ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

একের পর এক ভূল ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও অতিরিক্ত সহনশীলতাই বিএনপিকে বিপদে ফেলেছে।বিগত দিনে বিএনপি অনেক ভূল করেছে, যার মাশুল এখন বিএনপিকে একসাথে গুনতে হচ্ছে । ১৯৯১ এর সরকার গঠনের পর থেকে তারা যে ভুলগুলো করেছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

১. ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিএনপি-জামাতের মাঝে একটি গোপন নির্বাচনী সমঝোতা ছিল । নির্বাচনে বিএনপি ১৪৭টি আসন পেয়েছিল, যা সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাঘরিষ্ট ছিল না । জামায়াত তাদেরকে নি:স্বার্থ সমর্থন দিয়েছিল ।তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত আলীগের অনুরোধ উপেক্ষা করে বিএনপিকে আবারো সমর্থন করেছিল ।সেই জামায়াতকে ৯৬ এ পাশে না রাখা ছিল বিএনপির অন্যতম বড় ভুল। ফলে আলীগ জামায়াতকে সাথে নিয়ে তত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে সফল হয় । বিএনপি বাধ্য হয়ে ৯৬ এর ১৫ ই ফেব্রুয়ারীর সেই নির্বাচনের পরপর পদত্যাগ করে । আগে থেকে সেই দাবী মেনে নিলে ৯৬ এ তারা আবার ক্ষমতায় আসতে পারত । কারণ, এত ঘটনার পরও তারা এককভাবে নির্বাচন করে ১১২ টি আসন পেয়েছিল । জামায়াতের বা ইসলামী দলগুলোর সাথে জোটবদ্ব নির্বাচন হলে ৯৬ এ আলীগ ক্ষমতায় আসতে পারত না ।

২. ২০০১ এ সরকার গঠনের পর ৯৬ এর জনতারমঞ্চের নায়কদের বিচার না করা ছিল আরো একটি ভুল । সেদিন এই বিচার করলে আজকে প্রশাসনে দলীয়করন মহামারী আকার ধারন করত না ।

৩. সাবেক সেনাপ্রধান মো: নাসিম সহ সেই ব্যর্থ ক্যু এর সাথে জরিত আলীগের নেতাদের বিচার বিএনপি করে নাই । সেই বিচার করলে আলীগের চক্রান্তের রাজনীতির লাগাম টেনে ধরা যেত ।

৪. ১৫ই আগষ্ট না হলে বিএনপির জন্মই হত না।২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন ফারুক, রশিদরা জেলে আটক ছিলেন।আলীগ পরের বার ক্ষমাতায় এসে তাদের ফাঁসি কার্যকর  করে।তাদের জন্য বিএনপি কিছুই করে নাই। বিএনপির উচিত ছিল তাদের পাশে দাঁড়ানো । তাহলে সেনাবাহিনী হয়তো ৫ই জানুয়ারীর একতরফা নির্বাচন বন্ধ করতে এগিযে আসত, কিংবা একদলীয় শাসনের অবসান ঘটাত । যেহেত বিএনপি সেদিন ফারুক, রশিদদের পাশে দাড়ায়নি; বর্তমানে সেনাবাহিনী পা বাড়াবে কোন ভরসায়?

৫. নিজেদের লোক চিনতে বিএনপি সব সময়ই ভুল করেছে । জেনারেল মঈন, হাসান মশউদ চৌধুরীকে তারা সেনা প্রধান করেছিল । ১/১১ এর সময় তারা কি করেছে তা সবাই দেখেছে । বিচারপতি মোদাছেরকে তারা প্রধান বিচারপতি করেছিল । অবসর গ্রহনের পর কোনদিন তাকে বিএনপির পক্ষে একটি কথাও বলতে দেখি নাই । অথচ বিচারপতি আমীরুল ইসলাম, খায়রুল হক রা এখনও আলীগের জন্য দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন । টেলিভিশন অন করলেই দেখা যায় অধ্যাপক মান্নান(চবি), মিজানুর রহমান (জবি), মেজবাহ কামাল (ঢাবি), আরেফিন সিদ্দিক (ঢাবি), কাবেরী গাযেন (ঢাবি)দের । অথচ বিএনপিপন্থী কোন শিক্ষককে দেখা যায় না বললেই চলে । সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় দিতে পারেনি বলেই এমনটি হচ্ছে ।

৬. বিএনপির ৯১-৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ মেয়াদে অনেকগুলো টেলিভিশনের অনুমোধন দিয়েছিল । যেখানে চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশটিভি, বাংলাভিশন ইত্যাদি ছিল । চ্যানেলগুলোর মধ্যে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামী টিভি বর্তমান সরকার বন্ধ করে দিয়েছে । বাকী চ্যানেলগুলোর বেশিরভাই আলীগের দখলে চলে গেছে । এই চ্যানেলগুলো এখন দিন রাত বিএনপির বিপক্ষে প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে । বিএনপির পক্ষে কথা বলার মত কোন চ্যানেল নেই বললেই চলে । অর্থাৎ টিভি চ্যানেল অনুমোধন করার ক্ষেত্রে বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ।

৭. বিএনপি-জামায়াত জোটের বয়স প্রায় ১৫ বছর । এই দীর্ঘ সময়েও তারা দুই দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও শিবিরের মাঝে কোন বন্ধন তৈরি করতে পারেনি । যার ফলে আলীগ ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক বিশ্ববিদ্যায় ছাত্রলীগের দখলে চলে যায় । ছাত্রদল হয়ে যায় নাম সর্বস্ব সংগঠন । সীমাহীন দমন-পীড়নে ছাত্রশিবির হয়ে পরে কোনঠাসা । অপরদিকে ছাত্রলীগ হয়ে উঠে মৃত ঘোড়া থেকে তেজী ঘোড়া । সেই ছাত্রলীগের মোকাবেলায় বিএনপি আজ হিমশিম খাচ্ছে ।

৮. সরকারী বিভিন্ন চাকুরিতে মুক্তিযো্দ্ধা কোটা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে । বিসিএসে যা শতকরা ৩০ ভাগ । মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমে যারা চাকরি পায় তাদের প্রায় সবার পরিবার আলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত । বিএনপি ১০ বছর ক্ষমতায় খেকেও এই কোটা পরিবর্তন করেনি যা তাদের অদুরদর্শীতার পরিচয় বহন করে । এই কোট পদ্ধতি অনেক আগেই বাতিল করা উচিত ছিল । তাহলে আজকে প্রশাসনে অনেক মেধাবী, নিরেপেক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা থাকতে পারত ।

৯. উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুরদৃষ্টির যথেষ্ট অভাব ছিল । শিল্পায়নের যুগে গ্যাস ও বিদ্যুতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য । বিদ্যুৎ সেক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল । যেখানে তারা পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ।

১০. তথ্য প্রযু্ক্তির ক্ষেত্রের তাদের ব্যর্থতার পাল্লা অনেক ভারি । বিনামুল্যে সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ না নেওয়া ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভুল সিদ্ধান্ত । সেদিন এই সংযোগ নিলে দেশ তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ১০ বছর এগিয়ে থাকত । ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক আগেই হয়ে যেত । আলীগ ২০০৮ সালে এসে এই স্লোগান তুলতে পারত না ।

১১. চিপহুইপ জয়নুল আবেদিন ফারুক পুলিশ কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেও বিএনপি কোন উচ্চবাচ্য করে নাই । যা পুলিশলীগকে বেপরোয়া হতে সহয়তা করেছে । বিএনপির উচিত ছিল তখন কঠোর কর্মসুচী দিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকুরিচুত্য করতে বাধ্য করা ।

১২. যুদ্ধাপরাধীর বিচারে নিরবতা ছিল বিএনপির বর্তমান সময়ের মারাত্বক ভুল । শাহাবাগের আন্দোলনে প্রথমে বিএনপি সমর্থন দিলেও পরে বিরোধীতা করে । ফলে শাহাবাগ বির্তকিত হয়ে উঠে । অনুরুপভাবে যুদ্ধপরাধ বিচারের বিরোধীতা করলে তা বির্তকিত হয়ে পরত । জোট শরিক জামাত দূর্বল হওয়া মানে জোট দুর্বল হওয়া । বিএনপির নিরবতার কারনে সরকারের একতরফা প্রচারণা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেছে সহজে ।

১৩. বর্তমান সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতাদের নিষ্ক্রয়তার কারণে আন্দোলনে গতি আসছে না । পুলিশের গুলির মুখে সাধারণ কর্মীদেরকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে । ফলে প্রতিদিন অনেক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহত হচ্ছে । বিএনপির উচিত কর্মীদের লাঠি হতে মাঠে নামার নির্দেশ দেওয়া । পুলিশকে কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সে ব্যাপারে কৌশল ঠিক করা। চলমান আন্দোলন ব্যর্থ হলে বিএনপি আগামী ২০ বছরেও ঘুড়ে দাড়াতে পারবে বলে মনে হয় না । তাই বিএনপিকে প্রতিটি পা সাবধানে ফেলতে হবে ।