ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে । অনেক ক্ষেত্রে আমরা উন্নতি করেছি । তবে বিশ্বের অন্যন্য উন্নয়নশীল দেশের সাথে তুলনা করলে সেই উন্নতি খুবই সামান্য । দেশের ১৬ কোটি মানুষ, উর্বর ভুমি থাকার পরও কেন আমরা কাঙ্খিত উন্নতির শিখরে পৌছাতে পারলাম না ? অনেকেই এজন্য দায়ী করেন সর্বগ্রাসী দুর্নীতিকে, আবার কেউ কেউ মনে করেন দেশের অপরাজনীতিই এর মূল কারণ । প্রকৃত পক্ষে দেশের প্রায় সকল সমস্যার মূলে রয়েছে হলুদ সাংবাদিকতা । কোন একটি দেশকে বদলে দিতে পারে মিডিয়া । সেটি ভালোর দিকেই হোক অথবা মন্দের দিকে । আমাদের দেশে মিডিয়ার প্রভাব প্রকট । দেশের প্রায় সকল মিডিয়াই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের অনুগত । তার মানে হল দেশের মিডিয়া আজ দুটি ভাগে বিভক্ত । ফলে পাঠক সমাজ এবং দর্শক সমাজ ও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে । এই বিভক্তির পিছনে প্রধান ভুমিকা রেখেছে মিডিয়া । আর সমাজের এই বিভক্তি দেশের যাবতীয় সমস্যার মূল কারণ । যে যেই দলের সমর্থক সে সেই দলের অনুগত পত্রিকা নিয়মিত পাঠ করেন । সেই দলের অনুগত টেলিভিশন চ্যানেল দেখে থাকেন । যেখানে প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে অনবরত সত্য-মিথ্যা প্রচার করা হয় । দিনের পর দিন এইভাবে চলার ফলে সেই মানুষগুলোর মনের মধ্যে প্রতিপক্ষের সর্ম্পকে তীব্র ঘৃণার জম্ন হয় । সেই ঘৃণা এতটাই তীব্র থাকে যে তাদের মধ্যে সর্বদা একটা যুদ্ধাংদেহী অবস্থা বিরাজ করে । ফলে অনেক সময় দেখা যায় সামান্য কারণে তাদের মধ্যে অনেক বড় সংঘর্ষ বেধে যায় । সেই মিডিয়াগুলো ই তখন প্রচার করে যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে ভয়াবহ সঙ্গর্ষে ১ জন নিহত, আহত শতাধিক । আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে সংঘর্ষটি একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সেই তুচ্ছ ঘটনাটি একটি উছিলা মাত্র । সেখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে তাদের মনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষের উপর জমে থাকা ক্ষোভ । প্রতিদিন পত্রিকা খুললে আমারা যে মারামারি, হানাহানির খবর পাই তার প্রায় প্রতিটির পিছনেই রয়েছে এই ক্ষোভ এবং স্বার্থ ।

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া দেশের নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক অনিরাপত্তার অন্যতম কারণ । দলীয় অনুগত মিডিয়া এক্ষেত্রে বড় বাবার মত কাজ করে । কোন দলের কেউ বা লোকেরা যখন কোন অপরাধ করে তখন সেই মিডিয়া তা চেপে যায় । ফলে ঐ দলের লোকজন সেই অপরাধ সর্ম্পকে অনেকটাই অন্ধকারে থাকে । প্রতিপক্ষের মিডিয়াতে সেই অপরাধের বিবরণ প্রকাশ করা হলে সেই লোকজন মনে করে এটি তার দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার । ফলে এখানে একসাথে দুইটি ঘটনা ঘটে । প্রথমত, তার দলের লোকজনের অপরাধ তার কাছে অজানা থেকে যায় । দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষের মিডিয়ার প্রতি তার অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় । একটি উদাহরণ দেওয়া যাক । কিছুদিন আগে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে আগুন দিয়ে পুড়িযে দিয়েছে ছাত্রলীগ । অর্ধ শতাধিক কক্ষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে । আগুন দেওয়ার পর ছাত্রলীগ মিছিল করেছে, সভা করেছে । দেশের অল্প কযেকটি মিডিয়া ছোট একটি ছবিসহ রিপোর্ট করেছে । বহুল প্রচারিত তথাকথিত একটি মিডিয়ার শেষ পৃষ্ঠায় কোন ছবি ছাড়াই সংবাদটি এসেছে । সেই রিপোর্ট পড়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে না কারা আগুন দিয়েছে । ছাত্রলীগ নাকি ছাত্রশিবির । ফলে যারা ঐ মিডিয়ার নিয়মিত পাঠক, এবং যারা শুধুমত্র সেই পেপারটিই পড়েন তাদের কাছে ব্যাপারটি পরিস্কার হবে না । একটি ব্লগে কয়েকজন ব্লগারকে মন্তব্য করতে দেখলাম যে ছাত্রশিবির নাকি যুদ্ধপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য এই আগুন দিয়েছে । এভাবে এই মিডিয়াগুলো তাদের নিয়মিত পাঠকদের অনেককে প্রকৃত সত্য থেকে বঞ্ছিত করেছে । কিন্তু শিবিরের ছেলেরা যদি সেই আগুন দিত তাহলে প্রথম পাতায় বড় বড় ছবিসহ সেই নিউজটি অন্যভাবে করত । আমাদের মিডিয়াগুলো এভাবে আমাদেরকে প্রতি মুহুর্ত প্রকৃত সত্য খেকে বঞ্চিত করছে এবং আমাদের কে অন্ধকারে রেখে দিচ্ছে । কে দায়ী আর কে দায়ী নয় তা প্রমান করার দায়ীত্ব মিডিয়ার নয় । তার জন্য আদালত আছে, জনগন আছে । মিডিয়ার কাজ হচ্ছে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা । জনগন বিচার করবে কে বা কারা দায়ী । মিডিয়া তার সম্পাদকীয়তে তার মতামত দিয়ে পারে । কিন্তু মূল ঘটনা বিকৃত করতে পারে না । যদিও এই ঘটনা বিকৃতির কাজটিই আজ মিডিয়ার মূল কাজে পরিনত হয়েছে । দেশের আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অনেক সময় মিডিয়ার সুত্র ধরে পরিচালিত হয় । মিডিয়া সঠিক তথ্য উপস্থাপন করেনা বলে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায় । ফলে সামাজিক অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে ।

মিডিয়ার বিরুদ্ধে চাদাবজির অভিযোগ নতুন নয় । বর্তমানে সেটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চাদা না দিলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমুলক প্রতিবেদন করা হয় । অনেক সময় ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক কারনে উদ্দেশ্যমুলক প্রতিবেদন করা হয় । দেশের দুটি বড় মিডিয়া গোষ্ঠির মধ্যে চলমান দন্দ্ব এবং পরষ্পরের বিরুদ্ধে প্রচারনাকে উদাহরন হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে । এভাবে হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । অনেকেই রসিকতা করে বলেন যে মিডিয়া হচ্ছে সবচেযে বড় চাদাবাজ । সন্ত্রাসীরা নিয়মিত চাদা দেয় থানার পুলিশকে আর পুলিশ চাদা দেয় সাংবাদিকদেরকে ।

সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মিডিয়া আর একটি জগন্য কাজ করে চলেছে । রক্ষনশীল সামাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে আধুনিকতার নামে অশ্লীলতা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুয়োগ করে দিচ্ছে মিডিয়া । ছেলে-মেয়েদের অনৈতিক সম্পর্ক্য আজ প্রকট আকার ধারণ করছে । অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে অনেক তরুণ-তরুণী আত্বহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে । সুখের সংসার ভাঙ্গছে অনেকের । সামাজিক সালিশী ব্যবস্থা অনেক আগেই ভেঙ্গে দিয়েছে মিডিয়া । ফলে সামাজিক অপরাধ বেড়েছে বহুগুন । একসময় পারিবারিক, জমিজমা, চুরি, মারামারি ইত্যাদি অনেক সমস্যা গ্রাম্য সালিশীর মাধ্যমে সমাধান করা হত । কিন্ত কিছু মিডিয়ার ফতোয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সেই সালিশী ব্যবস্থা এখন আর নেই বললেই চলে । সমাজে এখন আর সালীশ বসতে দেখা যায় না । ফলে অনেক সাধারন মানুষ বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে । কারণ আইন আদালতে মামলা করার সামর্থ অনেক গরিব মানুষেরই নেই । উপরন্তু মামলা হলেও অর্থের জোরে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে । ফলে সামাজিক অপরাধ বেড়েই চলেছে । অধচ মিডিয়া ফতোয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিয়েছে নিছক রাজনৈতিক এবং নিজেদের স্বার্থে । যার খেসারত দিচ্ছে দেশের অসংখ্য মানুষ ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিষয়ে মিডিয়াগুলো প্রচন্ড হলুদ সাংবাদিকতার পরিচয় দিচ্ছে । বিচারের বিপক্ষে কোন লেখা দিলে তা অনেক মিডিয়াতে প্রচার করা হয়না । আগেই বলেছি কোন ঘটনায় কে দায়ী তা প্রমাণ করার দায়ীত্ব মিডিয়ার নয় । এখনে উভপক্ষের লেখাই প্রকাশ করা উচিত । সত্য মিথ্যা পাঠক বিচার করবে । জনগনকে এ টু জেড জানানো উচিত । কিন্তু দেখা যাচ্ছে কোন সাক্ষী যখন কারও বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে জবানবন্ধী দিচ্ছে তখন তা হুবহু ছাপা হচ্ছে । সেই সাক্ষীকে যখন জেরা করা হচ্ছে তখন সেই জেরা্র কিছুই ছাপানো হচ্ছে না । ফলে পাঠক শুধু সেটুকুই জানতে পারছে যা সাক্ষী তার জবানবন্ধীতে বলেছে। একজন সাক্ষী সত্য না মিথ্যা বলল তা বেড়িয়ে আসে জেরা মধ্য দিয়ে । সাক্ষী জেরায় কি বলল তা না জানার কারনে পাঠকের ধারণা হয় যে তার অভিয়োগ সত্য । এভাবে মিডিয়া আমাদেরকে একপাশে ঢেলে দিচ্ছে ।

প্রতিটি মানুষের জীবনে সুদিন-দুর্দিন আসে । কোন প্রতিষ্ঠান, দল বা দেশের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য । স্বাধীনতার পর আলীগের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বি । কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাদের দুর্দিন নেমে আসে । ১৫ই আগষ্টের একদিন পূর্বেও কি কেউ জানত যে দলটির এমন দুর্দিন আসবে ? বঙ্গবন্ধুর লাশ নাকি ৩ দিন পড়েছিল ৩২ নম্বর বাসায় । তখন আলীগের পক্ষে কেউ একটি মিছিল করার সাহস ও পায় নাই । সেই আলীগ আজ দেশের ক্ষমতায় । আজকে যাদের দুর্দিন চলছে কালকে তাদের সুদিন আসতে পারে । কথায় বলে হতি খাদে পড়লে সবাই লাথী মারে । কারো দুর্দিনে পাশ থেকে লাথী মেরে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় । সুশাসনের জন্য প্রয়োজন ন্যায় বিচার । কারো উপর অন্যয় করা হলে তার প্রতিবাদ করতে হবে । সে প্রতিপক্ষ হলেও । কারণ সেই অন্যয় দুদিন পর তার উপরও করা হতে পারে । কিন্তু সাংবাদিকদের হলুদ সাংবাদিকতার কারনে ক্ষতিগ্রস্থরা আরো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । ফলে যখন যারা ক্ষমতা পাচ্ছে তারা সেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করছে । এভাবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেছে এবং দেশ অস্থিতিশীল হচ্ছে ।

এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে দেশের অনেক সমস্যার পিছনে হলুদ সাংবাদিকতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত । দেশের অর্ধেক সমস্যা কেটে যাবে যদি হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধ হয় । তাই সাংবাদিতার বিষয়ে আইন করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে । কোন সাংবাদিক যদি উদ্দেশ্য মুলক ভাবে কোন মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে তাহলে অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত । সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নামে তাদেরকে যা খুশি করতে দেওয়া উচিত নয় । আমরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ আশা করি । আমরা বিশ্বাস করি সঠিক সাংবাদিকতাই পারে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, দেশের মানুষকে সহনশীল করতে ।