ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সম্পূর্ণ নতুন এবং ভিন্ন ধরণের একটি বিপ্লব সফল করে দেখানোর জন্য তিউনিশিয়া আর মিশরের জনগনের কাছে সারা বিশ্বের মানুষ ঋণী থাকবে। কত শত বিপ্লবের নাম শুনেছি সেই ছোটকাল থেকে। কিন্তু এই প্রথম চাক্ষুস দেখলাম । পশ্চিমা মিডিয়ায় পূর্ব ইউরোপের গণতন্ত্রে উত্তরণের সাথে এর তুলনা করলেও এই বিপ্লবের ব্যাপকতা আরও বেশি হবে তাতে সন্দেহ নেই। কেননা আলজিরিয়া, জর্ডান, ইয়েমেনে তো বটেই, লিবিয়া, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বাদশা আর আমীরদের নরম তুলতুলে গদিও টলায়মান। কিছু আরব দেশে রাজাবাদশা কিংবা আমীররা পৈত্রিক সম্পত্তির মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করছেন। নির্যাতনের ভয় কিংবা ভোগ বিলাশে মত্ত থাকা আরব লোকগুলো এখন ঘুম থেকে জেগে উঠছে। উপনিবেশিক শাসন হতে মুক্ত হলেও গোটা আরব যে কয়েকটি পরিবারের কাছে বাপদাদার সম্পত্তি তা এখন আরবের জনগন বুঝতে পারছে।

মহান বিপ্লবের এ ঢেউ সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ুক এ আশা দুনিয়ার তাবৎ শান্তিবাদী মানুষের। এজন্য মিশরবাসির বিপ্লবের সমর্থনে সভা সমাবেশ হয়েছে দুনিয়ার সকল প্রান্তে। সবার আশা শান্তি। শান্তি ও গণতন্ত্র।

মিশর-তিউনিশিয়া এবং আরবের আজকের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম দেখে বাংলাদেশের জন্য আফসোস হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশে দুই দশক ধরে পূর্ণ গণতন্ত্র বিদ্যমান। কিন্তু আমরা জনগণ এর সুফল পাচ্ছিনা। কেন পাচ্ছিনা তা ভাবা দরকার আমাদের সকলের। গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ, ম্যানার, মন-মানসিকতা ও শিষ্ঠাচার এখনো আমাদের শিখা হয়নি। এখনো আমরা পুর্ণ গণতান্ত্রিক হতে পারিনি। কথায় কথায় সভ্যতার দোহাই দিলেও এখনও আমরা পুর্ণ সভ্য হতে পারিনি।

কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলোনা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলোনের মাধ্যমে আমাদের পূর্ব-পূরুষেরা দেখিয়ে গেছেন মাতৃ-ভাষার জন্য আমরা জীবন দিতে পারি। তবুও কারো আরোপিত ভাষা আমরা গ্রহন করবনা। আমাদের পূর্ব-পূরুষেরা সফল হয়েছিলেন। সারা দুনিয়ার জন্য একটা মডেল স্থাপন করেছিলেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক মাতৃ-ভাষা দিবস হিসেবে সারা দুনিয়ায় তা পালন হচ্ছে এখন।

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিরিশ লাখ লোক জীবন দিয়েছেন। অগণিত মা-বোন ইজ্জত দিয়েছেন। ঘর-বাড়ি-সম্পদ-পরিবার-আত্বীয়-স্বজন হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এত রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ মহান স্বাধীনতা। কিন্তু আমাদের কাছে সমাদর পাচ্ছেনা। অস্ত্র হাতে সম্মুখ-সমরে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা বীর-সেনানীরাও যোগ্য সমাদর পাননি। এখনও পাচ্ছেন না। কারন আমরা সভ্য হতে পারিনি এখনও। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলোনা।

বরং স্বাধীন বাংলাদেশের কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কথা ছিলো সাধারণ জনগণের জীবন-যাত্রার মানোন্নয়নের। দুর্ণীতিহীন শোষণ-মুক্ত রাষ্ট্র গঠনের। কথা ছিলো আইনের শাসনের। সুষম সমাজের। সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলানোর কথা ছিলো। কিন্তু ভাগ্য বদল হয়েছে কেবল গুটিকয়েক পরিবারের। আমরা সাধারণ মানুষেরা স্বাধীনতার সুফল পাইনি।

নব্বইয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আবারো মাঠে নেমেছিলো বাংলাদেশের মানুষ। গণতন্ত্র ফিরে পেলেও শান্তি ফিরে আসেনি। দুর্ণীতি কমেনি বরং শিকড় গেড়েছে। গরিব মানুষ আরো গরিব হয়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোপরি দেশের অবস্থা দিনদিন কেবল নাজুক হয়েছে। বাংলাদেশ যে তলাবিহীন ঝুড়ি ছিলো তা এখনও আছে। এসব সমস্যার মূলে কিন্তু আমরা নিজেরাই। কারন আমাদের সত্যিকার দেশপ্রেম নেই। অভাব সুশিক্ষার। সচেতনতার। সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতার।


সমগ্র বাংলাদেশের সমূস্ত মানুষই দূর্ণীতিপরায়ন নয়। কিন্তু দূর্ণীতির শিকড় রাষ্ট্র-যন্ত্রের একদম মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে প্রতিটি সরকারই জনগনের মেন্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসার পরদিন থেকে কেবল নিজের আখের গোছানো আর লুটপাটে ব্যস্ত থাকে। আর সুযোগ খোঁজে কেবল বিরোধীদের টুটি চেপে ধরার। খাটি স্বৈরাচারের সাথে আমাদের কোনও নির্বচিত সরকারেরই পার্থক্য ছিলোনা। এখনও নেই।

আরবের স্বৈরাচারি রাজা বাদশাহ আর আমিরদের লোটপাটের জন্য তেলের ভাণ্ডার আছে। কিন্তু গরীব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত স্বল্পকালীন স্বৈরাচারি শাসকেরা পারলে গোটা দেশটাকে যেন বিক্রি করে দিতে কার্পণ্য করেননা।

আজ তাই সময় এসেছে আত্মপরিচয়ের। ইস্পাত কঠিন ঐক্যের। গোপন ও প্রকাশ্য দেশপ্রেমের। সুশিক্ষার। বিবেকের জাগরনের। নৈতিকতা পুনরূদ্ধারের। সময় এসেছে জনগণের শক্তিকে অনুভবের। এবং অহিংস বিপ্লবের।