ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা দুষ্কর যে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্ররাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে ছাত্ররাজনীতি ছাত্রদের কল্যাণের জন্য যে নয় একথা এখন দিনের আলোর মতই পরিষ্কার। সমসাময়িক ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন দল ও নেতাকর্মীদের দৈনন্দিন কাজের পরিসংখ্যান সামনে আনলে রীতিমত আঁতকে ওঠতে হয় । দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করা, ভাংচুর করা, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, সন্ত্রাস, হল দখল এসব সংঘবদ্ধভাবে করে যাচ্ছে ছাত্র নামের একদল যুবক বা কিশোর। নানা অপকর্ম করার পর সবধরনের আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য এখনকার ছাত্ররাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। দেশে প্রচলিত ছাত্রলীগ, ছাত্রদলের রাজনীতি দেখে মনে হচ্ছে এরা নিজের স্বার্থে বা অপর কোন কর্তা ব্যক্তির স্বার্থে এহেন কোন হীন কাজ নেই যে তারা করতে পারে না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছাত্ররাজনীতির কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলে পরিষ্কার হবে এরা কাদের স্বার্থে সংগঠিত হয় এবং পরিচালিত হয়!

সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ভাবে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল সরকার কর্তৃক বেধে দেয়া শতভাগ আভ্যন্তরীণ আয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার আইনটি বাতিল করা। আগেই প্রশ্ন আসে আইনটি কেন সরকার চালু করতে চায়? আর কেনইবা শিক্ষার্থীরা বিরোধিতা করছে? আইনটি কার্যকর হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে যে পরিমান অর্থের প্রয়োজন হবে তা পুরোটাই বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব আয়ের উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলে সরকারের কোন বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় বলতে শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণ করা বেতন, ফিস, চার্জ, জরিমানা ইত্যাদিকে বোঝায়। শুধু জগৎন্নাথ নয় ইসলামী ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একই আইন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল সরকার। একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব আয়ে চলতে হলে কতটাকা প্রয়োজন হবে তা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে। ভর্তি ফি হবে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা, মাসিক বেতন হবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা দিয়ে পড়ার অফুরন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও টাকা নেই বলেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আসনের বিপরীতে ৭০ থেকে ১২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি যুদ্ধে নামে। এসব বিবেচনা করে শুধু ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নয়, দেশের সব মানুষের শিক্ষার অধিকার খর্ব করার এ আইন বাতিল করার আন্দোলনে নামা উচিত। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র স্পষ্ট করে বলতে হয় ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের উপর চড়াও হয়। শিক্ষার অধিকার দাবিতে যে গলা দিয়ে প্রতিবাদের ভাষা বের হয় সেই গলার উপর পা দিয়ে পিস্ট করেছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। ছাত্রলীগের কর্মীরাও ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র, আবার যারা আন্দোলন করছে তারাও ছাত্র, তাহলে কেন এই হামলা? তাহলে প্রশ্ন কি আসে না কোন মাধ্যম থেকে এত পরিমান আয় হয় যে তাদের টাকা ওই নেতাকর্মীদের কোন সমস্যাই না। তারা রাজনীতি কওে সাধারণ শিক্ষার্থীর অধিকার হরণ কর্তা ব্যক্তিদের মন বজায় রাখতে পারলে তারাও একভাবে সন্তুষ্ঠ হওয়ার পথ পাবে। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে হয় তিনি একটু দেরিতে হলেও দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একই আইনে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত করার ঘোষণা দিয়ে সৃষ্ট বিবাদমান অবস্থার নিরসন করেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি ঘটনার উল্লেখ করবো। ২০০৯ সালে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন সভাপতি আহমেদ সানির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন ওই বিভাগের কয়েক ছাত্রী। সেই সানির বিচারের দাবিতে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সিন্ডিকেট চলাকালীন ভিসির কার্যালয়ে ঘেরাও করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সেদিন তৎকালীন প্রক্টরের নির্দেশে ছাত্রলীগ কর্মীরা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে। এরপর ২০১১ সালের আগস্ট মাসে বিদ্যুতের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ভিসির বাসভবণ ঘেরাও করে শিক্ষার্থীরা। সেখানে প্রক্টর ফোন করে ছাত্রলীগ কর্মীদের ডেকে এনে আন্দোলনকারীদের ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করে। এছাড়া মেডিকেলে পাহারা বসায় যেন আহতরা চিকিৎসা নিতে আসতে না পারে। সর্বশেষ ঘটনা ৩০ সেপ্টম্বর মেডিকেল কলেজের ভূয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে ২০ জনের মধ্যে গ্রেফতার হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রভাষক আসম ফিরোজ-উল-হাসান। তিনি দোষী কি নির্দোষ তা প্রশাণিত হয় নি, বিচার কাজও শুরু হয়নি, শুধু ঘটনাস্থল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এতেই ফুসে উঠেছে ছাত্রলীগ। ওই শিক্ষক দলীয় হওয়ায় সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন, মিছিল সমাবেশে করছে ছাত্রলীগ। আর এই ছাত্রলীগই বিদ্যুতের দাবি ও নিপীড়নকারী শিক্ষকের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালিয়েছিল। এতে বিশ্বাস করা কঠিন, বলা যায় অবাস্তাব যে ছাত্রলীগ ছাত্রদের কল্যাণের জন্য বা নেতৃত্ব তৈরির জন্য রাজনীতি করে।

আমি কখনো শুনি নাই ওমুক ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপন করলো ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল। কিন্তু একথা শুনেছি ক্যাম্পাসের গাছকাটার টেন্ডারের ভাগ নিল ছাত্রলীগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন ভালো কাজে রাজনৈতিক কর্মীরা না থাকলেও হাতুড়ি দিয়ে শিক্ষক পেটাতে তারা প্রস্তুত, ক্ষমতাসীন প্রশাসনের মদদে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনার সাথে জড়ানো তাদের নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা বলেন থাকেন রাজনৈতিক কর্মীরা চুরি, ছিনতাই, মারামারি, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, হল দখল করবে এসব এখন আর নিউজ নয়, বরং তারা একদিন এসব থেকে বিরত ছিল এটাই নিউজ।