঘটনার খুব বেশি উদাহরন পাওয়া যাবে বলেও মনে হয় না।

আশার কথা হচ্ছে, পরিবর্তন আসছে, ধীরে কিন্তু নিশ্চিতে। আমার মতো অনেক প্রকৌশলী, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, সেলেব্রিটি নিয়মিত সাইকেল ব্যাবহার করেন প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য। আপনারা হয়ত হেলমেট পরিহিত অবস্থায় আমাদের মধ্যে অনেককেই সাইকেলসহ এখন দেখতে পান রাস্তায়। সাইকেলকে আমরা দৈনন্দিন জীবনের একটা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসাবে গ্রহন করেছি। আমরা বাঙালী জাতীকে গালি দিতে ঘৃণা করি। কারন উপর দিকে থুথু দিলে তো নিজের মুখেই পড়ে, তাই না ? আমরা আশাবাদী, আমরা বিশ্বাস করি, মানসিকতার পরিবর্তন একদিন আসবেই। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে, ঘুরে দাড়াতেই হবে। প্রতিদিন আমরা রাস্তায় আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে আর রাজি না। সাইকেল আমার গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় কমায়, পয়সা বাচায়, শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কাটাতে সাহায্য করে, সাথে সাথে পরিবেশ দূষণ করা থেকেও আমাকে রক্ষা করে। ভাবতে ভাল লাগে, অন্তত কিছুটা হলেও সবার স্বার্থে কিছু একটা তো করা গেল। এই অনুভুতি আমার, আমাদের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি।

কে কি বলল, তাতে এখন আমি আর বিচলিত হই না। আশা করি আপনারাও হবেন না।