ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ইতিহাস পেছনের কথা নিয়ে টিকে আছে বর্তমানকে পরিচালনা করার নেপথ্যে। খারাপ আর ভালো হক অতীত সব ঘটনাই ইতিহাস। ব্যক্তির কাছে ব্যাক্তির ঘটনা, জাতির কাছে জাতির ঘটনা, সমাজের কাছে সমাজের ইতিহাস। আমাদের শিক্ষার ইতিহাস খুব বেশি দিনের পুরাতন। আধুনিক সমাজের প্রচলন অল্প কয়েক দিন আগের কথা। আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয়েছে তিন পুরুষ পার হয়নি। আমাদের আধুনিক হতে উৎসাহিত করেছিল শিক্ষা। শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছিল মূলত কয়েক ব্যক্তির হাত ধরে। আর এটি গণ আন্দোলনে রুপ নিয়েছে মাত্র অর্ধশতক হবে। মাত্র ৩০ বছর আগেও একটি ইংরেজি চিঠি পড়ার জন্য হ্যারিকেনের আলো জ্বালিয়ে কয়েক গ্রামের দূরে যাওয়ার ঘটনা আমাদের জানা। সবাই শিক্ষিত না হলেও বর্তমানে প্রতি বাড়িতে চিঠি লেখা পড়ার মত যোগ্যতাসম্পন্ন লোক তৈরি হয়েছে। তবে এখনো অনেক পরিবরাই রয়েচে গেছে যারা শিক্ষার সুযোগকে অর্থনৈতিক বাধার বেড়া অতিক্রম করে গ্রহণ করতে পারছে না। একটি আশার দিক হলো অধিকাংশ গ্রামেই দুয়েক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ পাওয়া যায়। শহরের বিষয়টি আলোচনা আনা হচ্ছে না কারণ নাগরিক জীবনের ভিত্তিভূমিই মূলত শিক্ষা।

যা হোক শিক্ষার জোয়ার ঠিক বলবো না একটা ঢেউ প্রাসংগিক পর্যায় পর্যন্ত লেগেছে বলা যেতে পারে। শিক্ষা বাদ দিয়ে উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার অর্থই জ্ঞান চর্চার পরিধি সৃষ্টি হওয়া। প্রতি গ্রামে এক/ দুই জন করে যখন উচ্চ শিক্ষিত হতে শুরু করেছে তখনই নানা বাধা এই জ্ঞান চর্চার সুযোগকে বিনষ্ট করছে। উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান পরিবেশ, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সহযোগিতা এসব উচ্চ শিক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে থাকে। এদের মধ্যে একটি বিপন্ন ঘটলেও উচ্চ শিক্ষার আয়োজনে কিছুটা হলেও বিপত্তি ঘটে। আমি বলবো না এ নিয়ন্ত্রকগুলো আমাদের দেশে সঠিকভাবে সব সময় সচল থাকে। কোন সময় রাজনীতি, কোন সময় অর্থনীতি, কোন সময় সরকারি সিদ্ধান্ত জোকের লেগেই থাকে। অথ্যাৎ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের জ্ঞান চর্চার কাজটি চলে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান চর্চার শেষ করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ি রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে চাকুরির সুযোগের সৃষ্টি হয় জ্ঞানের যোগ্যতার দিক থেকে। একটি কথা বলতে দ্বিধা নেই উন্নত জীবন যাপন করার জন্য মানুষ জ্ঞান অর্জনের পথ বেছে নেয়। আরও নিজেকে যোগ্য হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য শুরু হয় জ্ঞানের প্রতিযোগিতা। খোলাসা করে বলতে হয় জ্ঞানের পরিমাপের ভিত্তিতেই চাকুরীর পদ মর্যাদা নির্ভর করে। যার ফলে শিক্ষাজীবনে গৃহীত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা ক্রমিকের যে ব্যবস্থা রয়েছে চাকরীর ক্ষেত্রে ক্রমিকের একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সেখান থেকে আবার আগ্রহীদের কয়েক স্তরে মেধা যাচাই করে বাছাই করা হয়। নীতিটি এই রকম হওয়ার কারণে জ্ঞান অর্জনের মোটামুটি এটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল বলা যায়। মেধার একটি যুদ্ধ নেমেছে যা দেশের জন্য কল্যাণই বয়ে আনতে পারত। মেধাকে মূল্যায়নের এ পথ এখন রুদ্ধ প্রায়। মেধাবীদের যুদ্ধ এখনও হয়; কিন্তু ফলাফল প্রতিবারই যায় স্পষ্ট অন্ধকারের হাতে। স্বজনপ্রীতি করে নিয়োগ পাওয়া যায় জ্ঞানীদের গুরু হিসেবে। রাজনীতি করে হওয়া যায় যেকোন পদের বড় ব্যক্তি। মারামারি ভাংচুরের নেতৃত্ব দিয়ে লাভ করা যায় আইন শঙ্খলা রক্ষার বড় অফিসারের দায়িত্ব। টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় ছোটখাট অনেক চাকরি।

সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দেয়া হয় প্রার্থী নিজ দলীয় কিনা। ফলাফল একটু পেছনে হলেও সমস্যা নেই যদি সে রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি আস্থাবান হয়। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অফিসার পদে যে দুই জনকে নিয়োগ দেয়া হয় তারা দুজনই রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে সন্ত্রাস, ছাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে। শুধু কর্মকর্তা নয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাকে আর মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। প্রথম শ্রেনীতে প্রথম একাধিক প্রার্থী থাকা সত্বেও নিয়োগ পান ৪টি দ্বিতীয়বিভাগ পাওয়া দলীয় কর্মী। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়া কারণে বাদ পড়েন সবচেয়ে যোগ্যতম প্রার্থী। রেজাল্ট যাই হক বাড়ী কর্তা ব্যক্তির আশেপাশে হলেই নিয়োগ পাওয়া যায় শিক্ষক হিসেবে। কিছু খুশি করতে পারলে ছোটখাট চাকরি তো ইচ্ছা মতই করা যায়।

সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে প্রবাদই দাঁড়িয়ে গেছে ফেলো কড়ি মাখো তেল। টাকা ছাড়া চাকরির কোন সুযোগ নেই। এক প্রকার প্রকাশ্যেই ঘুষের বিনিময়ে দেয়া হচ্ছে চাকরি। এতে বাধা দেয়ার কেউ নেই কারণ যে বাধা দেবে ওই ঘুষের ভাগেরন পার্সেন্টেজ তার পকেটে সূর্য ওঠার আগেই চলে যায়। সম্প্রতি আমার এক বন্ধু সাথে কথায় জানতে পারলাম প্রাথমিক বিদ্যালয় লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে পারলে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে খুব সহজেই নে চাকরিটা পেয়ে যাবে। আবার এখন হয়েছে বিভিন্ন কোটা। আমার বলতে দ্বিধা নেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সরকার যে কোটার ব্যবস্থা করেছে তাতে এখন সাধারণ মানুষ বিরক্ত। কারণ বিশেষ সার্টিফিকেটে বিশেষভাবে তার চাকরি হবে। এতে সে জ্ঞান চর্চার ধার না ধেরে গায়ে বাতাস দিয়ে বেড়ান। জড়িয়ে পড়েন নানা ধরণের অপকর্মের সাথে। শেষে কিছু টাকাসহ সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিয়ে চাকরিটা পান সবার আগে।এখানে মেধার থেকে বিশেষ যোগ্যতা আগে দেখা হয়। এখন আবার এই কোটার কলেবর বৃদ্ধি করায় এর নাম দিয়েছে বন্দুক কোটা।

শিক্ষা জীবনোত্তর শিক্ষার এই অবমূল্যায়নের গল্প শুনে হতাশ অধ্যয়নরতরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় চলতে ফিরতে প্রায়ই কানে শোনা যায়, লাইব্রেরিতে গিয়ে কি করবা মিছিল করো, ফার্স্ট হলে চাকরি পাবা না। আবার অনেকে বলে বাড়ী কই এত পড়ে লাভ বাবা কী করে?