ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১৯৭১ সালে স্বfধীনতার পর দেশে বেশ কয়েকটি নির্বাচন হয়ে গেল । দলীয় সরকারের অধীনে, সামরিক সরকারের অধীনে এবং সর্বশেষ চারটি নির্বাচন হল তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে । প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে । একটি দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন প্রতিপক্ষ বিরোধী দলের উপর কম বেশি জুলুম নির্যাতন, দমন-নিপিড়ন করে থাকে । ফলে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে কিছু সহিংসতা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হয়ে থাকে । ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের (হিন্দুদের) উপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে । কিছু রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি দেশী বিদেশী কিছু মানবাধিকার সংগঠনও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে সামনে আনে । কিন্তু কেন এই সংখ্যালঘু (হিন্দু) নির্যাতন ? আমাদের দেশে ছোট ছোট আরো অনেক সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে । হিন্দুদের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্টী যেমন চাকমা, মারমা, মনিপুরী ইত্যাদির বসবাস রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । তাদের উপর তো নির্যাতনের অভিযোগ উঠেনি । সুতরাং একে সংখ্যালঘু নির্যাতন না বলে হিন্দু নির্যাতন বলা যেতে পারে । আবার এই নির্যাতনের অভিযোগটি ৯১ সালের নির্বাচনের পর পাওয়া যায়নি । তখনও বিএনপি জয় ভাল করে সরকার গঠন করেছিল । ৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল । তখন স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি । ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবার আওয়ামীলীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে । এবারও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তাহলে কেন ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘু (হিন্দু) নির্যাতনের ঘটনা ঘটল ? কেউ কেউ মনে করতে পারেন তারা (হিন্দুরা) সংখ্যালঘু বলে তাদের উপর নির্যাতন করা হয়েছে । তাদের এই মনে করার পেছনে কোন যুক্তি আছে মনে হয় না । কারণ হিন্দুদের চেয়েও সংখ্যায় কম এমন অনেক সম্প্রদায় এদেশে রয়েছে । সুতরাং সংখ্যায় কম বেশি হওয়ার কারণে তাদেরকে নির্যাতন করা হয়নি । আবার ৯১ সালে একই দল বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরও কিন্তু এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি । সুতরাং বিএনপির ক্ষমতার উপরও এই নির্যাতন নির্ভর করে না । তাহলে ২০০১ সালে কেন হিন্দুদের উপর নির্যাতন করা হয়েছিল ? মুলত: একটি কারনে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের উপর নির্যাতন করা হয়েছিল এবং এর প্রতিকার ২টি উপায়ে করা যেতে পারে ।

কারণ : ১৯৯৬-২০০১ এই ৫ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ । ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিরোধী দলের উপর অঞ্চলবেদে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অনেক নেতার উপর দলীয় ক্যডার ও পুলিশ দিয়ে এবং হয়রানীমুলক মামলার সাহায্যে অনেক নির্যাতন জুলুম করা হয় । অনেক রাজনৈতিক হত্যাকান্ঠ সংগঠিত হয় । অনেকে আহত ও পংগু হন । ক্ষমতশীন দলের বিভিন্ন অংগ সংগঠনের বেপরোয়া চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদিতে বিরোধীদলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও অতিষ্ট হয়ে উঠে । যার প্রমাণ ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল । নির্বাচনে জয় লাভের পর অত্যাচারিত নেতা-কর্মীরা তাদের ৫ বছরের নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। একজন সাধারণ মানুষের কক্ষে আওয়ামী লীগের কোন বড় নেতার উপর প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব নয় । তাই সে টার্গেট করে তার আশেপাশে আওয়ামী লীগের কর্মী কারা কারা আছে । মুসলমানরা বিভিন্ন দলে বিরাজমান । অর্থাৎ কারো এক ভাই লীগ করে অপর ভাই বিএনপি করে, কারো মামা লীগ করে, চাচা জাতীয় পার্টি করে, আবার কারো খালু জামাত করে । ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর লীগের অনেকেই মামা, খালু, চাচাদের আশ্রয়ে চলে যায় । এভাবে তারা নিজেদেরকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারে । কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাই বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে আওয়ামী লীগ করার কারণ তারা কারো আশ্রয়ে যেতে পারেনা । ফলে তারা নির্যাতনের শিকার হয় ।

প্রতিকার : নির্বাচনোত্তর হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন বন্ধের উপায় মূলত ২ টি ।

প্রথমত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিরোধীদলের উপর দমন পিড়ন না করা । ছাত্রলীগ সহ অংগ সংগঠনের লাগাম ছেড়ে না দেওয়া । তাহলে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের মাঝে প্রতিশোধের স্পৃহা কম থাকবে এবং নির্যাতন কম হবে ( নাও হতে পারে) । যেমনটি ১৯৯১ এর নির্বাচনের পরে হয়েছিল । সরকার বিরোধীদলের উপর যত বেশি নির্যাতন করবে ক্ষমতা হারানোর পর তাদেরকে ততো বেশি নির্যাতন সইতে হবে । নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এই নির্যাতনের বড় একটি অংশ পরবে হিন্দুদের উপর ।

দ্বিতীয়ত, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন দলের নেতা, কর্মী, সমর্থক থাকা । সারাজীবন নৌকায় ভোট দিব, এই অবস্থান থেকে হিন্দুদেরকে সরে আসতে হবে । তাহলে যখন যেই দলই ক্ষমতায় যাক না কেন তারা তাদের সম্প্রাদায়ের অপর দলের নেতা কর্মীদের আশ্রয়ে যেতে পারবে । তাহলে নির্বাচোনত্তর সংখ্যালঘু (হিন্দু) নির্যাতন নির্মুল করা সম্ভব । তাছাড়া যত আইন কানুনই করা হোক না কেন তেমন কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না ।